মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

তাইসির মাহমুদ

আসুন, মানুষকে নিয়ে তামাশা না করে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি



বড়ই কষ্ট পেলাম। বাংলাদেশে গেলে অনেক আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দাওয়াতে যেতে হয়। তখন এই ফুলকলি, বনফুল কিংবা স্বাদ থেকেই মিষ্টান্ন কিনে নিই। চার সপ্তাহের জন্য দেশে গেলে কমপক্ষে ৮/১০ জন আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াতে যেতেই হয়। তখন প্রতিবারই কিন্তু এই দোকানগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি জাতীয় খাদ্য কিনি। কারণ এই দোকানগুলোর খাদ্যদ্রব্যের গুণগতমান তুলনামুলক ভালো।

গতবার বাংলাদেশ থেকে লন্ডন ফেরার সময় সম্ভবত বনফুল থেকে একশ’ পিস বাখরখানী কিনে এনেছিলাম। আত্মীয় স্বজনকে দিয়েছি। তাঁরা বাংলাদেশের বাখরখানীর খুবই প্রশংসা করেছেন। ফ্রিজে রেখে অনেক দিন খেয়েছেন। আমরাও খেয়েছি।

বাংলাদেশে থাকাকালীন যখনই কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, তখন কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকার মিষ্টান্ন কিনে নিতাম। আমার মনে হয়, শুধু আমিই নয়; অন্যান্য প্রবাসীরাও এই দোকানগুলো থেকে অধিকাংশ শপিং করে থাকেন।

কিন্তু কী দেখলাম আজ? করোনা আতংকে দোকানে “বিদেশী লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ” সাইন লাগিয়ে রাখা হয়েছে। এই প্রবাসীরা তো আপনাদেরই কারো ছেলে কিংবা মেয়ে, ভাতিজা ভাতিজি, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, দাদা-দাদি, কিংবা নানা-নানী। তারা তো সারা বছরই আপনাদের দোকানে কেনাকাটা করেন। বাংলাদেশ তো তাঁদের জন্মভূমি। তারা তো তাদের বাড়িতে যাচ্ছেন, যে বাড়িতে তাঁরা থাকেন না। যে বাড়িতে তাদের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তারা শুধু দিয়েই থাকেন।

বাড়ি থেকে যখন একটি ফোন আসে ‘মাসের খরচের টাকা শেষ হয়ে গেছে’, তখন তাঁরা লন্ডনে নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করেন না। মানি ট্রান্সফার অফিসে দৌঁড় দেন। একটুও দেরি না করে স্বজনের জন্য খরচের টাকাটা পাঠিয়ে দেন।

গ্রামের একজন প্রতিবেশী যখন তাঁকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমার একটি মেয়ে বিয়ে দেবো. একটু সাহায্য দরকার’। তখন তাঁর পকেটে পয়সা না থাকলেও তিনি কিন্তু বসে থাকেন না। তিনি অন্য কারো কাছ থেকে ধার করে এনেও হলে সাহায্য করার চেষ্টা করেন।

একজন মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত। অর্থাভাবে চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না। প্রবাসীর কাছে খবরটি পৌঁছলো। কিন্তু তাঁর হাতে পয়সা নেই। এরপরও তিনি কিন্তু ঘরে বসে থাকেন না। তার মনে হতাশা দেখা দেয়। হায় হায় আমি সাহায্য করতে পারলাম না! যদি মানুষটা মারা যায়। এরপর তিনি তার ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ওই রোগীর চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠান।

এর মধ্য দিয়ে তিনি এক ধরনের শান্তি খুঁজে পান। তিনি বিনিময়ে কিছুই চান না। তিনি চান শুধু মানুষের ভালোবাসা। মানুষের মুখে হাসি দেখতে চান তিনি। দেখতে চান আত্মীয়-স্বজন ভালো আছে। মা, মাটি ও দেশ ভালো আছে। দেশের মানুষ ভালো আছে। এরচেয়ে বেশি তাঁর আর কোনো চাওয়া নেই।

কিন্তু আজ প্রবাসীরা বড় ঘৃণা ও অবহেলার পাত্র। হাসি তামাশার পাত্র। মনে হচ্ছে তাদের প্রত্যেকেই চীনা নাগরিক। করোনার ভয়ে ‘উহান রাজ্য’ থেকে পালিয়ে এসে সিলেট নামক অচেনা শহরে তারা আশ্রয় খুঁজছেন । আর সিলেটের মানুষ তাদেরকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছেন।

একটি কথা বলি। করোনাভাইরাসের প্রেরক কিন্ত স্বয়ং বিশ্বপ্রতিপালক। এটি চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে । চীনের মানুষ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছে। তাদের মাধ্যমেই এটি সংক্রমিত হয়েছে বিশ্বের আনাচে কানাচে।

বৃটেনে ৪ লক্ষাধিক চীনা নাগরিক বসবাস করেন। এখানে সেন্ট্রাল লন্ডনে ‘চায়না টাউন’ নামে একটি অত্যাধুনিক টাউন আছে। গুগলে ‘চায়না টাউন’ লিখে সার্চ করলেই আপনি দেখতে পাবেন। এই টাউনের অলি-গলিতে দিয়ে হাঁটলে আপনি শুধু চাইনিজ মানুষই দেখবেন ।

শুধু চায়না টাউনেই নয়- লন্ডন শহরের ট্রেনে, বাসে, শপিং মহলে সব জায়গাতেই চায়নিজরা মুক্ত চলাফেরা করেন। এখানে কেউ কিন্তু দোকানে “চাইনিজ প্রবেশ নিষিদ্ধ” সাইনবোর্ড লাগিয়ে রাখে না। রাস্তাঘাটে কেউ কিন্ত তাদের দিকে তিরস্কারের চোখে তাকায় না।

প্রবাসীরা তো তাদের দেশে যাচ্ছেন। তাদের বাড়িতে যাচ্ছেন, বাসায় যাচ্ছেন। সিলেট শহরের ৭০ ভাগ বাসা-বাড়ির মালিক তো প্রবাসীরা। তাঁদেরকে নিয়ে আপনারা এই হাসি তামাশা করছেন।

বৃটেনের কোনো শপিং সেন্টার কিংবা দোকান এটা করলে জরিমানার মুখোমুখি হতে হতো। এধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আপনি একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্বে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। এটা সামাজিক দিক থেকে চরম অন্যায়। আইনের দিক থেকে অপরাধ। এই কথাটিই সরাসরি এভাবে না লিখে অন্যভাবে লিখতে পারতেন। মানুষের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলা পাপও বটে । এই অবিবেচক সিদ্বান্ত আপনার ব্যবসা কোম্পানীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক।

আসুন, আল্লাহ প্রদত্ত মরণব্যাধী করোনা থেকে বাঁচতে আমরা তাঁর ওপরই ভরসা রাখি। নিজে সতর্ক থাকি, অন্যকে সতর্ক রাখি। তবে প্রবাসী নামক মানুষদেরকে অবজ্ঞা ও তিরস্কার করে নয়।

লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

 

 

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন: