মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

একটি কৌতূহলী বিশ্লেষণ

যেভাবে ইতি ঘটতে পারে বর্তমান করোনা মহামারির



করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আমাদের বর্তমান দিনগুলো, এবং রাতগুলো বড় দীর্ঘ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমরা সবাই পৃথিবী নামক এক ট্রেনের কামরায় বসে আছি, এবং ট্রেনটি আচমকা ঢুকে পড়েছে একটি দীর্ঘ অন্ধকার টানেলে, যেখানে কোন প্রান্তেই দেখা যাচ্ছে না আলোর রেখা। এমন সুররিয়্যাল পরিস্থিতিতে বহুদিন পড়িনি আমরা। ঘরে ঘরে নিজেদের স্বেচ্ছা বন্দি করছি, অপরকে বন্দি হতে উৎসাহ দিচ্ছি, তাতে কাজ না হলে আইনের হাত পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে বন্দিত্বের শেকল পরানোয়! রীতিমত আইন করে বলছি – সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করুন, বিনোদনস্থান বন্ধ করুন, খেলার মাঠ, সিনেমা, বাজার, স্টেশান, এমনকি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রার্থনাগৃহও।
মনে পড়ছে শামসুর রাহমানের লাইনটি: এ কোথায় কোন দেশে এসে, হারিয়ে ফেলেছি রূপ পশুর রোমশ অন্ধকারে (’দেশে’র জায়গায় পড়ুন ‘বিশ্ব’ এবং পশুর জায়গায় পড়ুন ‘করোনা’)
তবে, কথা হচ্ছে, এ রাত্রি যতই দীঘর্ই হোক, এ রাত্রি থাকবে না। প্রশ্ন শুধু, কখন শেষ হবে এ বন্দিদশা, কখন শেষ হবে এ কালরাত্রি, কখন আমরা আবার হাত ধরাধরি করে গেয়ে উঠবো: (আইসোলেশান নয়) আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান।—
চলুন, কাব্য-টাব্য ছেড়ে সেকথায় যাওয়া যাক।

প্রথম আশার কথা হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব আরো বহুবার পড়েছিল। অসংখ্যবার মহামারি এসে হানা দিয়েছিল মানুষের মাঝে। এবং প্রতিবারই অন্ধকার ভেঙে ফিরে এসেছে আলোর ভোর। বর্তমান করোনাভাইরাসের শেষ কবে হবে, তার উত্তর হয়তো কিছুটা পাওয়া যেতে পারে পুরনো সেইসব মহামারির নথিপত্র দেখলে।
আমরা যেটা করবো, তাহলো প্রথমে পুরনো ইতিহাস একটু ঘেঁটে দেখবো, তারপর সে শিক্ষার ভিত্তিতে বর্তমান মহামারিটি কীভাবে শেষ হতে পারে, তার কয়েকটি সম্ভাব্য উপায় নিযে কথা বলবো।

প্রথমেই পৃথিবীর ইতিহাসের পাঁচটি ভয়ংকর মহামারি কীভাবে শেষ হয়েছিল, সেটা খুব সংক্ষেপে দেখে উঠতে চাই:

১. প্লেগ: যে প্লেগের কথা বলছি, সেটির সূচণা ঘটেছিল ৫৪১ সালের দিকে, বাজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিপোলে শুরু হয়ে দাবদাহের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, নর্থ আফ্রিকা, এশিয়া এবং আরব অঞ্চলে। মারা গিয়েছিল প্রায় ৩০-৪০ মিলিয়ন মানুষ। অর্থাৎ কিনা, সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই মৃত্যূ বরণ করেছিল এ সময়ে। কীভাবে শেষ হয় সেটি? প্রফেসর থমাস মোকাইটিসের ভাষায়, অসুস্থ মানুষদের পরিত্যাগ করে চলে যাওয়া ছাড়া তখনকার মানুষদের আর কোন উপায় জানা ছিল না। বেঁচে যাওয়া মানুষদের বোধহয় নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাই বাঁচিয়ে দিয়েছিল।

২. ব্ল্যাক ডেথ: ঘটেছিল ১৩৪৭ সালের দিকে, চারবছর ব্যাপ্তি এ মহামারিতে মারা গিয়েছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন মানুষ। এসময়ও এ রোগ প্রতিরোধের কোন উপায় জানা ছিল না মানুষের, তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিল যে, রোগটি বোধহয় সংস্পর্শ থেকে ছড়ায়। এবং এ বোধদয়ের ফলে, অসুস্থদেরকে আলাদা করে রাখার সচেতন একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইতিহাসে এটাই বোধহয় ‘কোয়ারান্টাইন’ এর সূচণা। এর ফলেই বোধহয় রোগটির বিস্তার বন্ধ হয়ে যায় ধীরে ধীরে।

৩. দ্য গ্রেট প্লেগ অব লণ্ডন: ঘটনা ১৬৬৫ সালের, মাত্র সাত মাসে ১০০ হাজারেরও বেশি লণ্ডনবাসীর মৃত্যূ ঘটে এ ভয়াবহ মহামারিতে। সব ধরনের জনসমাগম এবং বিনোদনের স্থান বন্ধ করে দেয়া হয়। আক্রান্তদেরকে আইন করে, বেশিরভাগক্ষেত্রেই জোরপূর্বক গৃহবন্দী করে দেয়া হয়, যাতে তাদের সংস্পর্শে এসে নতুন কেউ এ রোগে আক্রান্ত না হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়ির দরজায় এঁকে দেয়া হয় লাল রঙের ক্রশ চিহ্ন, সাথে লেখা: “Lord have mercy upon us.”
ব্যাপারটি শুনতে এবং ভাবতে যত অমানবিকই লাগুক না কেন, এ ছাড়া বোধহয় আর কোন উপায় জানা ছিল না এ রোগের প্রকোপ কমানোর।

৪. স্মলফক্স: ইউরোপ, এশিয়া, এবং আরব দেশগুলোতে বহু শতাব্দী ধরেই স্মলফক্সের প্রাদুর্ভাব ছিল। তবে এ রোগটি যখন ১৫ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয় বণিক ও অভিযাত্রীদের দ্বারা মেক্সিকো এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে, তার ফলাফল হয় সুদূরপ্রসারী এবং অতি মারাত্মক। এর কারণ, ঐ অঞ্চলের মানুষের শরীরে এ রোগটির বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল পুরোপুরি অনুপুস্থিত। ফলস্বরুপ, পুরো শতক জুড়ে মৃত্যূ-উৎসব চালিয়ে যাওয়া এ রোগে মহাদেশের প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ মানুষ মারা যায়। এক মেক্সিকোতেই মোট জনসংখ্যা ছিল ১১ মিলিয়ন, তার মধ্যে মৃত্যূ কোলে ঢলে পড়ে ১০ মিলিয়ন মানুষ! এ রোগের প্রকোপ চলতে থাকে দীর্ঘকাল জুড়ে, কখনো থেমে থেমে, কখনো ব্যাপক হারে।
অবশেষে, প্রায় দুই শতাব্দী পর, ব্রিটিশ ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনারের আবিষ্কৃত টিকা এ রোগ থেকে মুক্তি দেয় বিশ্বকে।

৫. কলেরা: উনিশ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত ইংল্যাণ্ডে প্রাদুর্ভাব ঘটে কলেরার, মারা যায় হাজার হাজার মানুষ। তখনকার প্রচলিত ডাক্তারি ধারণায় মনে করা হতো, কলেরার কারণ বুঝি খারাপ বাতাস । খারাপ বাতাস মানে কিন্তু জ্বিন, ভূতের আছর লাগা বাতাস নয় অবশ্য। তাদের ধারণায়, বিভিন্ন জৈব পদার্থ হতে উদ্ভুত (যেমন পচে যাওয়া খাবার) গ্যাস হতে এ রোগ ছড়ায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ডাক্তার জন স্নো আবিষ্কার করেন যে দূষিত জল হতে ছড়ায় কলেরা। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ এবং ট্রায়ালের পর এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় অবশেষে। রাতারাতি ব্যবস্থা নেয়া হয় শোধিত পানি পান করার। এবং ফলত কলেরাও তার ভয়াল থাবা সরিয়ে বাধ্য হয় যেতে জনপদ হতে।

তো এ গেল মানুষের ইতিহাসের পাঁচটি ভয়াবহ মহামারির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এমন আরো অসংখ্য মহামারি (বৈশ্বিক এবং স্থানিক) থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে আসুন এবারে আলোচনা করা যাক বর্তমান করোনা মহামারির অবসান ঘটতে পারে কিভাবে, সে কথায়।

এ ব্যাপারে নানান বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, জীবাণুবিদদের কথা-বার্তাগুলো এক জায়গায় জড়ো করলে দেখা যায়, মোটামুটি পাঁচ ভাবে বর্তমান করোনার থাবা নির্জীব হয়ে পড়তে পারে আমাদের উপরে।

প্রথম সম্ভাবনা:
আবহাওয়া বদলের সাথে সাথে:
ক্যালেফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি সংক্রান্ত বিদ্যার প্রফেসর জেফরি ক্লোজনারের মতে, এ মুহূর্তে মহামারি সংক্রান্ত যেসব ডাটা এবং তথ্য আমাদের হাতে আছে, তার ভিত্তিতে হয়তো ধারণা করা যায় যে, বোধহয় গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এ রোগটি খুব বেশি মাত্রায় ছড়াতে পারে না। অর্থাৎ গরমের মৌসুম আসতে শুরু করলে হয়তো ধীরে ধীরে এ রোগের বিস্তার কমে আসবে। আমি জানি, এ ধারণায় বশবর্তী হয়ে আমাদের দেশের অনেকেই খানিকটা স্বস্তি বোধও করছেন। তবে এখানে স্পষ্ট বলে রাখা দরকার, তার এ কথার পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর তত্ত্ব ও তর্ক চালু আছে। উদাহরণস্বরূপ, মিশিগান ইউনিভার্সিটির মহামারি সংক্রান্ত বিদ্যার প্রফেসর আরনণ্ড মন্টের মতে, চার ধরনের করোনা ভাইরাস যারা মূলত সাধারণত ঠাণ্ডা জনিত রোগের ভাইরাসের মতো শ্বাসযন্ত্রের উপরিভাগে আক্রমণ করে। এদের প্রকোপের অনেকটাই ঋতুপরিবর্তনের সাথে যোগাযোগ আছে বলে মনে হয়। কিন্তু এ প্রেক্ষিতে বর্তমান নভেল করোনাভাইরাসটিও একই রকম আচরণ করবে – তা কিছুতেই বলা সম্ভব নয়। এমন কিছু বলার মতো যথেষ্ট জ্ঞান এবং উপাত্ত আমাদের হাতে নেই।
সুতরাং, প্লিজ, প্লিজ পজেটিভ থাকুন, তবে স্বাস্থ্য রক্ষার সবগুলো উপদেশ অক্ষরে মেনে চলুন, নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচান।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা:
অধিকাংশের মধ্যে রোগ ছড়ানো:
এ সম্ভাবনাটি শুনতে বড়ো মর্মান্তিক। আইডিয়াটা হচ্ছে: রোগটি বেশিরভাগ মানুষই আক্রান্ত হবে, এবং এক সময় ছড়ানোর মতো আর কোন পোষক দেহ না পেয়ে রোগটি আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যাবে।
অর্থাৎ, এ রোগটি সামার জুড়েও মানুষের মধ্যে ছড়াতে থাকবে। এবং এভাবে গণহারে ছড়াতে থাকলে একসময় সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে ( ধারণা করা হচ্ছে, চীন, জাপান এবং উত্তর কোরিয়ায় এ রোগের প্রকোপ কমে আসার পেছনে এটি অন্যতম একটি কারণ)। কিন্তু এটি হতে গেলে ততদিনে পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই রোগটি ছড়িযে পড়বে, এবং চালিয়ে যাবে তার তাণ্ডবলীলা। এ সম্ভাবনাটিকে এ. মন্টে চিহ্নিত করেছেন: the worst-case scenario.”

তৃতীয় সম্ভাবনা:
কোয়ারান্টাইন:
এ পদ্ধতি ইতোমধ্যেই ঘরে ঘরে, দেশে দেশে, শহরে শহরে শুরু হয়েছে। সহজ হিসেব, আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে আলাদা করে রাখা যাতে তাদের দেহ থেকে ভাইরাসটি আর নতুন কোন পোষক দেহে ছড়াতে না পারে। কিন্তু ব্যাপারটি যত সহজে বলা সম্ভব, ঠিক ততটাই কঠিন প্রয়োগের বেলায়। না হলে ইতালি কিংবা ইরানে যে ভয়াবহ অবস্থা চলছে, সেটা দেখা যেত না। চাইলেই এখন আর সেই প্লেগ আমলের মতো একটা শহর পুরোপুরি লক-ডাউন করে দেয়া যায় না। একটা পর্যায় পর্যন্ত হয়তো করা যায়, কিন্তু ততক্ষণে কোন না কোন আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সাথে সেটি ছড়িয়ে পড়ে অন্য শহরে। এ ব্যাপারে বড় সমস্যা হলো করোনা ভাইরাসের সুপ্তিকাল। এ মুহূর্তে মনে করা হচ্ছে, এর সুপ্তিকাল ১৪দিন ( কেউ কেউ বলছেন, সুপ্তিকাল কোন কোন ক্ষেত্রে বেশিও হতে পারে), তাই আক্রান্ত কোন ব্যক্তি তার নিজের রোগের খবর নিজেই উপলদ্ধি করতে না করতে হয়তো ছড়িযে দিয়েছে আরো অসংখ্য মানুষের ভেতরে, শুরু করে দিলো একটি চেইন রিঅ্যাকশনের। তাই এয়ারপোর্টে শুধুমাত্র তাপমাত্রা মেপে রোগমুক্তির সার্টিফিকেট দেয়াটা কোনভাবেই কার্যকর কোন পন্থা হতে পারে না, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোয়ারান্টাইনই একমাত্র সমাধান এসব ক্ষেত্রে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, আমরা জনসাধারণকেই এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে, নিজের ও অন্যের ভালর জন্যই থাকা দরকার নিজ ঘরে, বদ্ধ হয়ে অন্তত কিছুদিন। কোয়ারান্টাইন ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে সহজ হিসেবে একসময় এর প্রকোপ কমে আসতে বাধ্য।

চতুর্থ সম্ভাবনা:
টিকা আবিষ্কার:
রোগের প্রকোপ চলতেই থাকবে বছরব্যাপী, তারপর পৃথিবীর কোথাও কোন বিজ্ঞানী একটি কার্যকর টিকা আবিষ্কারে সফল হবেন, তারপর সেটা সারাবিশ্বে প্রয়োগ শুরু হয়ে গেলে করোনার বিদায়! খুবই সম্ভাব্য, অত্যন্ত আশাজাগানিয়া, এবং এ রোগের স্থায়ী সমাধান। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত খবরাখবরও আসতে শুরু করেছে গণমাধ্যমে। কোন কোন জায়গায় পরীক্ষামূলক ভাবে এর প্রয়োগও শুরু হয়েছে। তবে একটাই সমস্যা, তেমন টিকা আবিষ্কার হলেও জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য হতে প্রায় বছর খানেক লেগে যাবে। ততদিনে যা ক্ষয়ক্ষতি হবার, তার পরিমাণ কিন্তু নেহায়েত কম হবে না।

পঞ্চম সম্ভাবনা:
ওষুধ আবিষ্কার:
এ সম্ভাবনাটির জোর মনে হয় এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই, বিজ্ঞানী হেজেলটাইন ও ক্লোজনারের মতে, রোগীদের জন্য কিছু ওষুধ পাওয়া যেতে শুরু করবে। তাদের কথায়, সার্স ও মার্সের (দুটো মহামারি) সময় থেকেই এ ধরনের রোগ ও তার চিকিৎসা নিয়ে বিজ্ঞানীরা পুরোমাত্রায় গবেষণা করে আসছেন, যার কিছু জ্ঞান এ সময় কাজে লাগাচ্ছেন তারা। সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে, ইতোমধ্যে অনেকটা সীমিত আকারে হলেও কিছু ওষুধ ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে নানান দেশে, যার বেশিরভাগই টেস্ট পর্যায়ে থাকলেও আশাপ্রদ ফলাফল দিচ্ছে। আশা করা যেতে পারে, হয়তো খুব শীঘ্রই এসব ওষুধ আরো কার্যকর ও সহজলভ্য আকারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হতে শুরু করবে। আর তাহলে, অচিরেই হয়তো এ রোগের প্রকোপ কমতে শুরু করবে আপনা-আপনি।

এতসব বলার পরে, খুব আশার বাণী কি শোনানো গেল কোন সম্ভাবনা থেকে? অন্তত অচিরেই যে করোনার থাবা আমাদের উপর থেকে সরছে না, তা কিন্তু অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তাহলে করণীয়? সোজা কথায়, যা আমরা ইতোমধ্যে জানি, যেমন – বেশি বেশি হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, স্বাস্থ্য রক্ষার বিধিনিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে নিজেরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে রাখা, অপ্রয়োজনে বাড়ির বের না হওয়া, সবরকমের জনসমাগম এড়িয়ে চলা, এবং আপনি আক্রান্ত হোন বা না হোন, নিজেকে সেল্ফ আইসোলেট করে রাখুন যথাসম্ভব।

মনে রাখা দরকার, তথাকথিত উন্নত দেশগুলোও কিন্তু ভয়ানক নাকানি-চুবানি খাচ্ছে এ রোগের প্রকোপে, এত কম জনসংখ্যার ইউরোপীয় দেশগুলোও, যেখানে তাদের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে করোনার বিরুদ্ধে কিছুই করে উঠতে পারছে না, মানুষ মারা যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে, সেখানে একবার ভাবুন তো, আমাদের মতো এত ঘনবসতির দেশে এ রোগ অবাধে ছড়িয়ে পড়লে কি অবস্থা হতে পারে। যা করার, তা করতে হবে আপনাকে, আমাকে, আমাদেরকে। আমরা ইতোমধ্যে যেসব বিধি-নিষেধ মেনে চলছি, সেটাকে আরেকটু কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। নিজে বাঁচতে হলে অন্য যেন বাঁচে – করোনা থেকে এ শিক্ষা নিতেই হবে আমাদের।

সবশেষে একটি আশার কথা: অভিনন্দন আপনাকে। চিকিৎসকদের মতে, এমন হতেও পারে, আপনি ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু আপনার স্বাস্থ্যরক্ষার বিধিনিষেধ মেনে চলার কারণে, আপনার শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে বুঝে ওঠার আগেই বেচারা করোনা লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। সুতরাং, করোনাকে পরাস্ত করার জন্য আপনাকে অভিনন্দন।

আপাতত যথা সম্ভব ঘরে থাকুন। তাকিয়ে দেখুন তো পুরনো সেলফে প্রিয় কোন বই পড়বেন-পড়বেন করেও স্রেফ ব্যস্ততার কারণে পড়া হয়ে উঠছিল না – সেটি পড়ে ফেলুন এ সুযোগে। হাতের কাছে বই নেই, দোকানে যাবার দরকার নেই আপাতত, নেট হতে ডাউনলোড করুন প্রিয় কোন বই । ঘরের সবাই মিলে সিনেমা দেখুন। রান্না করুন। আমরা সাধারণত ঘরের বাইরের মানুষের সাথে আড্ডা দেই, আসুন এ সুযোগে আড্ডা দিই ঘরের মানুষগুলোর সাথে, কর্মব্যস্ততার কারণে যাদের মুখও মাঝে মাঝে মনোযোগদিয়ে দেখা হয়ে ওঠেনা দিনের পর দিন, তাদেরকে একটা কৌতুক বলে হাসিয়ে দেই, ভেবে দেখুন তো কত কত দরকারী কথা, কত কত মনের কথা বলবেন বলবেন বলে পড়ে আছে মনের কোণে মাসের পর মাস, এ সুযোগে সেসব বলে ফেলি যাকে যা বলার, নিজেদের ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে তৈরি হই নতুন দিনের জন্য, যখন করোনা হাত গুটিয়ে নিবে, ফিরে আসবে পরিচিতি পৃথিবীর স্বাভাবিক সময় – তখন যেন আবার শুরু করতে পারি নতুন করে, নতুন উদ্যমে।
এত ভয়ের কিছু নেই, জানালায় তাকিয়ে কচি ঘাস দেখতে দেখতে পড়ুন জীবনানন্দকে:
কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয়
পৃথিবী ভ’রে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;
কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস— তেম্নি সুঘ্রাণ—
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে।
আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো
গেলাসে-গেলাসে পান করি,

এই ঘাসের শরীর ছানি– চোখে চোখ ঘষি,
ঘাসের পাখনায় আমার পালক,
ঘাসের ভিতর ঘাস হ’য়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার
শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।

লেখক : কবি, গল্পকার

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন: