শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মিজানুর রহমান মীরু

করোনাকালের বাংলাদেশ: আরও সচেতনতা প্রয়োজন



বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পরিচিত অনেকেরই আক্রান্ত হবার খবর প্রতিদিন পাচ্ছি। বিশেষ করে গত কয়েকদিনে সিলেটের অবস্থা যে খুবই খারাপ তার যথেষ্ট প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের আরও কিছু এলাকার অবস্থা আগে থেকেই অনেক খারাপ যাচ্ছে। বিষয়টা খুবই উদ্বেগজনক এবং এ অবস্থা থেকে আশু মুক্তির কোন লক্ষণও দেখছি না। বেশী মাত্রায় উদ্বেগের কারণ হলো- খবরে প্রকাশ হচ্ছে যে পরীক্ষার ফলাফলে ২০% লোকের করোনা পজিটিভ আসছে, অর্থাৎ প্রতি পাঁচ জনে একজন। এটা সত্যিই উদ্বেগজনক এবং টেস্টের পরিমাণ দেশের জনসংখ্যার তুলনায় কম হওয়ায় শঙ্কা আরও বেশি।

অন্যদিকে মৃতদের অনেকেই যথাসময়ে আইসিইউ সেবা না পেয়ে মারা যাচ্ছেন! মুমূর্ষু রুগী নিয়ে ২৪ ঘন্টা ঘুরেও আইসিইউ না পেয়ে মারা যাওয়ার খবর প্রতিদিনই আসছে। অনেকেই এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতাল ঘুরে এম্বুলেন্সে কিংবা রাস্তায় মারা যাচ্ছেন! সামর্থবান বা যাদের টাকা পয়সা আছে তারা প্রতিনিয়ত এরকম ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বেশীভাগ হাসপাতাল চিকিৎসা দিচ্ছে না। করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে যেতে বলছে। ওখানে গিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে। আবার গরীবের জন্য জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে যাওয়াই মুস্কিল, ওইসব হাসপাতালে আইসিইউ সেবা একদম নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে সামর্থের অভাবে অনেকেই চিকিৎসা সেবা পাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারছে না।

বিবিসি বাংলার একটি সূত্র বলছে- দেশব্যাপী প্রায় ১২০০টি আইসিইউ ইউনিটের মধ্যে ৩৯৯টি কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এর সবগুলো আবার স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়! অর্থাৎ একটি আধুনিক আইসিইউ ইউনিটে যে ধরণের উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল দরকার, সব জায়গায় তা নেই। রাতারাতি এসব ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল যোগান দেয়া ও ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করা মোটেই সম্ভবপর নয়। যেসব হাসপাতাল কোভিড-১৯ এর জন্য বরাদ্ধকৃত সেগুলো যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত তাও বলা যায় না। সব মিলিয়ে এক্ষেত্রে দেশের অবস্থা যে বেগতিক তা বললে অত্যুক্তি হবে না।

এখানে বলা প্রয়োজন যে, পৃথিবীর বড় বড় অনেক দেশে অঢেল অর্থ ও বিত্তবান সরকার এবং দক্ষ জনবলসহ লাখ লাখ আইসিইউ ইউনিট থাকার পরও বিপুল সংখ্যক মানুষ মরছে। এর বিপরীতে এমনও দেশ পৃথিবীতে আছে যেখানে একটাও আইসিইউ ইউনিট নেই! তারাওতো বেঁচে আছে অথবা বাঁচার চেষ্টা করছে। আমাদেরও যা আছে তা নিয়েই বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। সবকিছু পরিবর্তন করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেলেই আমরা বেঁচে যাবো, তেমন কিছু জোর দিয়ে বলা যায় না। তাই আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। মানুষকে যাতে আইসিইউতে যেতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। এর একমাত্র পথ হলো প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

কিন্তু দেশের মানুষের আচরণ দেখে মনে হয় না যে এই চরম সত্য মেনে নিয়ে সবাই বাঁচার চেষ্ঠা করছেন! সচেতন হওয়ার জন্য বারবার বলা হচ্ছে- আইন প্রয়োগ, প্রচার-প্রচারণা এবং যথাসম্ভব সাহায্য-সহযোগিতাও করা হচ্ছে। কিন্তু ধৈর্য্য ধরতে কেউ রাজি নয়; প্রশাসনের কথা মানতে রাজি নয়। শুধু একে অন্যকে দোষারোপ করতে দেখি। কেউ বলেন- সব দোষ সরকারের, কেউ বলেন ডাক্তারদের, কেউ আবার মন্ত্রী, আমলা কিংবা জনপ্রতিনিধিদের দোষ নিয়ে সোচ্চার। এই দূর্যোগ যেমন কেউ ইচ্ছে করে ডেকে আনেনি, তেমনি পরিস্থিতি এরকম করে তোলার পেছনে বিন্দুমাত্র দোষ কারও নেই তাও বলা যায় না। সরকারের সমন্বয়ের অভাব আছে, জনগণের সদিচ্ছার ঘাটতি আছে। লুটেরাদের মধ্যে লুটেপুটে খাওয়ার প্রবণতা অবশ্যই বিদ্যমান আছে। এসব নতুন নয়, আমরা সবসময় এসমস্ত দোষের বোঝা ঘাড়ে নিয়েই বেঁচে আছি।

তদুপরি, জনপ্রতিধিদের দোষ-গুণ যথাসময়ে বিচার করতে না পারার দোষও জনগণ অস্বীকার করতে পারে না। ভোটের সময় দোষ না খোঁজে এখন খোঁজে খুব একটা লাভ নেই। খারাপ লোক নির্বাচিত করে তাঁর কাছ থেকে ভালো কাজ আশা করা যায় না। কেউ বলতে পারেন, ভোট ঠিকমতো হয়নি! এ কথার যুক্তি আছে। কিন্তু সঠিক ভোট যখন হয় তখনতো টাকা ছাড়া খুব কম মানুষ জিততে পারে। ইলেকশনে ভালো কোন প্রার্থী হেরে গেলে আমরা প্রকাশ্যে বলে থাকি ‘উনি ভালো মানুষ, কিন্তু টাকা পয়সা নেই বলে পাস করতে পারেননি’! এটা খোলামেল বলতে পারাটা আমাদের জন্য স্বাভাবিক!

তবে এধরণের কথা আমাদের ভেতরের অন্ধকার জগৎকে তুলে ধরে, আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। তাই মুখে অনেক বড় বড় কথা বললেও আমরা মূলত: প্রতিক্রিয়াহীন জড় বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছি। আমরা মেনে নিয়েছি এবং প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে মিশিয়ে দিচ্ছি চলমান গড্ডালিকা প্রবাহে।

তাছাড়াও আরেকটা সত্য হলো যে, দলগুলো অনেক খারাপ লোককে নমিনেশন দেয়। মানুষ তাহলে যাবে কোথায়? হয়তো এমন দিন আসবে, যখন খারাপ লোককে নমিনেশন দিলে দলীয় কর্মীরা সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করবে। ঐ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবে না। এরকম যে হয়নি তা নয়, হয়েছে এবং হওয়া উচিত। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে অচিরেই আরও ব্যাপক আকারে এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন হবে বলেই মনে করি। কথাগুলো যদিও এই আলোচনার বিষয় নয়, তবু এ নিদানকালে প্রতিদিন বিভিন্ন জনের আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছে বলেই বললাম।

দিবারাত্রি ফেইসবুকে, পত্রিকায় এবং বিভিন্ন টকশোতে এসব আলোচনা সমালোচনা দেখতে এবং শোনতে আর ভাল্লাগে না। নিশ্চিত করে বলতে পারি- করোনার মধ্যে সব চেয়ে বেশি টকশো আমরা বাঙালিরাই করেছি এবং মানুষকে নানান কিসিমের সাজেশন দিয়েছি। টকশোগুলো খারাপ না ভালো সেটা বিচারের দায় আমার নয়, তবে এগুলোতে যে সতর্কতামূলক বাণী প্রচার হয় বা হচ্ছে তা কেউ মানছে বলে মনে হয় না। মানলে অবস্থা এরকম হতো না।

আমাদের দেশে করোনা বিশেষজ্ঞের অভাব নেই, কিন্তু কোন ভাবেই কাজ হয় না! ফেইসবুকে লক্ষ লক্ষ সচেতন পোস্ট করা হয়। পাড়ায় মহল্লায় মাইকিং করে মানুষকে বোঝানো হয়। লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, কোভিড, করোনা এসমস্ত শব্দ জানে না এমন বাঙালি এখন আর পাওয়া যাবে না। তবে কেন এরকম হলো? এতো উদ্যোগ, এতো সচেতনতার পরও কেন পরিস্থিতি এরকম? এর উত্তর একটাই হতে পারে ‘অসচেতনতা’।

এখনও সময় আছে, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে প্রতিরোধ সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে বাঁচার লড়াইটা যেখানে মূখ্য, সেখানে সবাই মিলেই বাঁচতে হবে। এ পরিস্থিতিতে একা একজনের বা কোন গোষ্ঠীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। যদিও অনেকেই মনে করেন ‘আমি একাই বাঁচবো, আমার কিচ্ছু হবে না’! অবশ্যই বোঝতে হবে যে, করোনার ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসা নেই এবং সুযোগ সুবিধা বা টাকা পয়সা কোন কাজে আসছে না বলে বিভিন্ন দেশে প্রমাণ হয়েছে। তাই শুধু অভিযোগ না করে স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে ব্যক্তিগত সুরক্ষার মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র পন্থা।

লেখক : কবি, সাধারণ সম্পাদক – প্রবাসী বালাগঞ্জ ওসমানীনগর এডুকেশন ট্রাস্ট

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!