সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

দীপংকর শীল

অরুণ শীল-এর ১০০ কিশোরক‌বিতা : প্রসঙ্গ শিক্ষা



কবি অরুণ শীল দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সাহিত্য চর্চায় নিমগ্ন রয়েছেন। সাহিত্যের নানান শাখায় পদচারণা করলেও তিনি মূলত শিশু সাহিত্যিক হিসেবে সমধিক পরিচিত। শিশুসুলভ একটি সুন্দর মনের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। শিশু-কিশোরদের অন্তরপ্রদেশ স্পর্শ করে কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের আবেগ-অনুভূতি, স্বপ্ন-কল্পনা, সুকৌশলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন শিক্ষাদীক্ষার নানান অনুষঙ্গ। এছাড়াও তাঁর কবিতায় রয়েছে দেশপ্রেম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতনতা, প্রকৃতির রূপসৌন্দর্যে মুগ্ধতাবোধ এবং বহুমাত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিচয়। তাঁর সম্পর্কে কবি ও শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়ৃয়া লিখেছেন, ‘বাংলা কিশোরকবিতার এক নিষ্ঠাবান কারুকর্মী অরুণ শীল। তার সৃজনশীল মেধার সর্বোচ্চ প্রকাশ তিনি ঘটিয়েছেন কিশোরকবিতা অঙ্গনে। শব্দ ছন্দের সুনিপুণ বুননে কল্পনার মায়াজালে কিশোরকবিতার অন্তরাত্মা স্পর্শ করার কঠোর সাধনায় ব্রতী তিনি। গভীর হৃদয়ানুভূতি আর নিবিড় যত্নের ছাপ স্পষ্ট তাঁর কবিতার চরণে চরণে। কৈশোরের স্বপ্ন-কল্পনা, আনন্দ-বেদনা, দুরন্তপনা, আনাড়িপনা, কৌতূহলপ্রিয়তা, অভিযানপ্রিয়তা, দুর্বুদ্ধিতা, নির্বুদ্ধিতা, অপরিণামদর্শিতা, আবেগপ্রবণতা, অপমানবোধ, আত্মসম্মানবোধ সব বৈশিষ্ট্যই তার কবিতায় নুতুন মাত্রা পেয়েছে।’ তাঁর সম্পর্কে কবি উৎপল বড়ূয়া বলেছেন, ‘লেখক অরুণ শীল নিজেকে শিশুদের চরিত্রের কাতারে সামিল করেই কিন্তু মিশে গেছেন অবর্ণনীয় সৌন্দর্যে। ছোটদের সাথে মিশে গিয়ে ছোটো হয়ে তিনিও ছোটোদের কথা ছোটোদের মতো করে বলেছেন। আর সেই ছোট শিশুদের মনের একান্ত সংলাপও তিনি সেই কারণে অবলীলায় বলতে পেরেছেন পরম সাহসে।’ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেছেন, ‘অরুণ শীলের প্রায় সব কবিতাই পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য।’ কবিপ্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি নানা সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘১০০ কিশোরকবিতা’ গ্রন্থ। এই আলোচনায় তাঁর ‘১০০ কিশোরকবিতা’র শিক্ষা প্রসঙ্গটির বিষয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের নানাবিধ শাখার মধ্যে শিশুসাহিত্য শাখাটি এখন খুবই জনপ্রিয়। এ ধারার সাহিত্যকর্মী অন্যান্য শাখার সাহিত্যকর্মীর মতো এতটা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন না। কেননা, তারা যখন সাহিত্য রচনা করেন তখন তাদের মনে থাকে তাদের রচনার পাঠক প্রধানত শিশু-কিশোর। শিশু সাহিত্য শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত হলেও তা সকল বয়সের, সকল স্তরের পাঠকের। বড়রা যখন শিশুকিশোরদের জন্য রচিত সাহিত্য পাঠ করেন, ক্ষণিক সময়ের জন্য হলেও তারা স্মৃতিকাতর হন এবং রসরূপ আস্বাদন করেন। এজন্য একজন শিশু-সাহিত্যিক শিশু মনের সকল স্তরকে স্পর্শ করে তাদের রচনা সার্থক করেন এবং তাতে সর্বজনীনতা আনার চেষ্টা করেন। আর এই কাজটা একমাত্র শক্তিমান ও সহানুভূতিশীল সাহিত্যকর্মীর পক্ষেই সম্ভব।

শিশু-কিশোরদের বয়স, বিচার, বুদ্ধি ও কল্পনাপ্রবণ মন অনুযায়ী রচিত সাহিত্য শিশুসাহিত্য হিসেবে পরিচিত। শিশুসাহিত্যকে আবার কিশোর-সাহিত্যও বলা হয়। এই শিশুসাহিত্য বা কিশোর-সাহিত্যের রয়েছে নানা প্রকারভেদ। এর মধ্যে ‘কিশোর-কবিতা’কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কবি ও শিশু সাহিত্যিক সুজন বড়ূয়া কিশোর কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে- ‘কিশোর উপযোগী অনুভূতির রঙে রঞ্জিত শব্দমালার সান্নিধ্যে সমধুর ছন্দে কোনো বিশেষ সৌন্দর্যের প্রকাশই কিশোর কবিতা।’ কবি ও শিশু সাহিত্যিক রাশেদ রউফ বলেন, ‘সুস্পষ্ট বিষয় বৈচিত্র্যে নরম নকশামেদুর শব্দবিন্যাসে এবং মনস্তত্ত্বের নিবিড়তম সংলগ্নতায় কৈশোরিক অনুভূতি স্নিগ্ধ কবিতাই কিশোর কবিতা।’

কিশোর কবিতার বৈশিষ্ট্যকেও বিভিন্ন লেখক বিভিন্নভাবে চিহ্নিত করেছেন। রফিকুর রশিদ কিশোর কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন, ‘খেয়ালি দুরন্তপনার পাশে সম্ভাবনাময় সৃজনশীলতা, অন্তহীন কল্পনার পাশে আনন্দ বেদনার বাস্তব অনুভূতি আছে, আছে মননশীলতার উন্মেষ এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশের লক্ষণ।’

প্রমথ চৌধুরী মনে করতেন সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য আনন্দ দান করা, কাউকে শিক্ষা দেওয়া নয়। ‘সাহিত্যের মানবাত্মা খেলা করে এবং সেই খেলার আনন্দ উপভোগ করে।’ আনন্দ উপভোগ করতে করতে যদি তার সাথে শিক্ষাটাও হয়ে যায় তাহলে একই সাথে আমাদের জন্য দুটো লাভ। শিক্ষা ও আনন্দ। বর্তমানে সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষাটাকেও যুক্ত করা হয়েছে। প্রাবন্ধিক অজিত দত্ত বলেছেন, ‘আমাদের সকলেরই আজ একথা উপলব্ধি করা দরকার যে, শিশুর শিক্ষা ও শিশুর সাহিত্যকে অভিন্ন করে না তুলতে পারলে, শিক্ষাও হবে অসম্পূর্ণ এবং সাহিত্যও হবে পঙ্গু। এই শিক্ষার মানে ‘সদা সত্য কথা কহিবে’ এবং ‘চুরি করা বড় দোষ’ মাত্র নয়। এ শিক্ষার মানে শিশুর মনে যতগুলো সদ্বৃত্তি অপুষ্ট আছে, তাদের ফুটিয়ে তোলা। এই সদ্বৃত্তির মধ্যে আছে ভদ্রতা, সমবেদনা ও করুণা, আছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নির্ভীকতা ও স্বাদেশিকতা, আছে দয়া, দাক্ষিণ্য ও মমতা, আছে মমতাবোধ, আছে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সন্ধান। তেমনি আছে রসানুভূতি কাব্যবোধ ও সাহিত্য প্রীতি, আছে অনুসন্ধিৎসা এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো কিছুকে বিচার করার ক্ষমতা।’

তাই দেখা যায় বর্তমান শিশু সাহিত্যের লক্ষ্য শুধু আনন্দ দান করাই নয়; আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা দান করাটাও যুক্ত। শিশু সাহিত্যের পূর্বতন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে আমাদের সৃজনশীল কবি সাহিত্যিকরা তাদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে রূপান্তর করে চলেছেন শিশু সাহিত্যের অঙ্গন-প্রাঙ্গণ। তাই শিশু সাহিত্য কালের সাথে তাল মিলিয়ে রূপ বদলে নিয়েছে। এখন আর রাক্ষস-খোক্ষস, ভূত-প্রেত, দেও-দানা, ক্ষীরসাগর তথা অবাস্তব বিষয়গুলো শিশু সাহিত্যের উপাদান যোগায় না। যাকে শত চেষ্টা করলেও ছোঁয়া যাবে না, ধরা যাবে না, প্রমাণ করা যাবে না- এমন মিথ্যা বিষয় শিশু সাহিত্যের উপাদান না হওয়াই ভালো। অবাস্তব-অবিশ্বাস্য বিষয় অনেক সময় রহস্যময়তা সৃষ্টি করে, শিশু-কিশোরদের কল্পনায় ভাসায়। সাহিত্যের মাধ্যমে কল্পনায় উড়ানো ভালো, তবে সে কল্পনাকে যদি কোনো এক সময় বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় ‘বিশ্ব জগৎ দেখব আমি/আপন হাতের মুঠোয় পুরে’র মতো, তাহলে সে কল্পনাকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় জগৎ ও জীবনের কল্যাণের জন্য। এমন কল্পনা ও রহস্যময়তার পেছনে দৌড়াতে কোনো বাধা নেই। উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হতে দেখি কবি অরুণ শীলের কবিতায়।

ঘুম থেকে উঠার পর ব্যক্তির দিন শুরু হয়। প্রকৃতির নিয়মে প্রকৃতির দিন শুরু হয়। ব্যক্তি যদি প্রকৃতির নিয়ম অনুসরণ করে চলে তাতে প্রকৃতির অনুকূলে জীবনযাত্রা সহজ হয়। প্রকৃতি ও আমাদের চারপাশের জীবন থেকে প্রতিনিয়ত আমরা কিছু না কিছু অর্জন করে চলেছি। কবি সুনির্মল বসুর ভাষায়-
বিশ্বজুড়া পাঠশালা মোর
সবার আমি ছাত্র
নানান ভাবে নতুন জিনিস
শিখছি দিবারাত্র।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠা এবং সকাল সকাল ঘুমোতে যাওয়ার উপকারিতা শৈশবকাল থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের আলোচ্য গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘আয়রে সকাল আয়’ এর মধ্যেই কবি শিশুকে জাগিয়ে দেওয়ার জন্য ‘সকাল’কে আহ্বান জানিয়েছেন। ভোরের আলো ফোটলেই ফুলকুঁড়িরা ফোটবে। সমস্ত আঁধার ঘুচে যাবে।
মুখ লুকাবে ভয়ের দানো ফুটলে তোমার আলো
সে খুশিতে জাগবে পাড়া, জাগবে সকল ভালো।
এই ভালোর প্রত্যাশা দিয়েই শুরু হলো ‘১০০ কিশোর কবিতা’র সংকলন। আমরা প্রায় সবকটি কবিতার মধ্যেই দেখি শিশু শিক্ষার প্রসঙ্গটি নিপুণভাবেই এসেছে।

শিক্ষার নানাবিধ উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে সুন্দর ও সুস্থ্য জীবন রচনায় প্রবর্তনা দেওয়া, সফল সার্থক জীবনযাত্রার পথ ও পাথেয় দান করা, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা। ‘একটা নতুন ভোর’ কবিতায় এ উদ্দেশ্যের আংশিক প্রতিফলন দেখা যায়। মায়ের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মলিন মুখ দেখে শিশু যখন বলে,-
‘তোমার মুখে মলিন ছায়া দুশ্চিন্তা মাখা
তখন কি আর যায় ঘুমিয়ে থাকা?’
দেশমাতার সন্তান তখন সাহস করে দাঁড়াবে এবং আঁধার টুটে যাবে; কিন্তু কেমন করে, কোথা থেকে সেই শক্তি সাহস সঞ্চয় করবে তারও নিশানা রয়েছে ‘একটা নতুন ভোর’ কবিতার ‘যেমন করে জয় করেছো সেই একাত্তর’ এর মধ্যে। একাত্তর শব্দটা উচ্চারণ করার সাথে সাথেই শিশুকে নিয়ে যাওয়া হয় সেই  উচ্চাকাঙ্ক্ষা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়।

জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে হলে, সুনাগরিক হতে গেলে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল্যায়ন হয় পরীক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষার্থীর সামনে যখন পরীক্ষা তখন তার অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া; কিন্তু শিশু কিশোরদের কোমল মনকে অবশ্যকর্তব্য থেকে বিচ্যুত করতে তাদের সামনে কত শত লোভনীয় অফার বিদ্যমান থাকে। এসবের প্রলোভনে পড়ে যাতে শিশু তার কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠাবান হওয়া থেকে বিচ্যুত না হয় তার জন্য কবি লিখেন ‘সামনে আমার পরীক্ষা’ নামক কবিতাটি এবং শেষ স্তবকে বলেন-
আহা বাপু! সবুর করো,
যাচ্ছি স্যারের বাড়ি;
সামনে আমার পরীক্ষা তো
পড়াটা দরকারি।
পরীক্ষা শেষ- পড়ার চাপ কম। এখন খেলাধূলা করা যায়। কোনো এক ছুটির সকালটাকে কবি ভাবে, ভাষায়, ছন্দে, আনন্দে, চিত্রে ও সাম্যচেতনায় উপভোগ্য করে গড়েছেন ‘ছুটির সকাল’ কবিতাটি। শিশুরা খেলতে যাওয়ার সময় যদি বিভিন্ন ইভেন্ট থেকে অংশগ্রহণের আহ্বান আসে, তখন তারা কী সিদ্ধান্ত নিবে তা নিয়ে হয়তো তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকতে পারে, এমন ক্ষেত্রে কবি তার সুন্দর একটা সমাধানও করে দিলেন। চল সবাই মিলেমিশে ছুটিরসকালটাকে উপভোগ করি।
ছুটির সাথি খেলার সাথি
করব এখন কাকে?
সবার সাথে ভাগ করি তাই
ছুটির সকালটাকে।
এই কবিতাটি পড়ে যখন আট বছর বয়সী কোনো এক শিশুকে ‘হাওয়ার আনন্দ’ নাম দিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করতে দেখি তখন বোঝতে অসুবিধা হয় না যে এ কবিতার ভিতর এমন কিছু একটা আছে- যা শিশুদের মনকে আপ্লুত করে এবং সক্রিয় করে রাখে। শিশুরা কখনো কখনো আনমনা হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়, ফড়িং, প্রজাপতির পেছনে পেছনে দৌড়ায়, ধরতে চেষ্টা করে। শিশুদের এই খেয়ালি স্বভাব নিয়ে এক আনন্দময় দৃশ্য অঙ্কন করেছেন ‘ঢেউভাঙা রোদ্দুরে’ কবিতায়।

শহর আর গ্রামের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কার্যোপলক্ষে শহরে বসত গড়া মা-বাবাদের সন্তান গ্রাম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। স্মৃতিকাতর মা-বাবার মুখ থেকে গ্রামের গল্প শুনে, তাদের ছেলেবেলার দুষ্টুপনার কথা শুনে শিশুদের মনেও গ্রাম দেখার স্বপ্ন জেগে উঠে। তাই কবি শিশুদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে লিখেন ‘ফিরে পেতে চাই’ কবিতাটি। শিশু এবার বাবার কাছে আবদার করেছে স্কুল ছুটি হলে গ্রামে নিয়ে যেতে। ঘুড়ি উড়ানো, আমকুড়ানো, গ্রাম ঘুরে দেখা, ইচ্ছা মতো খেলাধূলা করা, পুকুরে নেমে সাঁতার শেখা, মেলায় বেড়ানো ইত্যাদি বিষয়গুলো তারা পরখ করতে চায়। শুধু পড়া আর পড়া, স্কুল, কোচিং, হোমওয়ার্কের চাপে শিশুদের আনন্দময় শৈশব অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল কবি এবার তাদের আনন্দময় শৈশবটুকু ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন জাগাতে রসরূপ দিয়েছেন ‘ফিরে পেতে চাই’ কবিতায়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অবিস্মরণীয় ঘটনা। এর প্রভাব সমস্ত বাঙালির চেতনায় চির জাগরূক। একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের সাহিত্য অঙ্গনকেও করেছে সমৃদ্ধ। বাঙালি কবি সাহিত্যিকরা জাগতিক নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করলেও একুশ এবং একাত্তর নিয়ে কিছু না লিখলে যেন তাদের কিছুতেই পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটে না। আমাদের আলোচ্য কবিও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি শুধু তাঁর পাঠককেই নন, নিজেও তৃপ্ত হওয়ার জন্য একুশ-একাত্তর নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতির মধ্যেও নির্দেশনা আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। তাদের চিন্তা-চেতনায় দেশাত্মবোধ জাগ্রত করতে হবে। জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা, দেশজ আবহ প্রভৃতি উপাদান দিয়ে জাতীয় মনন কাঠামো গড়ে দিতে হবে। বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে এ কাজগুলো করে থাকেন। আমাদের আলোচ্য কবিও তাই করেছেন। ভাষা এমন একটি উপাদান যা আছে বলেই মানুষ সৃষ্টির সেরা প্রাণী এবং মনের হুশ আছে বলেই আমরা মানুষ। প্রবাদে বলে অহংকার পতনের মূল কিন্তু সকল অহংকার পতন ডেকে আনে না; বরং কোনো কোনো অহংকার আমাদের উত্থান ঘটায়- যেমন ঘটিয়েছিল আমাদের ভাষা আন্দোলনে। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত একুশের শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বাঙালি হিসেবে আমরা যা অর্জন করেছি তাকে নিয়ে আমরা অহংকার করতেই পারি। কবির দৃষ্টিতে এই একুশ আমাদের ঐতিহ্যময় সংস্কৃতিকে যেমন রাঙিয়ে দিয়েছে তেমনি আমাদেরকে সাহসী করেছে, আমাদেরকে সত্য বলার শক্তি দিয়েছে, সাম্য ন্যায়ের পথে হাঁটতে শিখিয়েছে, আমরা শোষিত জাতি হিসেবে অন্য শোষিতের কষ্ট অনুধাবন করতে পারি এবং শোষিত-নির্যাতিত-নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়াতে পারি। তাইতো এ সংকলনের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতায় আমরা দেখি-
আমাদের যত প্রিয় ঐতিহ্য গর্ব অহংকার
পহেলা বোশেখ, নবান্ন মেলা, পৌষ-পার্বণ আর
মহুয়ার পালা, মনসার পুঁথি, ভাটিয়ালি জারি সারি
সবকিছুতেই রাঙিয়ে দিয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি।

জাতিকে করেছে অসীম সাহসী মনোবলে বলীয়ান
কণ্ঠে দিয়েছে সত্য সাম্য ন্যায়ের জয়গান
পৃথিবীর যত শোষিতের পাশে আমরা দাঁড়াতে পারি
এমন শক্তি দিয়েছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।

একুশের ভোর বেলায় যখন শহিদ মিনারে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে, আবেগে আপ্লুত হয়ে শহিদদের প্রতি ভালোবাসা জানায়, সাথে সাথে জনতার চেতনায় যে বোধ জাগ্রত হয়, শিশু-কিশোরদের মনেও যে প্রতিক্রিয়া হয়- তাও কবি তাঁর ‘একুশের ভোরবেলা’ কবিতায় তুলে এনেছেন এবং পাঠকের চেতনায় এটাও ছড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে যে-
তোমার ছোঁয়ায় ঘুচে যায় যত অশুভ অন্ধকার
তোমার কাছেই হার মানে সব শোষক-স্বৈরাচার।
অনুরূপ ‘স্বাধীনতা’ কবিতায়-
স্বাধীনতা মানে
তোমার আমার বন্ধুতা-ভালোবাসা,
সুখে দুখে মিলেমিশে থেকে এগিয়ে যাবার আশা।
কিংবা ‘বিজয় দিবসে’-
আবার কখনো দত্যি দানোরা বাংলায় দিলে হানা,
আমরা সবাই রুখে দাঁড়াবোই শত্রুর আছে জানা।

জীবনে সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়ার জন্য আমরা অনেক সময় মহাপুরুষদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে থাকি। মহাজ্ঞানী মহাজনদের জীবন চরিত পাঠ করেও আমরা অনুপ্রাণিত হই। আমাদের আলোচ্য গ্রন্থেও রয়েছে সেরকম কতিপয় মনীষী কেন্দ্রিক কবিতা। ছোটদের জন্য রচিত একটা কবিতায় মহাপুরুষদের যতটুকু তুলে আনা সম্ভব তাই করেছেন কবি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুখ’। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং আমরা পাই লাল সবুজের পতাকা- এই পতাকায় মিশে রয়েছে জাতির পিতার মুখ। বিষয়টির অবতারণা করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কবি। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখেছেন ‘তোমাদের জন্য’। চমৎকার ব্যঞ্জনায় মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের মানসপটে ভেসে উঠেন এবং কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও বলি-
তোমাদের সংগ্রাম অবিনাশী কীর্তি
সাহসের ইতিহাস নিয়ে করি গর্ব
তোমাদের প্রিয় এই বিজয়ের পতাকা
আমরাই চিরকাল উঁচু করে ধরব।

চিত্রশিল্পী হাশেম খানকে নিয়ে লিখেছেন ‘প্রিয় হাশেম খান’ কবিতা। এখানে ভবিষ্যত আঁকিয়েদের জন্য রয়েছে প্রেরণা। এভাবে শিশুমনকে প্রাণিত করতে বিদ্যাসাগর, সিন্দাবাদ, পাখি প্রেমিক সলিম আলী, কাশফুল রঙ চুলের কবি’ শামসুর রাহমান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ মনীষী এসেছেন কাব্যিক মাধুর্যে। ‘বিদ্যাসাগর’ কবিতার শিক্ষার্থীটি যেন আমাদের চারপাশে রয়েছে অহরহ। যাদের মনে অদম্য কৌতূহল আর ইচ্ছে শক্তি রয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। স্কুলের পড়াও ঠিকমতো শিখতে পারছে না, ঘরে পড়াটা শিখিয়ে দেবারও কেউ নেই। পড়া শিখতে না পারার লজ্জা পেতে হয় স্কুলে। সব লজ্জা থেকে মুক্তি পেয়ে ইচ্ছে জাগে অনেক উঁচু হওয়ার। বিদ্যাসাগরের মতো উঁচু হতে কবি শক্তি যোগান এভাবে-
ইচ্ছেরা দৃঢ় হয় কঠিন শপথে
আরো আরো মনোসংযোগ
পাঠগুলো যেন পোষা জোনাকির দল
জ্বালে কী অদম্য আলোক।

এভাবে কাব্যের চমৎকার বুননে এক একটা কবিতা হয়ে উঠেছে দারুণ উপভোগ্য এবং চেতনায় এনে দেয় এক নতুন শক্তি। প্রকৃতির রূপমাধুর্য আস্বাদন করে কবি যেমন আনন্দ পান তেমনি তাঁর পাঠককেও সৌন্দর্যের অনুভবে মাতিয়ে রাখেন। ‘মেঘ জমে রোদ হচ্ছে ফিকে’ কবিতাটির এমন এক অনুভূতি ও রসে আপ্লুত করে রাখে পাঠককে এবং পাঠ শেষে পাঠকের মনের নির্মল হাসি লক্ষ্য করার মতো। এই কবিতায় প্রকৃতির রূপমাধুর্য আস্বাদন শুধু কবিই করছেন না- তাঁর দৃষ্টি দিয়ে পাঠকও সেই রূপ দেখে নিচ্ছেন। দৃষ্টিকাড়া নান্দনিক প্রকৃতির রূপ কল্পনা ও বাস্তবের সমন্বয়ে ভাবে বিহ্বল হয়ে ভাষা ও ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি এসে যেন আমাদের ভিজিয়ে দেয় এবং বাড়ির দিকে ছুটতে হয়। এই বাড়ির দিকে ছুটে যাওয়াটা বিরক্তির নয়; বরং আনন্দে মাতোয়ারা হয়েই ঘরে ফেরা। এভাবেই ধরা পড়ে তাঁর রসরূপ সৃষ্টির সার্থকতা। তাঁর কবিতায় বাজে সঙ্গীতের সুর, দেখা যায় প্রকৃতির বর্ণিল শোভা, জেগে উঠে শিশুসুলভ নিষ্পাপ অনুভূতি, কখনও বা ধরা দেয় অপরূপ সৌন্দর্যের বিশালত্ব। মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের উদ্দীপনাও সৃষ্টি করে তাঁর কবিতা। ছন্দ সচেতন এই কবি ভাব অনুযায়ী ছন্দ প্রয়োগ করেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। কবিতাগুলোর রসাস্বাদনের সাথে সাথে আমাদের অবচেতন মনে স্থায়ী হয়ে যায় কোনো কোনো ইতিবাচক ভাবধারা যাকে প্রকারন্তরে আমরা শিক্ষা বলে অভিহিত করি। তাই আমরা মনেকরি শিক্ষণীয় বিষয়টি কবি অরুণ শীলের কাব্যে যথার্থই প্রতিফলিত হয়েছে।

আরও একটি কবিতার কথা বলে আলোচনার ইতি টানব। ‘চাঁদের বুড়ি’ আমাদের রূপকথার এক কাল্পনিক চরিত্র। বাস্তবে নাই কিন্তু কল্পনায় আছে, লোককথায় আছে। নাই কিন্তু আছে- এটা আমরা বিশ্বাস করি। বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে বহু কথা আছে- বহু বিতর্ক আছে। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে কবি-সাহিত্যিকরা অজস্র সাহিত্য রচনা করেছেন। এসব সাহিত্য পড়ে আবার কেউ কেউ কল্পনায় আরও কোনো এক অদ্ভুত বিশ্বাস সৃষ্টি করে ফেলেন। অনেক সময় বিশ্বাসের পেছনে কার্য-কারণ সম্পর্কটাও কেউ খুঁজেন না। ফলে কেউ কেউ অযৌক্তিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে এক ধরনের বিকারগ্রস্ত হয়েই জীবন পার করে দিচ্ছেন। যা মিথ্যা, যার কোনো বাস্তব রূপ নেই- এমন বিষয় নিয়ে এক সময় আমাদের সাহিত্য রচিত হয়েছে। শিশু সাহিত্যেও রয়েছে তেপান্তরের মাঠ, দৈত্য-দানব, ভূত-পেত্নী, লালপরী, নীলপরী, রাক্ষস-খোক্ষস, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি, পঙ্খিরাজ ঘোড়া, ক্ষীরসাগর ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোর অস্তিত্ব নেই বলে আজকালকার মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের তা পড়তে দেন না। একসময় যারা আধিভৌতিক বিষয় কেন্দ্রিক সাহিত্য পড়েছেন, তাদের অজান্তেই তাদের মনে এক ধরনের ভয় ঢুকে গেছে। যেমন কোনো কোনো শিক্ষিত মানুষকে দেখেছি এখনও পুকুরের পানিতে একা একা নামতে ভয় পান। কারণ, তারা বিশ্বাস করেন জলপরী টেনে নিয়ে যাবে। এমনিতেই আমাদের বিজ্ঞান চর্চা কম। যাঁরা বিজ্ঞানের শিক্ষক তাঁদের মধ্যেও দেখা যায় অবৈজ্ঞানিক জীবনাচরণ। তাই বাস্তবানুগ সাহিত্য রচনার জন্য এখনকার কবি-সাহিত্যিক তাগিদ অনুভব করেন। ‘বিশ্বাস’ একটি বিতর্কিত শব্দ। তবুও বিশ্বাসের উপর ভর করেই চলে যাচ্ছে দিনকাল। ‘চাঁদের বুড়ি’ কবিতায় কবি এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন কি না! বিগত সাহিত্য জগতের অস্তিত্বহীন বিষয়গুলো নিয়ে সম্ভবত এখন আর কেউ আকর্ষণবোধ করেন না। ‘চাঁদের বুড়ি’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন বিগত শিশু সাহিত্যের অনেক উপাদানের মধ্যে ‘চাঁদ’ এখনও টিকে আছে। কারণ, চাঁদ অস্তিত্ববান। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে অভ্যস্ত শিশু-কিশোরদের জন্য তাই সার্চ, ওয়েবসাইট, ইয়াহু ডট কম, গুগল, রিমোট, টিভি, এসি, ফ্যান, কম্পিউটার ইত্যাদি শব্দগুলো কবিতায় অনায়াসে স্থান করে নিচ্ছে। সমকালীন বাস্তবতা নানা অনুষঙ্গে সাহিত্যে স্থান করে নিবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তিবিদ্যার নিরিখে আমাদের শিশু সাহিত্য গড়ে উঠছে না। এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় কি এখনও আসেনি?

লেখক: প্রভাষক, কমলগঞ্জ সরকারি গণমহাবিদ্যালয়, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার।
dipok100@gmail.com

 

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!