শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মোঃ শিরমান উদ্দিন

ইতিহাসের প্রয়োজনে ইতিহাসই সংরক্ষণ করবে তোমায় চিরকাল



সিলেট-৩ আসনের প্রয়াত সাংসদ আলহাজ্ব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী তাঁর সুদীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন সমভাবে। ‘জন সেবাকে আমি ইবাদত মনে করি ’ নিজের এই বক্তব্যকে চরম সত্য বলে প্রমাণ করেছেন মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে। করোনার প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত মানুষের পানে ছুটে গেছেন জনপদ থেকে জনপদে। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই আক্রান্ত হলেন ঘাতক করোনায়।

ব্যক্তিগত জীবনে জনাব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী অত্যান্ত সৎ, নির্লোভ, ধার্মিক, পরহেজগার, স্মার্ট, শিক্ষিত,মার্জিত এবং প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসাবে সর্ব মহলে পরিচিত ছিলেন। নিজের মেধা, শ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে রাজনীতির চিকন ও পিচ্ছিল গলি পথকে পরিণত করেছেন সু-প্রশস্ত রাজপথে। কথায় ও কাজে অভূতপূর্ব সাদৃশ্য, উপস্থিত বুদ্ধি এবং সময় ও সুযোগের ব্যবহারে পারদর্শী জনাব চৌধুরী ছিলেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পুরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের ও আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয় জনাব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীকে ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের অনিবার্য অংশ হওয়ার দ্বার উন্মোচিত করে দেয়। ২০০৯ সালের ২৭শে জানুয়ারী নবম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসলো। এমপি হিসাবে জনাব চৌধুরী পূর্ব অভিজ্ঞতাহীন, উপর্যুপরি জীবনের প্রথম অধিবেশন। অথচ এই অধিবেশনেই জনাব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এমপি হিসাবে গড়লেন এক অমর কীর্তি। যে কীর্তি তাঁর আগে কোন এমপি করতে পারেননি এবং ভবিষ্যতেও কারো করার কোন সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে তিনিই প্রথম এবং শেষ। ২০০৯ সালের ২৯শে জানুয়ারি ইতিহাস গড়ার উন্মোচিত দ্বার দিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে মহান সংসদে প্রবেশ করলেন ডায়নামিক নেতা মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এমপি। যথা সময়ে ফ্লোর নিয়ে মহান সংসদে দাঁড়িয়ে, সমগ্র জাতির আশা-প্রত্যাশা ও অভিপ্রায়ের অভিব্যাক্তি স্বরুপ উপস্থাপন করলেন – ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি সম্বলিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রস্তাব’। আর সেই সাথে তিনি নিজে এবং তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগনকে নিয়ে গেলেন এক অনন্য উচ্চতায়। প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এক পর্যায়ে বলেছিলেন – মাননীয় স্পিকার, আমরা যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ব্যর্থ হই তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

ব্যাপক আলোচনা শেষে স্পিকার যখন তাঁর প্রস্তাবটি ভোটে দিলেন, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতাসহ সমগ্র সাংসদদের সর্বসম্মত ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হলো। তারপর যা হলো সবই তো ইতিহাস। সেই ইতিহাসে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীকে অমরতা দিতে ইতিহাসের দায়ই বেশি নয় কি? তাঁকে নিয়ে ইতিহাসের আগাম মূল্যায়ন হিসেবে এখানে আমি বলবো – কাল কে অতিক্রম করে তুমি আজ কাল জয়ীদের আসনে! ইতিহাসের প্রয়োজনে ইতিহাসই সংরক্ষণ করবে তোমায় চিরকাল!

এরপর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। গত এক যুগ ধরে স্থানীয়, আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন প্রবলভাবে আভিজাত্য ভঙ্গিমায়। গত বারো বছরে নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প সমুহে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় বারো হাজার কোটি টাকা।

তাঁর চির প্রস্থানের আজ পনেরো দিনের উপরে হতে চললো, তাঁর অবর্তমানে এই কয়টা দিন ধরে মনের মধ্যে একটি প্রশ্নই বারবার উঁকি দেয় তা হলো – সেদিন সংসদে সরকারি দলের অনেক বাঘা বাঘা নেতা এবং বর্ষীয়ান, বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ পার্লামেন্টেরিয়ানরা থাকতে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কেন প্রস্তাবটি উপস্থাপন করলেন? উত্তরও খুঁজি নিজ থেকে! ঐ যে, সময় ও সুযোগকে কাজে লাগানোর অপূর্ব দক্ষতা সেটাকেই কাজে লাগিয়েছেন জনাব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী।

তিনি প্রায়ই বলতেন ২০২০ সালে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করব, ২১ সালে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি সফল ভাবে উদযাপন করব, আমরা তা করছিও। কিন্তু সিলেট-৩ আসনের সর্বত্র আজ শুনশান নীরবতা, চতুর্দিকে শুধুই শুন্যতা। ১১ই মার্চের মেঘহীন বজ্রপাতে আজও স্তব্ধ সিলেটের প্রতিটি জনপদ।

শেষ করতে চাই কবি নজরুলের বিখ্যাত সেই লাইন গুলো দিয়ে –

অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বালাগঞ্জ উপজেলা শাখা।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!