মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শামসুল ইসলাম

বিএনপি-জামাত জোটের প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে, কর্মীরা জোট চায় না



শামসুল ইসলাম

ভেবেছিলাম, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু লিখব না, বলব না বা চিন্তাই করব না! কারণ আমার দৃষ্টিতে বর্তমান বাংলাদেশে এমন এক শাসন চলছে যেখানে গণতন্ত্র, নির্বাচন, বহুমত চর্চা ইত্যাদি বিষয় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। এমন একচেটিয়া শাসন চলছে যেখানে এক ব্যাক্তির কাছে সমস্ত ক্ষমতা এমন ভাবে ক্ষেন্দ্রীভূত, কুক্ষিগত যে, আর সব পক্ষ সদা ব্যস্ত তাকে খুশী করতে। এমন অবস্থায় ইচ্ছাকৃত নির্বাসন বা নিরবতাই শ্রেয় জ্ঞান মনে করি! তারপরও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে ক্ষেন্দ্র করে নানামুখী আলোচনা নিরবতা ভাংতে বাধ্য করল।
বিগত এক দশকেরও বেশী সময় বিএনপি যে সীমাহীন জুলুম, নির্যাতন ভোগ করছে তার জন্য বর্তমান অগণতান্ত্রিক সরকার যেমন দায়ী, তেমনি বিএনপির দায়ও কম নয়।
১) ১৯৯১ সালের নির্বাচনে কিছু আসনে জামাতের সাথে পারস্পারিক, বোঝাপড়ায় বিএনপি কিছুটা সুবিধা পেয়েছিল সত্য কিন্তু পরবর্তীতে ৯৬ সালে এই জামাত আওয়ামী লীগের সাথে মিলে তাদেরকে যেভাবে ক্ষমতা থেকে টেনে নামিয়েছিল তারপরও এদলকে প্রাণের প্রেয়সী ভাবার কোন কারণ ছিল না। এই নির্বাচনে তারা যদি আওয়ামী লীগের সাথে এভাবে একজোট হয়ে বিএনপি ঠেকাও আন্দোলনে না নামত তাহলে ১৯৯৬ এর নির্বাচনেও বিএনপিই হয়ত জয়ী হতে পারত। আর তখন বাংলাদেশের ললাটে আজকের স্বৈর শাসন হয়ত আসত না।

পক্ষান্তরে, ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামাতকে নিয়ে বা জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেছে কিন্তু তাদের সাথে নির্বাচনী জোটই করেনি, ক্ষমতার অংশীদারিত্বের তো প্রশ্নই উঠে না। জামাতের সাথে নির্বাচনী জোট না করেও যুগপথ বিএনপি বিরুধী প্রপাগান্ডায় তাদের সামিল করে আওয়ামী লীগ শতভাগ নির্বাচনী সুবিধা নিয়েছে। এখানেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় মিলে।

২) ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সব বিরুধী দল এক যোগে মাঠে নামে। নানা ইস্যুতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। বিএনপি জাপা (এরশাদ) পরবর্তীতে জাপা (নাজিউর রহমান মঞ্জ), ইসলামী ঐক্যজোট ও জামাতে ইসলামিকে নিয়ে ৪ দলীয় জোট গঠন করে। শেষ পর্যন্ত এই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করে। এই জোট কেবল যে নির্বাচন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল তা নয় বরং সরকার গঠনেও বিএনপি জামাতকে অংশীদার করে। ফলে স্বাধীনতা বিরুধী হিসাবে পরিচিত দলটি বাংলাদেশের ক্ষমতার ভাগ পায়। বিএনপির ললাটে জোটে যুদ্ধাপরাধীদের পতাকা দেয়ার অপবাদ।
অন্যদিকে এর মাধ্যমে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট মহাজোটের সমীকরণ সামনে নিয়ে আসে, যার ভুক্তভোগী বিএনপিই সবচেয়ে বেশী হয়েছে। কিভাবে একটু পরে ব্যাখ্যা করছি। অথচ এই নির্বাচনে কোন জোট না হলেও বিএনপি অন্তত ক্ষমতায় যাওয়ার মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারত। আর ন্যুনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যদি বিএনপি সরকার গঠন করত তাহলে জবাবদিহিতা আরো বেশী থাকত। জামাতকেও ক্ষমতার ভাগ দিতে হত না। জামাতকে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব দেয়ার মাধ্যমে দেশে বিদেশে যে ভাবমূর্তি সংকট তৈরী হয়েছে তাও এড়ানো সম্ভব হত। বাংলাদেশও ৯০ পরবর্তী নতুন স্বৈরশাসনে পড়ত না।

৩) ২০০১ সালে ভূমিধ্বস বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপি জামাত নিজেদের সব হিসাবের বাইরে ভাবতে থাকে। আওয়ামী লীগ সহ বিরুধী জোটকে আন্ডার এস্টিমেট করতে শুরু করে। নিজেদের উপর অতি আস্তার খেসারত তারা যে কেবল নিজেরাই দিয়েছে তা নয়, গোটা জাতি আজও এর ভুক্তভোগী। ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগ তৈরী অরাজকতার মধ্যে ইয়াজ উদ্দিন সরকারের অধিনে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। আওয়ামী লীগও কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান না মানলেও সরাসরি বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিনের অধিনে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে মেনে নিয়ে ৩০০ আসনে জাতীয় পার্টির সাথে মিলে মনোনয়ন জমা দেয়। কথিত আছে বিএনপির সাথে শলা পরামর্শ করে নির্বাচন কমিশন পতিত স্বৈরশাসক এরশাদকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে। আর এরশাদ ও তার দল অযোগ্য হলে বিএনপি জামাত জোটের সাথে ভোটে পেরে উঠবে না ভেবে আওয়ামী লীগও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। এখানেও জোট রাজনীতির নিয়ামক আওয়ামী লীগকে অনেকটা বাধ্য করে নির্বাচন থেকে সরে আসতে।
সে সুযোগে মইন, ফখরুদ্দীনরা ভারতীয় দূতাবাস সহ বিদেশীদের আশীর্বাদে ক্ষমতা নিয়ে নেয়। পরের ইতিহাস সবার জানা।
মইন – ফখরুদ্দীনের অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে বলতে গেলে একা লড়ে গেছেন খালেদা। শেখ হাসিনা, এ সরকারকে তাদের আন্দোলনের ফসল বলে দায়মুক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতে দিয়ে চিকিৎসার নামে দেশ ছাড়েন। জামাত, মইন – ফখরুদ্দীন তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল (কারণ তাদের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ আনেনি) ভেবে নিজেরাই ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে।

এদিকে মইন-ফখর খালেদাকেও দেশ ত্যাগের প্রস্থাব দেন। কিন্তু খালেদা নির্বাচন দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ইতিমধ্যে জনগণের মাঝে এ সরকারের প্রতি প্রাথমিকভাবে তৈরি হওয়া মোহ ভাংগতে শুরু করে। অবস্থার পরিবর্তন দেখে শেখ হাসিনাও দেশে ফিরে বন্দীত্ব বরন করেন, খালেদাও বন্দী হন।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মইন-ফখর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দিয়ে প্রস্থানের পথ খুঁজে। এ লক্ষ্যে বিএনপি ভাংগে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতির সুযোগ দেয় কিন্তু বিএনপি অফিস তালাবদ্ধ করে রাখে, বিএনপির প্রতি দমন পীড়ন অব্যাহত রাখে। শেষ পর্যন্ত লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরী না করেই নির্বাচন দেয়। খালেদাকেও মুক্তি দেয়। মুক্ত খালেদা নীল নকশা বুঝতে পারেন, নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দেন। কিন্তু জামাত নির্বাচনে যেতে চাপ দিতে থাকে। এমনকি তারা একা নির্বাচনে যাবার হুমকি দেয়। জানা যায়,ক্ষুব্ধ খালেদা তখনকার জামাত সেক্রেটারী প্রয়াত আলী আহসান মুজাহিদকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কি নিজের আসনে পাশ করে আসতে পারবেন? বলেছিলেন নীল নকশার নির্বাচনে মইন-ফখর আমাদের ৩০ টার বেশী আসন দেবে না। হয়েছিল ও তা-ই।

শেষ পর্যন্ত নানামুখী চাপে বিএনপি ও চার দলীয় জোট নির্বাচনে যায়, আর আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোট করে নির্বাচনে যায়। সে সময়ের ভোটের হিসাবে সারা দেশে বিএনপি জামাতের তুলনায় আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির ভোট বেশী হওয়ায় সংগত কারনেই আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় পায়। একারনেই শুরুতেই বলেছিলাম বিএনপি, আওয়ামী লীগকে যে জোটের পথ দেখিয়েছিল, সে পথেই তাদের পতন ঘটে। অথচ বিএনপি জামাতের সাথে জোট না করলে আওয়ামী লীগও হয়ত জাতীয় পার্টির সাথে জোট করত না।

৪) ২০০৯ সালের পর আজ পর্যন্ত বিএনপি জামাত যে নজির বিহীন দমন পীড়নের শিকার হয়, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একেবারেই নতুন। এমনকি ২০১৪ সালের এক তরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগও কিন্তু ধারণা করতে পারেনি তারা এমন দমন পীড়নের মাধ্যমে আজকের এমন একনায়কতন্ত্র চালু করতে পারবে! এজন্য নির্বাচনের আগে স্বয়ং শেখ হাসিনাও একে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হন রাজনীতির মাঠের পাকা খেলোয়াড় শেখ হাসিনা। এই করুন সময়েও বিএনপি জামাতের সাথে তাদের জোট অব্যাহত রেখেছে। যদিও গত পাঁচ বছরে কোন আন্দোলনই গড়ে তুলতে পারেনি এ জোট। তাই প্রধান দুদলের কর্মী সমর্থকদের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে কি দরকার এই জোট রাখার! বর্তমান পরিস্থিতিতে বরং দুই দলের আলাদা থাকাই অধিক লাভ জনক। তবে ৯৬ এর আগে আওয়ামীলীগের মত যুগপৎ আন্দোলনে সাথে থাকতে পারে জামাত।

শেষ করব সদ্য সমাপ্ত সিলেট সিটি নির্বাচন দিয়ে। অনেক ঢাক ঢোল পিটিয়ে এ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন না দিয়ে জামাত নিজেদের প্রার্থী দেয়। কেবল প্রার্থী দিয়েই শেষ নয়, নির্বাচনী প্রচারনায় তারা আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপিকেই আক্রমণ করে বেশী। সরকার ও প্রশাসন নজির বিহীন সহযোগিতা দেয় জামাতকে, পক্ষান্তরে বিএনপিকে রাখে দৌড়ের উপর। জামাত ভাবে জয়ী হতে না পারি বিএনপিকে দেখিয়ে দেব, আমাদের ছাড়া তোমরাও জিততে পারবে না। আর আওয়ামী লীগ ভাবে যাক, অন্য সিটির মত সব কেন্দ্র দখলে নেয়ার দরকার নাই! ২০/২৫ টি কেন্দ্র দখলে নিলেই তাদের প্রার্থী পার হয়ে যাবে, কারন জামাতের প্রার্থী আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি আরিফের জনপ্রিয়তা আর বিএনপি’র প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটের তুড়ে ২০/২৫ কেন্দ্র দখল কাজ দেয় নি। আর জামাত প্রার্থী জামানাত হারিয়ে নিজেদের ভোট পরিমাপ করতে পারেন।
এদিক থেকে সিলেট সিটি নির্বাচন জামাতের সাথে জোট রাখার যৌক্তিকতাকে মোটাদাগে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এবার নেতাদের কাছে তৃণমূলের জিজ্ঞাসা কেন এই জোট রাখা?

লেখক : সম্পাদক – ফ্রান্স দর্পণ

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!