মাছ খাওয়ার পর দুধ খেলে কি শ্বেতী রোগ হয় ভাঙল প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা

আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—মাছ খাওয়ার পর দুধ খাওয়া উচিত নয়। অনেকেই এতটাই ভীত যে, মাছ খাওয়ার পর দই, আইসক্রিম বা অন্য কোনো দুগ্ধজাত খাবার থেকেও দূরে থাকেন। ছোটবেলা থেকেই কানে কানে শোনা যায়, মাছ ও দুধ একসঙ্গে খেলে নাকি শরীরে সাদা দাগ পড়ে, এমনকি শ্বেতী রোগও হতে পারে।

কিন্তু এই ভয় বা বিশ্বাসের পেছনে কি সত্যিই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? নাকি এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি ভুল ধারণা? এ বিষয়ে এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস। সেখানে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের মতে, মাছ ও দুধ একসঙ্গে খাওয়া নিয়ে যতটা আতঙ্ক রয়েছে, বাস্তবে বিষয়টি ততটা জটিল নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই দুই খাবারের সংমিশ্রণ সাধারণত ক্ষতিকর নয়। বরং ভয় ও কুসংস্কার থেকেই এই ভুল ধারণার জন্ম।

শ্বেতী রোগ হওয়ার ধারণা কেন ভুল?

মাছ খাওয়ার পর দুধ বা দই খেলে শ্বেতী রোগ হয়—এমন বিশ্বাস বহু পুরোনো। অথচ শ্বেতী বা ভিটিলিগো একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ত্বকের রঙ তৈরির কোষগুলোকে আক্রমণ করে। খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মাছ ও দুধ একসঙ্গে খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মাছ ও দুধ একসঙ্গে খাওয়ার ফলে শ্বেতী রোগ হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি সম্পূর্ণই একটি ভ্রান্ত ধারণা।

পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাছ ও দুধ

পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায়, মাছ ও দুধের সংমিশ্রণ নিরাপদ। বিশ্বের নানা দেশে বহু জনপ্রিয় খাবারে এই দুই উপাদান একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। যেমন—ক্ল্যাম চাউডার বা বিভিন্ন সিফুড স্যুপে মাছ বা শেলফিশের সঙ্গে দুধ ও ক্রিম ব্যবহৃত হয়। আবার পশ্চিমা খাদ্যসংস্কৃতিতে ফ্রাইড ফিশের সঙ্গে মেয়োনিজ বা দইয়ের সস খাওয়াও খুব সাধারণ বিষয়। অর্থাৎ, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই মাছ ও দুগ্ধজাত খাবার একসঙ্গে খেয়ে আসছেন, তাতে কোনো বড় ধরনের ক্ষতির প্রমাণ নেই।

তাহলে সমস্যা কোথায় হতে পারে?

যদিও শ্বেতী রোগের ভয় সম্পূর্ণ অমূলক, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাছের প্রোটিন তুলনামূলক দ্রুত হজম হয়, কিন্তু দুধের কেজিন প্রোটিন হজম হতে সময় নেয়। এই দুই ধরনের প্রোটিন একসঙ্গে বা খুব কাছাকাছি সময়ে খেলে পেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।

বিশেষ করে যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স রয়েছে, তাদের গ্যাস, পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা অম্লতার মতো সমস্যা হতে পারে। তবে এগুলো শ্বেতী রোগ নয়, বরং সাধারণ হজমজনিত প্রতিক্রিয়া মাত্র।

এই ভুল ধারণার উৎপত্তি কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগে খাবার সংরক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত না থাকায় মাছ বা দুধ সহজেই নষ্ট হয়ে যেত। নষ্ট খাবার খেলে ত্বকে অ্যালার্জি, লাল বা সাদা ছোপ কিংবা র‍্যাশ দেখা দিত। তখন মানুষ ভুল করে এটিকে শ্বেতী রোগ ভেবে নিত। সেখান থেকেই কুসংস্কারটি ধীরে ধীরে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে।

উপসংহার

মাছ খাওয়ার পর দুধ বা অন্য কোনো দুগ্ধজাত খাবার খেলে শ্বেতী রোগ হওয়ার আশঙ্কা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তবে যাদের হজমের সমস্যা রয়েছে বা যারা দুধ সহ্য করতে পারেন না, তাদের জন্য এই দুই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার একসঙ্গে না খাওয়াই ভালো।

শেয়ার করুন: