ঐক্যের প্রতিশ্রুতি বিএনপি জামায়াত এনসিপির

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকে জুলাই অভ্যুত্থান নস্যাতের উদ্দেশ্যে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তা প্রতিহত করতে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেছে দেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল। গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা এ প্রতিশ্রুতি দেন।

বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এবং আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ, যার পেছনে বড় শক্তি কাজ করছে। ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য নির্বাচন বানচাল করা। তিনি বলেন, এই হামলা অত্যন্ত সিম্বলিক—এর মাধ্যমে তারা শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে এবং নির্বাচনের সব আয়োজন ভেস্তে দিতে চায়। এসব ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে এবং প্রশিক্ষিত শুটার মাঠে নামিয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য সবাইকে ভাবতে হবে—শুধু সরকার নয়, সকলকে দৃঢ় থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিভেদ যেন না ছড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে, তবে কাউকে শত্রু ভাবা বা আক্রমণের সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে। নির্বাচনের সময় উত্তেজনা তৈরি হলেও তা যেন নিয়ন্ত্রণের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হানাহানি শুরু হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েছে। দলগুলোর প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দলীয় স্বার্থের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের বিষয়েও সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

বৈঠকে ওসমান হাদির ওপর ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে সর্বদলীয় প্রতিবাদ সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এ সময় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যে যাতে ফাটল না ধরে, সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে তারা সুদৃঢ় অবস্থান নেবেন বলেও জানান। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর অভিযান পরিচালনার ওপর জোর দেন রাজনৈতিক নেতারা।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি। কোনো অবস্থাতেই পরস্পরকে দোষারোপ করা যাবে না। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানাতে হবে। কোনো অপশক্তিকে বরদাশত করা হবে না। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও জাতির স্বার্থে এবং জুলাইয়ের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের পরামর্শ দেন।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে একে অন্যকে দোষারোপের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিরোধীদের সুযোগ করে দিয়েছে। আগের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে একে অন্যকে প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে; সব দলকে তাদের কমিটমেন্ট ঠিক করতে হবে।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এ অভ্যুত্থানকে খাটো করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সুসংগঠিতভাবে জুলাইবিরোধী ক্যাম্পেইন চলছে, যা মিডিয়া ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে যেন অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ারা অপরাধ করেছে।

তিনি আরও বলেন, তাদের বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই এবং তা তারা নেবেন না। জুলাইকে সবাইকে একসঙ্গে ধারণ করতে হবে। জুলাইকে কে কী বলবে—এই টানাপোড়েনে জুলাইকে দুর্বল করা হচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারীরা অনৈক্যকে পরাজয় হিসেবে দেখছে। তারা ভারতে বসে অপতৎপরতা চালাচ্ছে, আর আমরা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারছি না। বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকারীদের থামাতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শেয়ার করুন: