আলঝেইমার রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন চীনের কুনমিং ইনস্টিটিউট অব জুলোজির একদল গবেষক। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ ব্যবহার করে মস্তিষ্কে জমে থাকা আলঝেইমারের জন্য দায়ী ক্ষতিকর প্রোটিন অপসারণের প্রক্রিয়া সক্রিয় করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণার অংশ হিসেবে ৯টি বয়স্ক বানরের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। সাত দিন ধরে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে তাদের ৪০ হার্টজ কম্পাঙ্কের মৃদু গুঞ্জন শোনানো হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, থেরাপি শেষে বানরদের মস্তিষ্কের শিরদাঁড়ার তরলে বিটা-অ্যামাইলয়েড প্রোটিনের উপস্থিতি প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে।
গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তন ইতিবাচক। কারণ আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত মস্তিষ্কে বিটা-অ্যামাইলয়েড প্রোটিন জমে প্লাক তৈরি করে, যা স্নায়ুকোষের মধ্যে যোগাযোগ ব্যাহত করে। তরলে এই প্রোটিনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো—মস্তিষ্ক তার প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দিচ্ছে।
এ গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এক সপ্তাহের শব্দভিত্তিক থেরাপির প্রভাব পরবর্তী প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এর আগে ইঁদুরের ওপর এমন পরীক্ষায় সাফল্য মিললেও প্রাইমেট বা বানরজাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি প্রথম কার্যকর ফলাফল।
মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম মূলত নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক ছন্দের ওপর নির্ভরশীল, যা বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। এ প্রসঙ্গে বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক জিউসেপ ব্যাটাগ্লিয়া জানান, আলঝেইমার রোগীদের ক্ষেত্রে এই মস্তিষ্কীয় ছন্দ দুর্বল ও বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। তাঁর মতে, ৪০ হার্টজ কম্পাঙ্কের শব্দ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ছন্দ পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়ে পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করার সংকেত দিতে পারে।
তবে গবেষকরা এখনই এটিকে নিশ্চিত চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করতে চান না। অধ্যাপক ব্যাটাগ্লিয়া সতর্ক করে বলেন, এটি একটি সীমিত পরিসরের গবেষণা এবং এই পদ্ধতি স্মৃতিশক্তি উন্নত করে কি না, তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। মানুষের ওপর বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়া এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত। এই রোগের কার্যকর নিরাময় এখনো নেই। ভবিষ্যতে মানুষের ওপর পরীক্ষায় সফল হলে, এটি আলঝেইমারের প্রথম নন-ইনভেসিভ বা শরীরে কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই প্রয়োগযোগ্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী চিকিৎসা পদ্ধতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝারি মাত্রার ভলিউমে ৪০ হার্টজ শব্দ শোনা সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে বাড়িতে নিজ উদ্যোগে এই ধরনের শব্দ শোনালে উপকার হবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। গবেষণায় ব্যবহৃত শব্দের সুর, মান ও সময় ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
