রোহিঙ্গা সংকট ভুলে না যাওয়ার আহ্বান ইউএনএইচসিআরের

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মানবিক সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি থেকে আড়াল না করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং এর সহযোগী মানবিক সংস্থাগুলো।

মঙ্গলবার জেনেভার পালে দে নাসিওঁ-এ অনুষ্ঠিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ বলেন, চলতি বছর মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে অধিকাংশ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

ইউএনএইচসিআর জানায়, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গারা বাস্তুচ্যুত হয়ে আসলেও ২০১৭ সালের আগস্টে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটে। ওই সময় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সেই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সংস্থাটির মতে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মানবিক সংকট ও অস্থিতিশীলতার কারণে সহায়তা তহবিলের ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে সীমিত সম্পদের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সেবাগুলোকে হুমকির মুখে ফেলছে।

গত মাসে বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা পূরণে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার আবেদন জানায়। যদিও চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও এ বছরের আবেদন গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম রাখা হয়েছে।

ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০১৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সহায়তা করেছে। তবে এখনো বিপুল মানবিক চাহিদা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে শরণার্থী পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে নারী, কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকে রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার নতুন রোহিঙ্গা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

এদিকে রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত। ফলে অনেকেই উন্নত জীবনের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে যাত্রার সময় প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন।

সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদে ত্রাণনির্ভরতা কমাতে তাদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি জরুরি। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় ৬০ শতাংশ পাওয়া গেছে। তবে কেবল ন্যূনতম সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়।

ইউএনএইচসিআর জোর দিয়ে বলেছে, মিয়ানমারে সহিংসতা ও সংঘাত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে থাকতে হবে। পাশাপাশি মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

শেয়ার করুন: