আবুল কাশেম অফিক

জুলাই আন্দোলনে গণমাধ্যমের ভূমিকা: সত্যের লড়াইয়ে কলম, ক্যামেরা ও আত্মত্যাগ

একটি রাষ্ট্রের তিনটি সাংবিধানিক স্তম্ভ আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ”। কারণ, একটি স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে এবং ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে। তাই যে কোনো গণআন্দোলন কিংবা জাতীয় সংকটে গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে পরিণত হয়। জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনই একটি অধ্যায়, যেখানে রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি তথ্যপ্রবাহও ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র। আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তে দেশের মানুষ জানতে চেয়েছেন আসলে কী ঘটছে? কোথায় সংঘর্ষ, কতজন আহত বা নিহত, কী বলছে সরকার, কী বলছে আন্দোলনকারীরা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মানুষের প্রথম ভরসা ছিল গণমাধ্যম।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আন্দোলনের শুরুতে অনেক মূলধারার গণমাধ্যম বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ ব্যাপকভাবে ওঠে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি, কোথাও কোথাও সংবাদ পরিবেশনে সতর্কতা বা আত্মনিয়ন্ত্রণ দেখা গেছে। এর পেছনে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা, আইনি ঝুঁকি গণমাধ্যমর গলা চেপে ধরা,দালালী চামচামি বা অন্যান্য কারণ নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা রয়েছে। একই সময়ে অনেক সংবাদমাধ্যম আবার সাহসিকতার সঙ্গে মাঠে থেকে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করেছে। এই দুই ভিন্ন চিত্রই জুলাই আন্দোলনে গণমাধ্যমের মূল্যায়নকে জটিল করে তোলে।

আন্দোলনের সময় অসংখ্য সাংবাদিক রাজপথে ছিলেন। তারা টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, গুলি, লাঠিচার্জ ও সহিংসতার মাঝেও ক্যামেরা চালু রেখেছেন। অনেক সাংবাদিক আহত হয়েছেন, অনেকের ক্যামেরা ভাঙচুর হয়েছে, সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (IFJ), কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) এবং বিভিন্ন দেশীয় সংগঠন সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে অন্তত পাচজন সাংবাদিক নিহত হন। তবে কিছু মানবাধিকার সংস্থা ছয়জন সাংবাদিক নিহত হওয়ার তথ্যও প্রকাশ করেছে। এছাড়া শতাধিক সাংবাদিক আহত হন। নিহত সাংবাদিকদের মধ্যে আবু তাহের মো. তুরাব, মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেনসহ আরও কয়েকজনের নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।
জুলাই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে মুহূর্তের মধ্যে ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে এমন অনেক ঘটনা সামনে আসে, যা পরে মূলধারার গণমাধ্যমও অনুসরণ করে প্রচার করে। তবে একই সঙ্গে গুজব, ভুয়া ছবি, পুরোনো ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। এই বাস্তবতায় মূলধারার গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করা। কারণ সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় যদি সত্য হারিয়ে যায়, তবে গণমাধ্যম তার বিশ্বাসযোগ্যতাও হারায়।

জুলাই আন্দোলন আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। মাঠে কাজ করা একজন সাংবাদিক যদি প্রতিনিয়ত হামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানির ভয়ে থাকেন, তাহলে সত্য তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার রক্ষারও শর্ত। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পক্ষ, ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা ক্ষমতার প্রভাব যেন সংবাদকে প্রভাবিত করতে না পারে। সংবাদ হতে হবে তথ্যনির্ভর, প্রমাণভিত্তিক এবং সব পক্ষের বক্তব্যসমৃদ্ধ। কারণ জনগণের আস্থা অর্জনই একটি গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আজ যখন আমরা জুলাই আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন শুধু ছাত্র-জনতার সাহস নয়, সাংবাদিকদের আত্মত্যাগও স্মরণ করা উচিত। কারণ ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে যেমন সংগ্রামী মানুষ থাকে, তেমনি সেই ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করার জন্যও থাকে কিছু নির্ভীক মানুষ যাদের হাতে থাকে কলম, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের এমন একটি গণমাধ্যম প্রয়োজন, যা হবে স্বাধীন, সাহসী, বস্তুনিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক। এমন সাংবাদিকতা, যা সত্য প্রকাশে কখনো আপস করবে না এবং জনগণের আস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই সত্যকে দমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। আর সেই সত্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌছে দেওয়ার দায়িত্ব গণমাধ্যমের।

জুলাই আন্দোলনের শহীদ ছাত্র-জনতা এবং দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো সাংবাদিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাদের আত্মত্যাগ শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র এবং জনগণের জানার অধিকারের প্রতীক হয়ে থাকবে।

লেখক: আবুল কাশেম অফিক, সাধারণ সম্পাদক – বালাগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাব।

শেয়ার করুন: