
ছবি :সংগৃহীত
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও বিক্ষোভ হয়েছে, আবার সমালোচনার মুখে কয়েকটি সিদ্ধান্ত থেকে মন্ত্রণালয়কে সরে আসতেও হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের মতামত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এনটিআরসিএর কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সভার কার্যবিবরণীতে এনটিআরসিএকে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে সীমাবদ্ধ রেখে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের হাতে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়।
এ সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনও হয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তার ভাষ্য, সভার রেজল্যুশনের আলোচনার একটি অংশ আলাদা করে প্রচার করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিতর্কের তালিকায় রয়েছে ভর্তি পদ্ধতিও। প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে প্রথম শ্রেণির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে।
এদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতাও আবার গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ভাইভার সময়সূচি প্রকাশ না হওয়ায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা ও মন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে আন্দোলন
টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গত মাসে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে সংসদে নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
প্রাথমিকের শিক্ষক বদলি নিয়েও পরিবর্তন
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির দায়িত্ব মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর আগে খসড়া নীতিমালায় বদলি কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচনার পর গত ১৮ জুলাই ওই বিধান বাতিল করা হয়। এর পরিবর্তে শিক্ষানুরাগী বা বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক বদলিতে নতুন কয়েকটি শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।
অ্যাডহক কমিটিতে চলছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দেশের বহু মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি নেই। পরিবর্তে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
ভিসি নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন
দেশের তিনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাইরে থাকা অধ্যাপকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন বিভাগের অধ্যাপকদের উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
নতুন কারিকুলামের ঘোষণা থেকেও সরে আসার আলোচনা
চলতি বছরের মার্চে নতুন ও সময়োপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কারিকুলাম তৈরির বদলে বিদ্যমান কারিকুলাম সংশোধন ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে সংশোধিত কারিকুলামে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠদান শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এপিএসকে ঘিরেও বিতর্ক
শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানকে বদলি ও তদবির বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগের পর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হলেও এ নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯ মে ওই নিয়োগ বাতিল করে সরকার।
অংশীজনের মতামত বিবেচনার তাগিদ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু লটারি ভর্তি ও এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের মতো ব্যবস্থাগুলো বহাল রেখে কারিকুলাম যুগোপযোগী করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, বিচ্ছিন্নভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিবের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে সরকার যখন বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন অহেতুক ঘনঘন আন্দোলন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।