
ছবি :সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির জবাবে তাকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেছেন ইরানের এক সংসদ সদস্য। ট্রাম্পকে নিজের নিরাপত্তার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছেন, পরিস্থিতি এমন হলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আবারও হয়তো ‘খাবার সরবরাহকারী ট্রাকে’ লুকাতে হতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে বারবার হুমকি দেওয়ার পরিবর্তে ট্রাম্পের নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। এর আগে যেভাবে তাকে একটি ফুড ট্রাকে লুকাতে হয়েছিল, ভবিষ্যতে আবারও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
আজিজির এই মন্তব্য এসেছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হরমুজ-সংক্রান্ত বক্তব্যের পর। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে তিনি বড় ধরনের ঘোষণা দেবেন এবং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথাও বলেছেন।
হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে হরমুজ নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
কৌশলগত অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জলপথকে ঘিরে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হুমকিও জোরালো হচ্ছে।
যে কারণে ‘খাবার ট্রাক’ প্রসঙ্গ
ইব্রাহিম আজিজির ‘খাবার ট্রাকে লুকানোর’ মন্তব্যের পেছনে রয়েছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি নিরাপত্তাজনিত ঘটনার প্রসঙ্গ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে ট্রাম্প তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গেলে সম্ভাব্য ইরানি হামলার আশঙ্কায় তার বিমান পরিবর্তনের সময় একটি ক্যাটারিং ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছিল। নিরাপত্তার কারণে তিনি ওই খাবার সরবরাহকারী ট্রাকের আড়াল ব্যবহার করে একটি ছোট সরকারি বিমানে ওঠেন বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনাই এবার ট্রাম্পকে কটাক্ষ করার জন্য ব্যবহার করেছেন ইরানি আইনপ্রণেতা। তার বক্তব্যের মূল ইঙ্গিত হলো—ইরান বা হরমুজ প্রণালি নিয়ে বড় ধরনের হুমকি দেওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবা উচিত।
হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম, জাহাজের বীমা খরচ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে।
এ কারণে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যেকোনো সামরিক হুমকি আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ট্রাম্পের হরমুজ-সংক্রান্ত বক্তব্যের জবাবে ইরানের পক্ষ থেকেও কঠোর প্রতিক্রিয়া আসছে। ইব্রাহিম আজিজির সর্বশেষ মন্তব্য সেই পাল্টাপাল্টি বাকযুদ্ধকে আরও তীব্র করেছে। একদিকে ট্রাম্প হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইরানের আইনপ্রণেতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি ব্যঙ্গ করে পাল্টা বার্তা দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা কেবল কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও।