নিষেধাজ্ঞাকে ‘সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা’ বলল ইরান

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে তেহরান। নতুন মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে মন্তব্য করেছে ইরান।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি তাদের ওপর নিজেদের আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। কোনো রাষ্ট্রই অন্য স্বাধীন দেশকে ইরানের সঙ্গে বৈধ বাণিজ্য থেকে বিরত রাখার অধিকার রাখে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাঘাইয়ের ভাষায়, এমন নীতির পরিণতিতে বৈশ্বিক সার্বভৌমত্ব দুর্বল হবে এবং আধুনিক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে।

এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরানের সঙ্গে কোনো দেশ বাণিজ্য বা আর্থিক লেনদেনে যুক্ত হলে তাদের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও বলেন, নতুন পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতিকে কঠোরভাবে চাপে ফেলা।

মার্কিন সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নিষেধাজ্ঞাকে ব্যর্থ উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১২ সালে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একই ধরনের কৌশল ইরান এর আগেও দেখেছে; এটি নতুন কোনো বিষয় নয়।

এদিকে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। ট্রাম্প বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি হরমুজকে একটি মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবেই বিবেচনা করছেন। ইরান চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী হলেও একটি কার্যকর সমঝোতার জন্য দেশটি এখনো প্রস্তুত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর মধ্যেই সামরিক কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান, সাম্প্রতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরানের সামরিক অবস্থান এখন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আরও আক্রমণাত্মক পর্যায়ে যাচ্ছে।

তবে ইরান আগে থেকে কোনো হামলা চালাবে না বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, ইরানের ওপর আগ্রাসন হলে এর জবাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও কঠোর ও ব্যাপক হবে। গত এক বছরে দেশে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের উৎপাদন দ্বিগুণ করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো মেরামতের কাজ শেষ করে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার মধ্যেই বাগদাদের অনুরোধে কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারকে ওই প্রণালি অতিক্রমের বিশেষ অনুমতি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের বাগদাদ সফরের সময় ইরাকি স্পিকার হাইবাত আল-হালবুসির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমিদি জানিয়েছেন, অন্য কোনো দেশের ওপর হামলা চালানোর জন্য ইরাকি ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে ইরাক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইরানি স্পিকার গালিবাফ বলেন, ইসরায়েলকে তোষামোদ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। তার মতে, বাইরের শক্তির পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইরান একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। দেশটির সরকারের ভেতরেও কূটনৈতিক সমঝোতা নাকি সামরিক সংঘাত—কোন পথে এগোনো উচিত, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

এদিকে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি।

অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের মধ্যেই মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক সহায়তায় প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে। তবে চলমান অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং ১৯ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।

এ ছাড়া ইয়েমেনের হুথিদের বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অবরোধের প্রভাবও পড়েছে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে। এর ফলে লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন বন্দরে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শেয়ার করুন: