মানুষখেকো’ হয়ে উঠছে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক, আগস্টেই প্রাণ গেল ২৩ জনের

ছবি :সংগৃহীত

সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক যেন দিন দিন আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। চলতি আগস্ট মাসেই মহাসড়কটির সিলেট অংশে ১০টি দুর্ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ছয় লেন প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলা, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে চালকদের ক্লান্তি ও ঘুম, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং মহাসড়কে অননুমোদিত যানবাহনের চলাচলকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে সিলেট বিভাগে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কেই ৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২২ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে সিলেটের ওসমানীনগর অংশে। সেখানে চারটি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫ জন।

নিসচা সিলেট জেলা সভাপতি জহিরুল ইসলাম মিশু বলেন, অনেক চালক বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে গাড়ি চালান। যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি তারা গুরুত্ব দেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হাইওয়ে পুলিশের কার্যকর ভূমিকার অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আগস্টে যেসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানি

চলতি মাসে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ৭ আগস্ট। ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাসের সঙ্গে ইউনিক পরিবহনের আরেকটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হন।

মহাসড়কটিতে বিভিন্ন কোম্পানির স্লিপার বাস চলাচল করলেও এগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দুর্ঘটনার পর প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পাঁচটি স্লিপার বাস কোম্পানিকে জরিমানা করে।

৯ আগস্ট হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার আন্দিউড়া এলাকায় বিলাস পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে অন্তত ২০ জন যাত্রী আহত হন। ছয় লেন প্রকল্পের কাজের কারণে সড়কের এক পাশের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে বলে জানা যায়।

একই দিন মাধবপুরের বেজুরা সেতু এলাকায় ট্যাংক লরি, ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন।

১০ আগস্ট ভোরে দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার এলাকায় বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে বাসের এক হেলপার নিহত হন। একই দিনে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার রোকনপুর এলাকায় বাস ও পিকআপের সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনজন।

১৭ আগস্ট ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় প্রাইভেট কার ও অ্যাম্বুলেন্সের সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ পাঁচজন আহত হন। এরপর ২২ আগস্ট ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় ট্যাংক লরি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন নিহত হন।

অন্যদিকে, শনিবার (২৯ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা মডেল মসজিদের সামনে মৌলভীবাজার-কুলাউড়া আঞ্চলিক মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় অজ্ঞাতপরিচয় এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ যাত্রা ও চালকদের ক্লান্তিও উদ্বেগের কারণ

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। কাজের কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সাধারণত প্রায় ছয় ঘণ্টার যাত্রাপথ পাড়ি দিতে এখন অনেক ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে।

দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানোর কারণে চালকদের মধ্যে ক্লান্তি ও ঘুমভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা যানবাহনগুলো ভোরে সিলেট অংশে পৌঁছানোর সময় চালকদের শারীরিক ক্লান্তি বাড়তে পারে।

আবার যানজটে অতিরিক্ত সময় নষ্ট হওয়ার পর অনেক চালক গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছাতে মহাসড়কের অপেক্ষাকৃত ফাঁকা অংশে গতি বাড়িয়ে দেন। এর ফলে যানবাহনের মধ্যে প্রতিযোগিতা, বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা তৈরি হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এ ছাড়া মহাসড়কে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব থাকায় অনেক চালক ট্রাফিক আইন অমান্যের সুযোগ পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুল বাশার মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তবে চালকদের বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বলে তিনি মনে করেন।

হাইওয়ে পুলিশ সিলেটের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম জানান, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের হবিগঞ্জের মাধবপুর ও সিলেটের ওসমানীনগর অংশ তুলনামূলক বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ।

তার মতে, ছয় লেন প্রকল্পের কাজের কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের পরিস্থিতি বেহাল হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। এর পাশাপাশি বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকদের ঘুম ও ক্লান্তিও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, রাতের যাত্রা শেষে ভোরের দিকে সিলেট অংশে পৌঁছানোর সময় অনেক চালকের মধ্যে ঘুম ও ক্লান্তিভাব দেখা দেয়। এ ছাড়া মহাসড়কে থ্রি-হুইলারের চলাচলও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুর্ঘটনা কমাতে মহাসড়কের উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি চালকদের জন্য কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ, বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ এবং অননুমোদিত যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

শেয়ার করুন: