
ছবি :সংগৃহীত
ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র একপর্যায়ে সরাসরি সামরিকভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক উইলিয়াম লরেন্স।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সৌদি আরবের অনুরোধে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে খবর পাওয়া গেলেও পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ওয়াশিংটন আরও গভীরভাবে এই সংঘাতে যুক্ত হতে পারে।
লরেন্সের ভাষ্য, ইয়েমেনের পরিস্থিতি এখন শুধু আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে দীর্ঘ সময় সংঘাত থেকে দূরে থাকা ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ‘কোনো এক পর্যায়ে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) এতে জড়াবে।’ অতীতে ইয়েমেনে নিজেদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপে প্রস্তুত থাকার নজির দেখিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হরমুজ ও বাব আল-মানদেব নিয়ে উদ্বেগ
ইয়েমেনে হুতি ও সৌদি আরবের সংঘাতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথের নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করেন লরেন্স।
এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। অন্যদিকে বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য পরিবহনে এই পথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এই দুই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহ, পণ্য পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লরেন্স বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এমন ধারণা জোরালো হয়েছে যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হুতিদের সামরিক অগ্রগতি ঠেকাতে ওয়াশিংটনের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তবে সেই পদক্ষেপের ধরন কী হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সৌদি নিরাপত্তায় বাড়তে পারে মার্কিন সহায়তা
সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতাও পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হুতিদের হামলা বাড়তে থাকলে সৌদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপও বাড়তে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হামলায় যাবে কি না, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির গতিপথের ওপর। এর আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর অনুরোধ ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লরেন্সের মতে, সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা আরও বাড়াতে পারে।
ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা আগেই রয়েছে
লরেন্স বলেন, ইয়েমেনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে হলে নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হবে না। কারণ সৌদি আরবের নিরাপত্তায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও সহযোগিতা আগে থেকেই রয়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ১০০ জন মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা অবস্থান করছেন। পাশাপাশি সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও রিকনাইস্যান্স সহায়তা দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
লরেন্সের মতে, এ কারণে মার্কিন সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো খুব বড় ধরনের পরিবর্তন হবে না। তবে সামরিক পরামর্শ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা থেকে সরাসরি হামলা বা যুদ্ধের অংশীদার হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সিদ্ধান্ত।
এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইয়েমেনের সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
হুতিদের সামরিক অগ্রগতি নিয়ে সৌদির উদ্বেগ
ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের প্রভাব বাড়ায় নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়তে থাকায় সংঘাতটি ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পক্ষের নিরাপত্তা স্বার্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তাও জড়িয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা এবং নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি—দুই বিষয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।