জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বার্থ ও নীতির কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী: হুমায়ুন কবির

ছবি :সংগৃহীত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নীতি নিয়ে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তাঁর ভাষণ ও বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থ ও অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জাতিসংঘ সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে দেশের কিছু অভ্যন্তরীণ নীতি, শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়েও কথা বলেছেন। পাশাপাশি ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকারের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটিই ছিল প্রথম অংশগ্রহণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রথমবারের মতো সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় এবারের অধিবেশন দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে।

তিনি জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান। চার দিনের কর্মসূচি শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি দেশের উদ্দেশে রওনা হন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে বাংলাদেশে পৌঁছান।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ, সাতটি উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য, ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাতিসংঘসহ ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক।

হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগও কামনা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় সংলাপ এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।

২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

একই দিনে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভাতেও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি, মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা এবং সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

সফরের সময় তুরস্ক ও ইরানের রাষ্ট্রপতি, মালদ্বীপের উপ-রাষ্ট্রপতি, ভুটান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা, গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী, বোয়িং গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়।

হুমায়ুন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির পাশাপাশি তিনি ব্রাজিল ও ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২, পররাষ্ট্র সচিব এবং সচিব (পূর্ব-পশ্চিম) বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেন। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরাও বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন সরকারের অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়েছে কি না জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, মেটার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সমাজে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ১১টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে খোলা পরিবেশে চুক্তি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে চারজন মন্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী বোয়িং বিমান কেনা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে মিশ্র বহর প্রয়োজন। বর্তমানে বোয়িং কেনা হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিমান কেনা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (আন্তঃসরকারি সংস্থাসমূহ অনুবিভাগ) এম ফরহাদুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব এ কে এম শহীদুল করিম উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন: