বিলেতে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার শতবর্ষের ইতিহাস সংরক্ষণে ইস্টহ্যান্ডসের উদ্যোগ

যুক্তরাজ্যে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার শতবর্ষের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ১২ মাসের গবেষণা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে দাতব্য সংস্থা ইস্টহ্যান্ডস। দ্য ন্যাশনাল লটারি হেরিটেজ ফান্ডের সহায়তা এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক অংশীদারদের সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ, উন্মুক্ত ডিজিটাল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং প্রবীণ সাংবাদিক ও পাঠকদের স্মৃতি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ইস্টহ্যান্ডসের চেয়ারম্যান নবাব উদ্দিন। পরে প্রকল্পের লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংস্থাটির ঐতিহ্য ও গবেষণা সমন্বয়কারী সাঈম চৌধুরী।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস কয়েক দশকের নয়; এর শিকড় আরও গভীরে বিস্তৃত। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ১৯১৬ সালে প্রকাশিত ‘সত্যবাণী’কে এ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিলেতে বাংলা সংবাদপত্র প্রবাসী বাঙালিদের অভিবাসন, অধিকার আদায়ের আন্দোলন, বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস তুলে ধরেছে।

তবে এই সমৃদ্ধ ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এখনো ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। যথাযথ উদ্যোগ ও সংরক্ষণের অভাবে পুরোনো সংবাদপত্র, ছবি, নথি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক দলিল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রবীণ সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক ও পাঠকদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু তথ্যও হারিয়ে যেতে পারে। এসব উপাদান সংগ্রহ, যাচাই ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক আ স ম মাসুম ভিডিও উপস্থাপনার মাধ্যমে উদ্যোগটির বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ছয়টি প্রধান কার্যক্রমের আওতায় প্রকল্পটি পরিচালিত হবে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা হবে।

এ ছাড়া বাংলা গণমাধ্যমের প্রবীণ অগ্রদূত, সম্পাদক ও প্রকাশকদের জীবন, কর্ম ও সংগ্রাম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হবে। সাংবাদিক ও পাঠকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতিচারণ এবং সংশ্লিষ্ট ইতিহাস মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে রেকর্ড করে সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সংগৃহীত ঐতিহাসিক নথিপত্র দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য টাওয়ার হ্যামলেটস লোকাল হিস্ট্রি লাইব্রেরি অ্যান্ড আর্কাইভসে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া গবেষণা ও সংগ্রহের ফলাফল সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে লন্ডন ও বার্মিংহামে দুটি প্রদর্শনী এবং ভিডিও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।

অনুষ্ঠানে ইস্টহ্যান্ডসের ট্রাস্টি বাবলুল হক উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ নাহাস পাশা, বিবিসির সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি তারেক চৌধুরী, সাংবাদিক মাহবুব রহমান, প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ জুবায়ের, ‘দেশ’ সম্পাদক তাইসির মাহমুদ, কবি ও ভ্রমণকাহিনি লেখক দিলু নাসের এবং প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হক।

প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত ও পরামর্শ দেন সাংবাদিক রহমত আলী, আজিজুল আম্বিয়া, আফজাল হোসেন, আলাউর রহমান শাহীন, এনাম চৌধুরী, সাজু আহমেদ ও জয়নাল আবেদীন।

এ সময় ইস্টহ্যান্ডস চ্যারিটির আহাদ চৌধুরী বাবু, পলি রহমান, সালেহ আহমদ, হাসনাত চৌধুরী ও মোহাম্মদ কিনুও উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকেরা জানান, ডিজিটাল গণমাধ্যম ও মোবাইল সাংবাদিকতার বিস্তারের এই সময়ে বিলেতে বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস সংরক্ষণ প্রবাসী বাঙালিদের আত্মপরিচয়, সামাজিক সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পের গবেষণা, ঐতিহাসিক উপকরণ সংগ্রহ, আর্কাইভ সংরক্ষণ ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নিতে আগ্রহীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইস্টহ্যান্ডস।

একই সঙ্গে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে থাকা পুরোনো বাংলা সংবাদপত্র, ছবি, চিঠি, প্রকাশনাসংক্রান্ত নথি কিংবা গবেষণায় সহায়ক অন্য কোনো ঐতিহাসিক উপকরণ থাকলে তা দিয়ে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি। এসব উপাদান সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে বিলেতে বাংলা সাংবাদিকতার বিস্তৃত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চায় তারা।

শেয়ার করুন: