
ছবি :সংগৃহীত
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও পণ্য রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে পণ্য রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। তবে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও এর গতি তুলনামূলক ধীর।
রোববার (১ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ১৪৬ কোটি মার্কিন ডলার (১১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার)। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ১৫ কোটি ডলার (১০ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার)। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।
মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, গত জুলাইয়ে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৫৩ শতাংশে। সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশ এবং অক্টোবরে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ। চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে আগস্টে, প্রায় ২৯৭ কোটি ডলার। এ ছাড়া জুলাইয়ে ২৮৬ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২৭৭ কোটি এবং অক্টোবরে প্রায় ২৮৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের পণ্য রপ্তানি আয়েও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০৮ কোটি ডলার (১৭ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার)। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৬১৪ কোটি ডলার (১৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার)। এ হিসাবে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
তবে মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কম দেখা গেছে। গত অক্টোবরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৯৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। আগের মাস সেপ্টেম্বরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ শতাংশের মতো।
মাসভিত্তিক রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪৭৩ কোটি ডলার। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৪৪৩ কোটি ডলারে। সেপ্টেম্বরে রপ্তানি থেকে আয় হয় প্রায় ৩৯৩ কোটি ডলার এবং অক্টোবরে তা বেড়ে ৩৯৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১ হাজার ৩৭৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ২৯৯ কোটি ডলার। সে হিসাবে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।
পোশাক খাতের মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
পোশাকের বাইরেও কয়েকটি রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্যে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইল খাতে বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।
তবে সব খাতের চিত্র ইতিবাচক নয়। কৃষিপণ্য রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পোশাকশিল্পের পাশাপাশি পাট, চামড়া ও হোম টেক্সটাইলের মতো কয়েকটি খাতে রপ্তানি বৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা তুলে ধরছে। এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব খাতে রপ্তানি কমছে, সেসব খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
রপ্তানি পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, রপ্তানি আয় বাড়ছে। তবে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা যথেষ্ট নয়। এ জন্য রপ্তানি বৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত করতে হবে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক উত্থান-পতন দেখা গেছে। ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনা মহামারির প্রভাবে রপ্তানি আয় প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যায়।
পরবর্তী দুই অর্থবছরে ঘুরে দাঁড়ায় রপ্তানি খাত। বিশেষ করে ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। তবে এরপর আবার নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়। সংশোধিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় যথাক্রমে প্রায় ১১ ও ৪ শতাংশ কমে যায়।
এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানি আয় আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে যায়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি আয়ে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নতুন করে আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।