ইরান যুদ্ধের প্রভাবেই নির্বাচনে হার, অবশেষে স্বীকার করলেন ট্রাম্প

ছবি :সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধেরও ভূমিকা রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরানের বিরুদ্ধে গত ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের প্রতি নিজের সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় কক্ষের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটের দিন রাতেই বুথফেরত জরিপে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের আভাস পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত দলটি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়। নির্বাচনের এই ফলাফলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মঙ্গলবার রাতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলের জন্য ইরান যুদ্ধ দায়ী কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধও এর একটি কারণ।’

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্তে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পরও হেগসেথকে দায়িত্ব থেকে সরানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, আমার মনে হয়, তিনি খুব ভালো কাজ করছেন।’

ইরান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে পরিচিত হেগসেথকে নিয়ে অবশ্য রিপাবলিকান দলের ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টার মতে, নির্বাচনে পরাজয়ের দায় এড়াতে হেগসেথকে পদ থেকে সরানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

ওই উপদেষ্টা বলেন, ‘তাঁকে বরখাস্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। এই যুদ্ধের জন্য কাউকে না কাউকে দায় নিতে হবে। আর আপনারা জানেন, সেই দায় ট্রাম্প কখনো নেবেন না।’

তবে হেগসেথকে এখনই দায়িত্ব থেকে সরানো হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। রিপাবলিকান নেতারা নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ পর্যালোচনা করছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়েও দলটির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এদিকে ভোটের পরদিন বুধবার ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, এই যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে রিপাবলিকানদের। নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পেছনেও যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

হোয়াইট হাউসের কাছে হেগসেথের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্য অনুসরণ করতে বলে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দিন ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত পেন্টাগনের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে হেগসেথ ‘শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’।

হেগসেথকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গেও তাঁর বিরোধ রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য টমাস ম্যাসি তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব জমা দেন। ম্যাসির অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে হেগসেথ তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

এ ছাড়া রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিসও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে সিবিএস নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, হেগসেথকে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

টিলিসের মতে, আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে হেগসেথের টানাপোড়েনের সম্পর্ক ট্রাম্প প্রশাসনের ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময় টিলিস বলেন, কংগ্রেসের কাছে প্রতিরক্ষা খাতের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার জন্য হেগসেথই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, বর্তমান কংগ্রেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো প্রস্তাব পাস করাতে চাইলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও ইরাক যুদ্ধের কারণে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল রিপাবলিকান পার্টি। সে সময় যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের জেরে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায় দলটি। নির্বাচনের পরদিনই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে বরখাস্ত করেছিলেন।

তবে এবার একই পথে হাঁটেননি ট্রাম্প। বর্তমান কংগ্রেসের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র ৬০ দিন বাকি। এর মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অবস্থান, যুদ্ধের দায় এবং প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।

শেয়ার করুন: