বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে বিতর্ক, আইনি জটিলতায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন



সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আওতায় অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এই ফলাফলের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনসহ সনদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। তবে শুরুতেই সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আদেশ অনুযায়ী গত মঙ্গলবার একই অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—এই দুই পদে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিষয়টি সংবিধানে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জোট ও স্বতন্ত্র নির্বাচিত সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী দলগুলোর নির্বাচিত সদস্যরা দুটি শপথই সম্পন্ন করেছেন।

এদিকে গণভোটের ফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের হওয়ায় পুরো বিষয়টি নতুন আইনি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।


আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি অংশ সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় শুরুতেই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভাজনের বদলে ঐকমত্য জরুরি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট–এর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা থাকলেও ‘বাস্তবায়ন আদেশ’ নামে এ ধরনের পদক্ষেপ সংবিধানসম্মত কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তাঁর মতে, দুটি শপথের বিষয়টি সংবিধানে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ছিল।

আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, পৃথক আদেশের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শপথের নির্ধারিত নমুনা রয়েছে, কিন্তু নতুন আদেশে অতিরিক্ত শপথ যুক্ত করা হয়েছে, যা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।


জুলাই সনদের পটভূমি

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং কমিশনের সদস্যরা স্বাক্ষর করেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সনদে অংশ নেয়। মোট ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩০টিতে ঐকমত্য তৈরি হলেও বাকি প্রস্তাবগুলোতে মতভেদ ছিল।

সনদ বাস্তবায়নের জন্য তিন ধাপ নির্ধারণ করা হয়। প্রথম ধাপে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে একটি সংস্কার পরিষদ গঠন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। পরে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।


বিএনপির অবস্থান

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি পৃথক শপথ ফরম দেওয়া হলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলীয় সদস্যদের জানান, সংবিধানে সংস্কার পরিষদের শপথের বিধান যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় শপথ নেবেন না। তিনি জানান, এ সিদ্ধান্ত দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে।

পরে বিএনপির সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন


জামায়াত জোটের অবস্থান

জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের প্রথমে বলেন, সংস্কার পরিষদের শপথ ছাড়া তারা সংসদ সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন না। তবে আলোচনার পর তাদের দলীয় সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই গ্রহণ করেন।


গণভোটের ফল বাতিল চেয়ে রিট

গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ তৌহিদ। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোট এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত গেজেট স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। রিটে দাবি করা হয়েছে, সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো ও বিধিমালা ছাড়া গণভোট আয়োজন করা হয়েছে, যা সাংবিধানিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

রিটটি শুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ–এর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে আগামী সপ্তাহে উপস্থাপিত হতে পারে।


নতুন করে অনিশ্চয়তা

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে মতভেদ, আইনি প্রশ্ন এবং রিট আবেদন—সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, বিষয়টির দ্রুত সমাধান না হলে সংস্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে পারে।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!