মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

হরমুজ প্রণালি বন্ধে বিশ্ববাজারে তেলের রেকর্ড দাম, বিপাকে এশিয়ার শোধনাগার



ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে মন্দাভাব থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় প্রচলিত ব্রেন্ট বেঞ্চমার্কের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের মূল্য নির্ধারণে ব্যবহৃত এই সূচকের অস্বাভাবিক উত্থান শোধনাগারগুলোর খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে তারা বিকল্প উৎস খোঁজা বা উৎপাদন কমানোর দিকে ঝুঁকছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের কার্গোর জন্য দুবাই ক্রুডের স্পট মূল্য প্রতি ব্যারেল ১৫৩.২৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০০৮ সালের ব্রেন্ট ফিউচার্সের সর্বোচ্চ ১৪৭.৫০ ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। একই দিনে সোয়াপের তুলনায় দুবাই ক্রুডের প্রিমিয়াম দাঁড়ায় ৫৬.০১ ডলার, যা মোট দামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং ফেব্রুয়ারির গড় ৯০ সেন্টের তুলনায় অনেক বেশি।

অন্যদিকে, ওমান ক্রুড ফিউচার্সের দামও বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১৪৭.৭৯ ডলারে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে দুবাই সোয়াপের তুলনায় প্রিমিয়াম দাঁড়িয়েছে ৫০.৫৭ ডলার, যা ফেব্রুয়ারির গড় ৭৫ সেন্টের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুরবান ক্রুডের সঙ্গে দামের বড় পার্থক্যের কারণে দুবাই ক্রুডের মূল্য কিছুটা অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে। সোমবার মুরবান ফিউচার্সের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১১১.৭৬ ডলার।

অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মার্চ মাসে এশিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল রফতানি কমে দৈনিক ১১.৬৬৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ মিলিয়ন ব্যারেল, অর্থাৎ এক মাসে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এই সরবরাহ প্রায় ৩২ শতাংশ কম।

কিছু শোধনাগার সূত্রের দাবি, প্ল্যাটসের মার্কেট অন ক্লোজ (এমওসি) প্রক্রিয়ায় সরবরাহযোগ্য তেলের পরিমাণ কমে যাওয়াও মূল্য বৃদ্ধির একটি কারণ। হরমুজ প্রণালির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি তেলের গ্রেড তালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় বাজারে সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়ে।

একটি সূত্র জানায়, দুর্বল বাণিজ্য পরিস্থিতিতে এ ধরনের মূল্য নির্ধারণ অস্বাভাবিক ও কিছুটা অন্যায্য। তাদের মতে, অবশিষ্ট ওমান ও মুরবান গ্রেড পুরো বাজারের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না। ফলে মে মাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির এক মুখপাত্র জানান, প্ল্যাটস দুবাই স্পট মার্কেট এখনও লেনদেন হওয়া ক্রুডের প্রকৃত মূল্য প্রতিফলিত করছে এবং চলতি মাসে একাধিক কার্গো সরবরাহ হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এই লেনদেনে প্রধান ক্রেতা হিসেবে একমাত্র টোটালএনার্জিস সক্রিয় ছিল। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাসে ওমান ও মুরবানের মোট ২৪টি কার্গো, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল কিনেছে।

এদিকে, বিকল্প সরবরাহের সন্ধানে এশিয়ার শোধনাগারগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার বাজারের দিকে ঝুঁকছে। ফলে এসব অঞ্চলের তেলের দামও বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, ব্রাজিলের স্পট ক্রুডের দাম আইসিই ব্রেন্টের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ১২ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে পশ্চিম আফ্রিকার তেলের প্রিমিয়ামও এক মাসের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।

সার্বিকভাবে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে এবং এর প্রভাব আগামী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!