মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

হায়! ক্ষমতা বুঝি এমন অন্ধ হয়! হতে হয় বুঝি এমন বিবেচনাহীন প্রতারক!



ছবি কৃতজ্ঞতা: প্রথম আলো অনলাইন। ফটোগ্রাফার সাজিদ হোসেন।

প্রথম আলোয় প্রকাশিত এ ছবিটির দিকে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। মনোমুগ্ধকর কোন ছবি তো নয়ই, বস্তুত আশ্চর্য হবার মতোও নয়। পুলিশ, তার সাথে সাথে সরকার-দলীয়পুষ্ট একদল যুবক, উদ্যত লাঠি-সোটা হাতে – এমন ছবি আমরা অহরহ দেখে আসছি যুগে যুগে, এ সরকার ও সরকার – সবার আমলেই। এটা যেন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। এতে আমরা ইশ্ করি, উশ্ করি, তারপর পাতা উল্টে খেলার পাতায় চলে যাই। আমার স্তম্ভিত হবার কারণটি ছিল ছবিটির ক্যামেরায় না ধরা পড়া সামনের ক্যানভাসটি ভেবে। সেখানে যারা আছে – তাদের কথা ভেবে।
সাধারণত এমন মধ্যযুগীয় কায়দা রাজপথে উঠে আসে যাদের দমন করতে, তা প্রায়শই হতো অন্য দলের। দমন-পীড়ন করে অন্য মতকে বিতাড়িত করতে। কিন্তু এই উদ্যত সন্ত্রাস যাদের দিকে ছুটে যাচ্ছে, তারা কোন দলের নয়, ভোটের বয়স হয়নি, ক্ষমতায় ভাগ বসাতে আসেনি, গদির ভাগাভাগি এদের লক্ষ্য নয়। তবু এদেরকে নিবৃত্ত করতে এই পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে দেশের সরকারকে – এই কথাটি ভেবে আমি স্তম্ভিত হয়ে ছিলাম।
পৃথিবীতে কোন কালে, কোন দেশে, কোন ন্যায্য আন্দোলনকে এই পন্থায় দমন করা যায়নি। এর একটা উদাহরণও নেই। বরংচ এমন পন্থা অবলম্বন করার ফলে সলতেতে পরিপূর্ণ আগুন ধরেছে, প্রতিবারই প্রতিটি আন্দোলন বেগবান হয়েছে। সহানূভূতির কোন ছিঁটোফোটা কোথাও থেকে থাকলে সেসব বিদূরিত হয়ে গেছে দলের প্রতি অনুগত যে কোন বিবেকমান মানুষের।
এ কিশোর-কিশোরীদের হাতে একটা প্ল্যাকার্ডও ছিলো না যাতে সরকারকে নামিয়ে ফেলার কথা লেখা হয়েছে, গদি ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এমন কায়দায় দমন-নিপীড়নের পর এরা যদি আগামী কাল লিখে আনে ‘নিরাপদ ছাত্রলীগ চাই’ এর মতো কোন অসম্ভব দাবী, কথা তোলে সন্ত্রাস-লালনকারী কোন গদি পতনের, তবে যেনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব খোঁজা না হয়! একটা ন্যায্য দাবী-আদায়ের আন্দোলকে কিন্তু সেদিকেই ঠেলে দেয়া হচ্ছে বর্বরতার চুড়ান্ত নমুনা দেখিয়ে। একই সংগে এ দিকটাও ক্ষমতাসীনদের ভেবে রাখা দরকার, এই কোমলমতি বাচ্চাদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করতে পারেন সরকারের রাজনৈতিক বিরুদ্ধপক্ষরা। এবং নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা লোটার জন্য ব্যবহার করতে পারে এই সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবী সংবলিত আন্দোলটিকে। এ শংকা তো থেকেই যায় যে, এই বাচ্চারা হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিকদের দাবার ঘুুঁটি।

আমার মনে হয় না, খুব বেশি মানুষ এখন আর কারো গদি পতনে কোন কিছুর উত্থান ঘটবে বলে বিশ্বাস করে। অনেক দেখা তো হলো! তার চেয়ে নিরাপদ সড়ক হলে প্রকৃত কাজ হতো একটা। নিরাপদ সড়কের দাবী তো সরকারকে সমর্থনকারীদেরও হওয়া উচিত। গতকাল আমার এক ভিনদেশী সহকর্মীকে বহুক্ষণ বোঝানোর চেষ্টা করেও এ আন্দোলনটার কথা বোঝাতে পারিনি। সেটা যতটা না আমার ইংরেজি জ্ঞানের অভাবে, তারচেয়ে বেশি নিরাপদ সড়ক চাওয়ার ব্যাপারটা কি, এবং তা চাইতে গিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের রাস্তায় নামতে হবে কেন – এ আদিম কারণটি বোঝাতে। তার ভাবনায় এ কথাটি ঢুকেইনি যে, এমন কোন বিষয় নিয়ে জনগণকে মাথা ঘামাতে হবে কেন, তাও আবার স্কুল-শিক্ষার্থীদের! এ তো রাষ্ট্রের মৌলিক কাজ! সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব!

এভাবে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে, পুলিশকে ব্যবহার করে কোন ন্যায্য আন্দোলন দাবিয়ে রাখা যাবে না, যায় না, এ কথাটি জানেন না, বা বুঝেন না – তেমন কেউ বর্তমান সরকারে আছেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। উনাদের অনেকেই, এমন দাবী আদায়ের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন সময়ে সময়ে। তবু এই যে ভুলে থাকা, এই যে অন্ধত্ব – এ কী কেবলি ক্ষমতার দম্ভে?
হায়! ক্ষমতা বুঝি এমন অন্ধ হয়! হতে হয় বুঝি এমন বিবেচনাহীন প্রতারক!!

লেখক : কবি, গল্পকার
goddoshagor@gmail.com

 

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!