সোমবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কবি ও কবিতা : শাহনাজ সুলতানা



কবি শাহনাজ সুলতানা

কবিতা একধরনের উপাসনা। এই উপাসনা নির্জনতা দাবী করে। আর তা-ই যদি হয়; এই নাগরিক কোলাহলে কীভাবে কবিতা লিখা সম্ভব? তাহলে কি কবিকে জনপদ ছেড়ে নির্জন গুহাবাস বা সন্ন্যাস গ্রহণ করতে হবে?

না, অবশ্য নয়। যিনি নির্জনতার কবি হিসেবে অধিক পরিচিত সেই জীবনানন্দও লোকালয়ে বাস করে এবং চাকরী, পরিবার পরিচালনা করেই কবিতা লিখেছেন। শত কোলাহলের মধ্যেও নিজেকে আলাদা করে নেওয়া, অনেকের ভিড়ে একা হয়ে যেয়ে নিজস্ব ভূবনে শৈল্পিক নির্মাণের কাজটা কবিকে সারতে হয়।

কবিতা কী? কবিতা কীভাবে লিখতে হয়? তা নিয়ে অনেক ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে। তবে কবিতা যে প্রকারেরই হোক না কেন তা যদি কারো মনে দাগ না কাটে বা মানুষকে না ভাবায় সেটির পরিণতি জলহীন নদী ও জনমানবহীন বাড়ীর মতোই।

শাহনাজ সুলতানা। একাধারে কবি ও গদ্য লেখক। সম্পাদনা করছেন “নারী এশিয়ান” ম্যাগাজিন। তবে মন-মজ্জায় তিনি কবিই। একজন কবির যেসব গুণ বিদ্যমান থাকে সেসবের সমাহার তাঁর জীবনাচারে বেশ লক্ষ্যণীয়। দীর্ঘদিন থেকে কবিতা লিখছেন। অনেক কিছু থেকে মুখ ফেরালেও কবিতার জন্য রয়েছে তাঁর আদিগন্ত একখানা সবুজ শাড়ি- যেখানে প্রতিনিয়ত বুনেন থোকা থোকা কাব্যকুসুম। ইতোমধ্যে দুটি কাব্যগ্রন্থ পাঠক সমীপে পেশ করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তাঁর কবিতা কেমন? সেই ব্যাখ্যা অনেকটা কঠিন হবে। তাই সেদিকে না যেয়ে বলা উচিত তাঁর কবিতা কতটুকু ভাবায় পাঠককে।
হ্যাঁ, একথা নির্দিধায় বলা যায় যে, যথেষ্ট ভাবনার খোরাক মিলে কবি শাহনাজ সুলতানার কবিতায়। বিশেষ করে নষ্টালজিক বিষয়-আশয় খুব হুঁল ফোটায় তাঁর কাব্যকাননে।

শুধু নষ্টালজিয়া নয়। প্রকৃতি-পরিপার্শ্বও তাকে ভাবায় বিস্তর; তাই রেডব্রিজ, ডকল্যান্ড কিংবা জন্মস্থান বাগবাড়ির আকাশে মেঘপরিন্দার উড়োউড়ি দেখে দেখে যাপিতজীবনের ধ্রুপদী ছবি এঁকে চলেন। কখনবা ডাইরির পাতায় পাতায় জমিয়ে রাখা গোলাপ পাপড়ির সুঘ্রান শুঁকে শুঁকে অনেকটা আনমনা হয়ে পড়েন। আর তখন মনের অজান্তেই লেখা হয়ে যায় কিছু প্রেম বা বিরহের রোমান্টিক পংক্তিমালা।

কবি শাহনাজ সুলতানার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেটের ছাতক থানা সদরের বাগবাড়ি। তবে অনেকটা কিশোরী বয়সেই পরিবারের সাথে পাড়ি জমান বিলেতে। থাকেন পূর্বলন্ডনের ইস্টহামে। চার সন্তানকে নিয়ে তাঁর মায়াবি সংসার।

আসুন এবার পাঠ করি তাঁর সাম্প্রতিক লিখা কয়েকটি কবিতা-

অদৃশ্য তাপ

অবশেষে দ্রুতগামী ট্রেন রিঝিম শব্দে উঠে এলো হিমালয় চূড়ায়। পেছনে সেন্ট্রাল পার্কের ধূসর বেঞ্চ; পুরোনো দিয়াশলাই সময়ের বিদায়ী স্রোত কেমন ছোটে; অতিপ্রিয় রঙ বেদনায় নিলাভ হলে রেডব্রিজের আকাশে কানামাছি খেলে ঝাঁক ঝাঁক মেঘপরিন্দা; কাঁদে প্রচ্ছদবন্দী ইতিহাস।

ডকল্যান্ডের ফ্লাইওভারের নীচে অসংখ্য যানবাহনের ভীড়, ক্ষত-বিক্ষত পোস্টারের আঙিনায় প্রতিদিন দৃশ্যহীন উত্তাপ; ব্যাগভর্তি দীর্ঘ সাধনায় জমে অনাগত সময়; আফ্রিকান দানবের মতো সহস্য কাঁটাচোখ ফণা তোলে; গলাকাটা শবদেহ ঝুলে থাকে আলনার খাঁজে।

হাড়সম্পর্ক

হাড়ের সম্পর্ক ব্যথাময় হলে বোবা সন্দেহে বেড়ে ওঠে তিক্ত শরীর! নিজের জমানো স্বচ্ছ বিশ্বাস ও বেলায় ম্যালেরিয়াক্রান্ত হলে নিঃশ্বাস থেকে উড়ে যায় ঝাঁক ঝাঁক বাজপাখি; হৃৎপিণ্ডে ঝরে পরে একমুঠো নুড়ি পাথর, বিদ্রুপে হেসো না ছায়া…..

আবেগ কখনো অন্ধ ছিল না, শব্দহীন ছিল না আশা-কাঙ্ক্ষা-আকর্ষণ! তবে কোন সে-ছন্দ ও নূপূর প্রাণহীন ঠোঁটে বাজে কাঁটাকথা।

কবিতার ঈশ্বর

দেবতার চরণে বসবাস তোমার, বড় ভাগ্যবান তুমি হে জলজ শামুক! তোমার চারপাশে জীবন্ত শব্দরা হামাগুড়ি দিচ্ছে দেখে তুমি শব্দের উষ্ণতায় হাসো কাঁদো, রচনা করো আগামীর প্রকৃতি… অথচ তুমি পাশে না থাকলে যে মানুণ আউলাঝাউলা হয়ে যায়; তৃষ্ণার্ত রোজাদারের দিন শেষে ইফতারের শরবদের মতো যে তোমায় চুমুকে চুমুকে করে পান, তার হাড়ের বেদনা, হৃদপিণ্ডের তীব্র দহন জানো না…

তুমি বড় ভাগ্যবান হে সোনালি শামুক! তোমার আঙিনায় বাস করে কবিতার ঈশ্বর…

পার্থক্য

অনিয়মটা আজই দেখা দিলো ছাতক বাসস্ট্যান্ডে! গভীর রাত দ্রুতগামী বাসের সাথে নির্ঘুম প্রহর কাটাত যে শালিক, আজ গুটিয়ে নিয়েছে পালক…তিক্ততার লিপিষ্টিক মাখা অভিমানী ঠোঁট, প্রিয়তম দিন লাবণ্যময় চুম্বনের তীব্র স্বাদ মলিন হলে অন্ধকার ঘর; জলজ চোখে ফণা তুলে বাগবাড়ীর অভিযোগ; গ্রীবায় ঝুলে থাকে হারানো ওম…

অনিয়মটা আজই দেখা দিলো ছাতক বাসস্ট্যান্ডে, গতকাল আর আজকের মধ্যে পার্থক্য অনেক।

শেষ ইতিহাস

একাই ছিলে, পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলে পাষাণ!
নিষ্ঠুর সময় অস্বীকার করব না জেনো
আঁচল ভরে কুড়িয়ে নেবো বকুলের অভিমান
অনুতাপ——-

তারপরও সূর্য উঠুক ঈষাণ কোণে;দখিনা হাওয়ায়
তুমি উড়ে যাও, ঝরে পড়ো; লাইশাক পুদিনাপাতায়
হাতব্যাগে বাসনাগুলো তন্দ্রায় মগ্ন; এ জীবন
ফেরারী চোখে হেঁটে যায় আনন্দহীন প্রহরগুলো
বনের ঘুঘুও জানে না শতাব্দীর শেষ ইতিহাস।

বিসর্জন

তারপর ঋতুরাজ বসন্তের মতো ফিরে যাবে
পুরনো শহরে, বুড়িগঙ্গার শীতল জল
নিভৃতে বিসর্জন দিবে বিনব্যাগ ভর্তি শুকনো
কদমফুল, বুকবন্দি শাদা চন্দনের আফিম
পাখি শিকারীর মতো সভ্যতার চাদর জড়িয়ে
ধনুক দিয়ে হত্যা করবে এক বিকেলের
দু’ফোটা অশ্রু অসংখ্য নুড়ীপাথরের কণা

আমি তো কেবল পরিচর্চা করি ফুলদানিতে সাজানো
ছোট ছোট জুঁই ফুলের নিঝুম রাত
এক কাপ কফি হাতে নিমগ্ন হই
লুডু খেলি মেঘেদের সাথে
আকাশে শব্দের ভাঙা গড়া দেখি আশ্চর্য হই
দীর্ঘশ্বাস ফেলি অতি-নিরবে

হোলি খেলার মাঠ অসংখ্য মাংসের ছড়াছড়ি
ভয় চৌদিক কম্পিত করে, কালো সাপের মতো
অন্ধকার ঘনিয়ে আসে ইষ্টহ্যামের বারান্দায়…
কাঁচ ভাঙার শব্দ সবাই শোনে
কপাল ভাঙার শব্দ কেউ শোনে না

ফেরা

কোন আহবানে ঘরে ফেরার কথা বলছো অরণ্য
তার’চে চলো প্রচ্ছন্ন ছায়া ভরে একটানা হাঁটি
হাঁটতে হাঁটতে পাঠ করি আমাদের গল্পও প্রকৃতি

কোন আহবানে ঘরে ফেরার কথা বলছো দিগন্ত
তার’চে ভাল শরীর জুড়ে মিশে যাক হাওয়া
সময়ের গন্তব্য টেনে হাসুক বে- ভোলাস্মৃতি?

কোন আহবানে ঘরে ফেরার কথা বলছো তুমি?
যে ঘরে মিছে আরাধনা, অলিক মায়া, কাঁটাগ্রস্থ
হৃদয়, নিজের ভেতর খরতর নদী ও বোবামূর্তি

সময়

কোথায় যেন হারাচ্ছে মৌন সময়
কি করবো আমি, কবিতা লিখব?…
বিগত সময়, তোমাকে ভাবতে ইচ্ছে
করছে, আগামীর হাসি তোমার দিকে
যেতে- যেতে মনানুভবের স্মৃতিঘাতে
আশাগুলো শূন্য হয়ে গেলে!
জানি ছায়ায় বাঁধা যায় না ঘর, ছায়ার
ভেতরও বন্দি হয় পোষামনপাখি ,তাই…
নীরবে ’আশা শব্দটাকে তুলে রাখব দেয়ালে

অরণ্যে বাগান

সুযোগ পেলে প্রতিদিন একগুচ্ছ আবেগী সময় সাঁতার কাটে লেক ডিস্ট্রিকের দীর্ঘ সিঁথির উপর, বুকের গিঁটে ওড়ে ঝাঁকবাঁধা বুনোশালিক…বিরহের করাতে কেটে কেটে ঝরে পড়ে বুড়িগঙ্গার বিরান চর; নিথর মেরুদন্ড নুয়ে যায় দেহত্বক স্পর্শ করে হেঁটে যাওয়া; বাস্তবতার ছোঁয়া… শব্দের গাঢ় বন্ধন, স্বচ্ছ জল বাদামী হলে কেউ কি জানে? কোন-সে কালো পাথর বুকে পুষে রোদের শরীর; ডায়রির খোলা পাতা কাঁপে… এ যাত্রা দীর্ঘ থেকে আরো দীর্ঘতর; অপ্রত্যাশিত দাবানল ছাই করে মাঠের পর মাঠ, শহরের পর শহর; ফুলহীন বিরান অরণ্যে ঠোঁটে কেবলই অভিশাপ জপে

‘তুমি আমারই মতো কান্দিও কান্দিও, কৃষ্ণ কৃষ্ণ নাম মুখেতে বলিও, মরিয়া হইব শ্রীনন্দের নন্দন, তোমারে বানাইব রাধা’…

নিজছায়া

কবিতা লিখি না অনেকদিন, অথচ জীবন্ত কবিতারা আমার চারপাশে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দেয় অহরহ… বুকের গহীনে জমে থাকা প্রবল আগ্রহ বিদায়ী হাওয়ায় উড়ে বাগবাড়ীর দীর্ঘ কেশ, ধূলোপড়া চায়ের কাপ, সেতারের করুণ সুর, রাতের অসহায় আকাশ, ডাইরির খোলা পাতা… কঠিন প্রশ্ন রাখে বাস্তবতার দোয়ার…জীবনের রঙ বদলে গেলে কতোটা আপন রয় নিজের ছায়া।

কবির সাথে যোগাযোগ : shahnaj_@hotmail.com

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!