বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ইভিএম ব্যবহার নিয়ে ইসি-ঐক্যফ্রন্ট বৈঠকে উত্তাপ



সংলাপের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা না করার দাবি জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সোমবার বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে এ দাবি জানায়। নির্বাচন কমিশনের কাছে ঐক্যফ্রন্টের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—এই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি অথবা গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েন করা এবং পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা দেওয়া। এসব দাবির মধ্যে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে নির্বাচন কমিশন নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানায়। আর তফসিল ঘোষণার বিষয়ে বলা হয়েছে, ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঐক্যফন্টের বৈঠকের ফলাফল পর্যালোচনা করেই ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করা হবে। ডিসেম্বরই নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময়। তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার কারণে জানুয়ারি মাসে নির্বাচন দেওয়া উচিত হবে না।

ইভিএম বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম গত রাতে একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘আমরা ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের জানিয়ে দিয়েছি, এ নির্বাচনে সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।’ এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সূত্র জানুয়ারিতে নির্বাচন না করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের যুক্তি তুলে ধরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

গতকাল বিকেল পৌনে ৪টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে শুরু হওয়া এ বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বরকতউল্লা বুলু, নঈম জাহাঙ্গীর ও সুলতান মুহাম্মদ মনসুর। অন্য পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কে এম নুরুল হুদাসহ চার কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম, মাহবুব তালুকদার, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদত হোসেন চৌধুরী এবং নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ।

জানা যায়, বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার দাবি জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। নির্বাচন কমিশনার শাহাদত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ইভিএম মেশিন না দেখেই মন্তব্য করা হচ্ছে। ইভিএমে কারচুপি করা সম্ভব না। প্রয়োজনে আপনারা টেকনিক্যাল লোকদের দিয়ে যাচাই করেন।’ এ পর্যায়ে মান্না বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করে বলছি, ইভিএমে ম্যানিপুলেট (কারসাজি) করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানাতে আসিনি। যদিও জনগণের আপনাদের ওপর আস্থা নেই।’ এর জবাবে শাহাদত হোসেন চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা নেই। তখন সিইসি কে এম নুরুল হুদাও বলেন, ‘আপনারা বড় বড় কথা বলেন।’ সিইসিকে থামিয়ে দিয়ে মান্না বলেন, ‘মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ।’

ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্য : ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধিদলের প্রধান আ স ম আবদুর রব নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের সাত দফা দাবির আলোকে আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে ও সরকারের কাছে যে দাবিগুলো জানিয়েছি, তার কিছু কিছু বিষয়ে ওনারা কথা দিয়েছেন আজকেই রক্ষা করবেন। বাকি দু-একটি বিষয় সম্পর্কে ওনারা সিদ্ধান্ত জানাননি। ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৭ নভেম্বর আমাদের সংলাপের ফলাফল না জেনে নির্বাচন কমিশন যেন কোনো তফসিল ঘোষণা না করে। ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদের মেয়াদ আছে। এখনো অনেক সময় রয়েছে। ইতিপূর্বে বহুবার তফসিল পরিবর্তনের রেকর্ড আছে। অতএব এবারও ৮ তারিখে তফসিল ঘোষণা করতেই হবে, না হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে, নির্বাচন হবে না—এমন নয়। বরং নির্বাচন প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো—যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে তফসিল ঘোষণা করলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।’

আ স ম রব জানান, ইসি বলেছে, পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট যাতে সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থিত থেকে ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকতে পারেন এর ব্যবস্থা করা হবে। ভোট শেষে ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার স্বাক্ষরিত ফলাফল তৃণমূলে এবং সব দলের এজেন্টকে সরবরাহ করা হবে। ফল গণনার আগে কারচুপির জন্য এজেন্টদের কাছ থেকে কোনো ফরমে বা সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হবে না।

প্রতিনিধিদলের নেতা বলেন, ‘ইসি বলেছে, আমরা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চেষ্টা করব। তবে ইসি রাষ্ট্র পরিচালনা করে না, নির্বাচন পরিচালনা করে। আপনারা এ দেশের জনগণ, আমরাও এ দেশের জনগণ, ভোটাররাও এ দেশের জনগণ। নির্বাচনের পরও আমাদের মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি এ দেশে থাকতে হবে। জবাবে আমরা বলেছি, আপনারা ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে এ দেশেই থাকবেন, তাই সেভাবেই কাজ করবেন।’

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে আ স ম রব বলেন, ‘আমরা ইভিএম চাই না। ভোটাররা চায় না। রাজনৈতিক দলগুলো চায় না। আপনারা (কমিশন) এ ব্যাপারে সিরিয়াস হবেন না। তবে কমিশন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।’ রব বলেন, ‘আমরা সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। সিইসি বলেছেন, সেনাবাহিনী থাকবে না, তা আমরা কখনো বলিনি। অতীতে সব নির্বাচনে সেনাবাহিনী ছিল। তবে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। তাদের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন। কিন্তু আমরা বলেছি, সেনাবাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিতে হবে। এ ছাড়া পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কমিশন বলেছে, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।’

কমিশন তফসিল পেছাতে রাজি হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে আ স ম রব বলেন, বিষয়টি  বিবেচনা করা হবে বলে কমিশন জানিয়েছে।

ইসির বক্তব্য : নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ তফসিল নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের দাবি বিষয়ে বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার এখতিয়ার একমাত্র নির্বাচন কমিশনের। ৮ তারিখে তফসিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের ৭ তারিখের বৈঠকের ফলাফল ৮ তারিখে প্রতিফলিত হবে। ৮ তারিখ সকাল ১০টায় কমিশন সভায় সংলাপের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সচিব বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা এবং পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তার বিষয়ে তাঁরা কথা বলেছেন। কমিশন তাঁদের আশ্বস্ত করেছে ভোটকেন্দ্রে ভোটার, পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা ইসি নিশ্চিত করবে। ভোটের ফলাফল এজেন্টদের স্বাক্ষরসহ  প্রকাশের দাবি জানালে  নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করেছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন এবং তাঁদের নিরাপত্তার দাবির বিষয়েও ইসি তাঁদের আশ্বস্ত করেছে। সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বলেছে, এখনো তফসিল ঘোষণা হয়নি, তফসিল ঘোষণার পরে কমিশনারদের সঙ্গে বসে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইভিএমের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, ইসি তাঁদের বলেছে, সীমিত পরিসরে শহর এলাকায় ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে। সেটাও কোন কোন কেন্দ্রে করা হবে, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ইসির প্রতি ঐক্যফ্রন্টের আস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, তাঁরা বলেছেন ইসির প্রতি তাঁদের আস্থা আছে, এ জন্য তাঁরা আলোচনা করতে এসেছেন। তাঁরা আন্তরিকভাবে আলোচনা করেছেন।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক সংলাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়। এর পরদিন গত রবিবার নির্বাচন কমিশন ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করে এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষে বলা হয়, সব কিছু বিবেচনায় নিয়েই তফসিল ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে আগামীকাল বুধবার ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের সংলাপও শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল ঐক্যফ্যন্টের নেতারা ইসির সঙ্গে  বৈঠকে  নিজেদের এসব দাবির কথা জানান।

এর আগে গত ২১ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য লিখিতভাবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন এ জোটের নেতারা। এরপর  গত ৩০ অক্টোবর  ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে। এর কারণ সম্পর্কে সেদিন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঐক্যফ্রন্ট নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ব্যাপারে আলোচনা হবে, তাই কমিশনের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করা হয়েছে।

উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়

গতকালের  বৈঠক সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে মান্নার সঙ্গে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার শাহাদত হোসেন চৌধুরী বিতর্কে বৈঠকে কিছুটা উত্তাপ ছড়ায়। এই বিতর্কের একপর্যায়ে সুলতান মুহাম্মদ মনসুর বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে, এক দলের নেতা আরেক জেলায় জেলে। এভাবে চলতে পারে না। তিনি ইসিকে সতর্ক করে বলেন, ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর করা যাবে না। ২০১৯ সালেও আপনারা দেশে থাকবেন, সেটা বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচন করবেন।

সূত্র জানায়, সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি নিয়ে শাহাদত হোসেন চৌধুরী বলেন, সেনাবাহিনীকে ম্যাজেস্ট্রেসি  ক্ষমতা দেওয়া অসাংবিধানিক। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসি সচিব সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘উত্তপ্ত বাক্যবিনিয়ম নয়। তবে ভেতরে গলার আওয়াজ এমনই ছিল।’

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!