শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৮ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আব্দুর রশীদ লুলু

পলাশীর বিশ্বাস ঘাতকদের পরিণতি



বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আরব বংশোদ্ভূত আলীবর্দী খান মৃত্যুবরণ করলে তাঁর অসিয়ত মতো ১৭৫৬ সালে মাত্র তেইশ বছর বয়সে মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে নবাব সিরাজুদ্দৌলা আরোহণ করেন। নবাব আলীবর্দী খানের কোনো পুত্র সন্তান ছিলেন না। ছিলেন তিন মেয়ে; যথাক্রমে- ০১. মেহেরুন্নেসা (ঘসেটি বেগম); ০২. রাবেয়া বেগম এবং ০৩. আমেনা বেগম।

ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের সন্তান মির্জা মোহাম্মদ আলী ওরফে নবাব সিরাজুদ্দৌলা। জীবদ্দশায় দেখে-শুনে ও পরিচর্যা করে নবাব আলীবর্দী খান নাতি সিরাজুদ্দৌলাকে মুর্শিদাবাদের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করে যান। কিন্তু অনেকেরই কাছে বিশেষতঃ নবাব সিরাজুদ্দৌলার খালা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম এবং ইংরেজদের কাছে বিষয়টি সুখকর ছিল না। ঘসেটি বেগম চেয়েছিলেন তার ছেলেকে নবাব বানাতে। আর ইংরেজ বণিকরা আতংকে ছিল- স্বাধীনচেতা নবাব সিরাজুদ্দৌলা সিংহাসনে আসীন থাকলে তাদের পক্ষে বাংলায় আধিপত্য বিস্তার সম্ভব হবে না। শুরু হয় ঘরে বাইরে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাস ঘাতকতা। ফলশ্রুতিতে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে পরাজিত হন নবাব সিরাজুদ্দৌলা। নবাব হন মীর জাফর আলী খা। ০৪ জুলাই (১৭৫৭) সকালে মীর জাফরের জামাতা মীর কাশিমের হাতে বন্দি হন পলাতক নবাব সিরাজুদ্দৌলা। লর্ড ক্লাইভের ঈশারায় মিরণ (মীর জাফরের পুত্র)- এর আদেশে মোহাম্মদী বেগ ওরফে মেহেদী বেগ নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে বিষাক্ত ছোরা দ্বারা কুপিয়ে কুপিয়ে নির্দয় ভাবে হত্যা করে ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থানে ফেলে রাখে। যাই হোক, আল্লাহর অপার করুণা ও মেহেরবাণীতে এই পৃথিবীর বুকেই নবাব সিরাজুদ্দৌলার হত্যাকারী ও পলাশী যুদ্ধের বিশ্বাস ঘাতকদের প্রায় সবারই নির্মম পরিণতি বরণ করতে হয়। এখানে সেই ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাস ঘাতকদের উলে¬খযোগ্য কয়েকজনের পরিণতির ওপর একটু আলোকপাত করা হলো। যা হয়তো পৃথিবীবাসীর জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

০১. মেহেরুন্নেসা (ঘসেটি বেগম): নবাব সিরাজুদ্দৌলার খালা ঘসেটি বেগমকে ঢাকার জিঞ্জিরার কাছে পরিকল্পিত ভাবে পানিতে ডুবিয়ে মারে ইংরেজরা। অথচ এই ঘসেটি বেগমই প্রথম ইংরেজদের সাথে সার্বিক সহযোগিতা করেন আধিপত্য বিস্তারে।

০২. মীর জাফর আলী খা এবং তার সন্তান-সন্ততি: মীর জাফর নামে মাত্র বাংলার নবাব হলেও তাকে ইতিহাসে ইংরেজদের কেনা গোলামে অভিহিত করা হয়। কুষ্ট রোগে ভূগতে ভূগতে অনেক কষ্টে তার মৃত্যু হয়। উলে¬খ্য, কুষ্ট রোগে আক্রান্ত মানুষকে তখনকার সময়ে খুবই ঘৃণা করা হতো। কেউ তাকে স্পর্শ করা দূরে থাক, ধারে কাছেও যেতো না। মীর জাফরের ছেলে মীরনের শরীরে এসিড ঢেলে ইংরেজরা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। মতান্তরে ব্রজপাতে মীরণের অপমৃত্যু হয়। অপর ছেলে নাজিমুদ্দৌলা মরে নিউমোনিয়ায় এবং ছোট ছেলে মরে বসন্তে। এভাবেই আল্লাহর কুদরতে শেষ হয় বিশ্বাস ঘাতক মীর জাফরের বংশ। এ ছাড়া তার নামই হয়ে গেছে, বিশ্বাস ঘাতক। এখন মীর জাফর বলতে মানুষ-জন বুঝে বিশ্বাস ঘাতক।

০৩. লর্ড ক্লাইভ: কূটচরিত্রের অধিকারী আধিপত্যবাদী লর্ড ক্লাইভও শান্তি পায়নি। শেষ পর্যন্ত সে লন্ডনের টেমস নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।

০৪. মোহাম্মদী বেগ (মেহেদী বেগ): নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে কুপিয়ে হত্যাকারী মোহাম্মদী বেগ পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে। শেষে একদিন কুয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।

০৫. রায় দূর্লভ: অনাহারে-অর্ধাহারে জেলখানায় মৃত্যু ঘটে রায় দূর্লভের।

০৬. সেনাপতি ইয়ার লতিফ: বিশ্বাস ঘাতক সেনাপতি ইয়ার লতিফ নিরুদ্দেশ হয়। আজো কেউ জানে না তার শেষ পরিণতির খবর।

০৭. উমিচাঁদ: এক সময়ের কোটিপতি, টাকা পাগল, সুদখোর উমিচাঁদ শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয়ে মারা যায়। পথের পাশে পড়ে থাকে তার লাশ।

০৮. রাজবল্লভ: নবাবের ধন-রত্ন লুটে প্রায় রাজা বনে যাওয়া রাজ বল¬ভের মৃত্যু ঘটে ঘাতক কর্তৃক শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে।

০৯. জগৎ শেট: গঙ্গায় সলিল সমাধি ঘটে জগৎ শেটের।

১০. মীর কাসিম আলী খা: মীর জাফরের জামাতা ও পরবর্তীতে নবাব মীর কাসিম আলী খা এক সময় নিজের ভুল বুঝতে পারলেও রেহাই পাননি। যুদ্ধে ইংরেজরা তাকে পরাজিত করে এবং শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয়ে মারা যান। দিল¬ীর শাহী মসজিদের তোরণের বাইরে তার লাশ পড়ে থাকে। ২২ এপ্রিল ২০১০

লেখক, সম্পাদক – আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা)।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!