বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দ্বিতীয় পর্ব

তারিক বিন যিয়াদের অনন্য ভাষণ।। হাবীব নূহ



৬.
তারিকের ব্যাকগ্রাউন্ড পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে দ্বিধা-ধন্ধ আছে।বেশ কিছু মত-অভিমতে বিভক্ত তাঁরা।
তিনি মূলত দাস ছিলেন, নাকি দাস ছিলেন না, এ নিয়েও আছে মতান্তর।যদিও তাঁর বংশধররা শতবর্ষ পর তাঁর দাস হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

তারিকের শিকড় নিয়ে প্রশ্ন আছে, তিনি আরব ছিলেন নাকি অনারব।
আবার আরব হলে তাঁর গোড়া কোথায়! এ নিয়েও আছে বিরোধ।
সম্প্রতি, ২০২২ সালে, তারিক বিন যিয়াদকে ঘিরে যখন ‘Fath Al-Andalus’ নামে একটি কুয়েতি-সিরিয়ান টেলিভিশন সিরিজ চিত্রায়িত হয় তখন তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
২০২২ সালের এপ্রিলে, সিরিজটি মরক্কোতে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং প্রযোজকের বিরুদ্ধে তারিকের আমাজিগ পরিচয় মুছে ফেলার অভিযোগ আনা হয়।
এদিকে তারিকের ত্বক সাদা নাকি কালো, এ নিয়েও আছে মতপার্থক্য।যদিও অধিকাংশ আলজিরিয়ান আর মরোক্কান সাধারণত গাঢ় চামড়ার হয় না।
আসলে, ‘কালো আর সাদা’—এটি একটি পশ্চিমা—মনুষ্য অবমূল্যায়নের—পরিভাষা ও ইস্যু।
তারিক পরবর্তী সময়ে ইউরোপিয়ান অমুসলিম লিখিয়েরা,বিশেষ করে ক্রুসেডের ভিতে রচিত ও চিত্রায়িত গান, কবিতা ও সাহিত্যে তারিক উত্তরসূরিদেরকে কালো সাজিয়ে ‘কালার’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পরন্তু, তারিক,হামাদানের একজন পারস্য বংশোদ্ভূত ছিলেন, নাকি তিনি কিন্দাহ/আস-সাদাফ/ উলহাসা গোত্রের একজন মুক্ত আরব সদস্য ছিলেন, নাকি উত্তর আফ্রিকার বার্বার ছিলেন অথবা অন্য কোন পরিচয় কি তাঁর ছিল?
তবে তাঁর পরিচয় আর যাই হোক না কেন,তিনি যে স্পেন বিজেতা তারিক বিন যিয়াদ।এটিই এখন তাঁর বড় পরিচয়।
তিনি একজন ম্যুর(Moor) হন অথবা আর যাই হোন,তাঁর এখন বড় পরিচয় এটিই যে,তিনি,উত্তর-পশ্চিম আলজেরিয়ার Tlemcen (তিলিমসেন) প্রদেশের Tafna (তাফনা) নদীর পাড় থেকে উঠে এসে আটলান্টিক মহাসাগর আর ভূমধ্যসাগর ঘেঁষা আন্দালুসিয়া জয়ের সূচনা দিয়ে পশ্চিম বিজয়ের মহানায়ক।

তিনি তারিক বিন যিয়াদ।আদতে,পৃথিবী খুব কমই দেখেছে তাঁর মত পারদর্শী সেনানীকে।যাকে,ইবেরিয়ার(Iberia) ইতিহাসে,সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তাঁর এ মহাবিজয় কালে,তাঁর সাথী সহযোদ্ধাদের মাঝে খোদ তারিকই ছিলেন সেনাদের এক বহির্মুখী প্রেরণা কারণ তারিকের ছিল অনুপম ব্যক্তিত্ব।আপরদিকে সময়ে সময়ে তারিকের উদ্দীপ্ত ভাষণ ছিল সেনাদের জন্য অন্যতম অন্তর্নিহিত প্রেরণা।

এই মহানায়ক কিন্তু, তাঁর মরণের আগের বছরগুলোতে বড় নীরব ছিলেন।একজন সৃজনশীল যোদ্ধা সহসা এত নিশ্চুপ কেন,এর কোন যথার্থ উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে তারিকের ভাষণ নিশ্চয় কখনো নিশ্চুপ ও নীরব হবে না।
৭.
উমাইয়া রাজের ষষ্ঠ খালিফা ছিলেন আল ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান।তবে তিনি ছিলেন আল-আওয়াল বা প্রথম।আল ওয়ালিদ আল-আওয়াল নামে খ্যাত।তাঁর জন্ম সাল ছিল ৬৬৮ খ্রীষ্টাব্দ তথা ৫০ হিজরী।তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ৭১৫।হিজরী সাল ছিল ৯৬।
তাঁর শাসনামল ছিল প্রায় দশ বছর।৭০৫ থেকে শুরু করে ৭১৫ সাল,তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।

আল ওয়ালিদের শাসনের অধীন উত্তর আফ্রিকার (ইফ্রিকিয়া) মুসলিম প্রদেশ শাসন করছিলেন মুসা বিন নুসাইর।তিনি ছিলেন একজন গভর্নর আবার সেনাপতিও।মুসার জন্ম হয়েছিল ১৯ হিজরী তথা ৬৪০ খ্রীষ্টাব্দ এবং মৃত্যু হয়েছে ৯৭ হিজরী সন তথা ৭১৬ খ্রীষ্টাব্দ।তবে মুসা গভর্নরের দায়িত্ব পালন করছিলেন আল ওয়ালিদ আল-আওয়ালের পিতা আবদুল মালিকের সময় থেকে।

এই মুসা বিন নুসাইরের একজন সেনাপতি ছিলেন তারিক বিন যিয়াদ।তারিক,মুসার নিযুক্ত Tangier (طنجة) শহরের গভর্নরও ছিলেন।Tangier উত্তর-পশ্চিম মরোক্ক’র একটি শহর।
মূলত মুসার নির্দেশনায়, তারিক পশ্চিমের অভিযানে বের হন।পরবর্তীতে হিস্পানিয়া (স্পেন, পর্তুগাল, আন্ডোরা ও ফ্রান্সের অংশবিশেষ) ও ভিসিগথ সাম্রাজ্য জয়ের ইতিহাস তারিকের ভাগ্যে জুটে।অবশ্যই খালিফা আল ওয়ালিদের সম্মতিতে ছিল তারিকের এই অগ্রসর হওয়া।
কুরআন-প্রেমী আল ওয়ালিদের শাসনকাল ছিল উমাইয়াদের সোনালী সময়।মুসলিমদের শাসন তখন বিস্তৃত হয়েছিল বহু দূর পর্যন্ত।পূর্বে চীন আর পশ্চিমে স্পেন অবধি।
কাকতালীয় ব্যাপার এই ছিল যে,এই দুই জন অর্থাৎ আল ওয়ালিদ আর তারিক শতাব্দীর
অর্ধেক সময়ও পৃথিবীতে থাকতে পারেননি তবে এ সময়ে এমন কিছু বিশাল স্মৃতি তাঁরা পৃথিবীতে রেখে গেছেন যে, সচেতন ও সংশ্লিষ্ট পৃথিবী তাঁদেরকে স্মরণ করতে সবসময় বাধ্য থাকবে।এবং তাঁরা দুজনই সমাহিত আছেন সিরিয়ার দামেস্কে।

লেখক: মুফতি

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!