মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

ভ্যালেন্টাইনস ডে এবং পেছনের কথা।। শাহনাজ সুলতানা



”বিশ্ব ভালোবাসা দিবস” বা ”ভ্যালেন্টাইনস ডে” হলো প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের বিশেষ দিন। এই দিনে অনেকে-ই প্রেমের বার্তাসহ কার্ড, ফুল, চটকলেট এবং অন্যান্য উপহার সামগ্রী পাঠিয়ে প্রিয়জনকে ভালোবাসার অনুভূতি, আকুতিসহ প্রেম নিবেদন করেন। এই দিন একান্তই প্রিয়জনের জন্য উৎসর্গীকৃত, ভালোবাসিবার দিন। ভালোবাসা দিবস প্রতিবছর ১৪ ফ্রেব্রুয়ারী সারা বিশ্বে পালিত হয়। ‘ভ্যালেন্টাইস ডে’ অনেকের কাছে ”সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স” ডে নামেও পরিচিত।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস শুধুমাত্র প্রেমিক-প্রেমিকা ও দম্পতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিনে যে কোন মানুষ তাদের পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধব, আত্বীয়-স্বজনসহ প্রিয়জনকে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন। বর্তমান যুগে ভালোবাসা দিবস অনুভূতি উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এটি বাণিজ্যিক উদযাপনে ও পরিণত হয়েছে।

“সেন্ট ভ্যালেন্টাইন” কে ছিলেন এ নিয়ে ভিন্নজনের ভিন্ন মত এবং গল্প রয়েছে। তবে সঠিক তথ্য এখনো অজানা। ক্যাথলিক চার্চ ভ্যালেন্টাইন বা ভ্যালেন্টিনাস নামে অন্তত তিনজন ভিন্ন সাধুকে স্বীকৃতি দেয়, যাদের সবাই শহীদ হয়েছিলেন। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী,অনেকে-ই বিশ্বাস করেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন একজন খ্রিস্টীয় ধর্ম অনুসারী। তিনি রোমের একজন যাজক ছিলেন, যিনি তৃতীয় শতাব্দীতে রোমে সেবা করেছিলেন। সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস এবং তার সেনাবাহিনী ঐ সময় অনেকের সাথে যুদ্ধে জড়িত ছিলেন। ক্লডিয়াস বিশ্বাস করতেন, অবিবাহিত পুরুষ সৈন্যরা বিবাহিত পুরুষ সৈন্যেদের চাইতে দক্ষ , তাদের পিছুটান নেই। বিবাহিত পুরুষরা ভালো দক্ষ সৈন্য হতে পারে না। কারণ, তারা তাদের স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারকে রেখে যুদ্ধে যেতে আগ্রহী হয় না, বরাবরই যুদ্বে যাবার ক্ষেত্রে অনিহা কাজ করে। ক্লডিয়াস সে সময় রোমান যুবকদের বিবাহ নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন। সম্রাটের এই পদক্ষেপ ভ্যালেন্টাইন অন্যায্য মনে করেন এবং তিনি সে সময় নিয়ম ভঙ্গ করে গোপনে প্রেমিক প্রেমিকাদের বিবাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। সম্রাট ক্লডিয়াস যখন ভ্যালেন্টাইনের গোপন ব্যবস্থার কথা জানতে পারেন, তখন তিনি ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং পরবর্তীতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে এখনও অনেকে জোর দিয়ে বলেন যে, এটি ছিল টারনির সেন্ট ভ্যালেন্টাইন যাকে রোমের বাইরে সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস শিরচ্ছেদ করেছিলেন।

ভ্যালেন্টাইনের জীবিতবস্থায় একজন জেলারের মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব এবং প্রেম হয়। অনেকের মতে, জুলিয়া নামক এই মেয়েটি তাকে কারাগারে দেখতে যেতো। ২৬৯ খীষ্ট্রাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারী ভ্যালেন্টাইনকে যখন হত্যা করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় সেদিন তিনি প্রেমিকাকে উদ্দেশ্যে করে “আপনার ভ্যালেন্টাইন” স্বাক্ষরিত একটি প্রেমপত্র পাঠান। অন্যান্য বিবরণ থেকে আরো জানা যায় যে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে হত্যার আরো একটি কারণ ছিলো, তিনি সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের শাসনামলে খারাপ আচরণ করা খ্রিষ্টানদের রোমান কারাগার থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন।

একটি নির্দিষ্ট দিনে ভ্যালেন্টাইনস ডে পালন করার পেছনে কারণ পুরানো ঐতিহ্য, অনেকের ধারণা এটি একটি রোমান উৎসব থেকে উদ্ভুত। রোমানরা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ”লুপারক্যালিয়া” নামে একটি উর্বরতা উৎসব করতো। সে উৎসবের অনেকগুলি আচার এবং নিয়ম ছিলো। রোমান পুরোহিতদের আদেশ অনুযায়ী লুপারসির সদস্যরা একটি পবিত্র গুহায় জড়ো হতো, যাজকরা উর্বরতার জন্য একটি ছাগল এবং শুদ্ধিকরণের জন্য একটি কুকুর বলি দিতো। তারপরে তারা ছাগলের চামড়া ছিঁড়ে ফালা করে, বলির রক্তে চুবিয়ে রাস্তায় নামতো। পুরুষরা নগ্ন বা অর্ধ নগ্ন হয়ে চারদিকে দৌড়াতো এবং সদ্য নিহত ছাগলের চামড়া দিয়ে মহিলা এবং ফসলের ক্ষেত উভয়কেই আলতোভাবে মারতো যাতে তারা আরো উর্ভর হয়। মহিলারা সে সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। উৎসবের আরো একটি আচার ছিলো, ছেলেরা একটি বাক্স থেকে মেয়েদের নাম তুলে ছবি আঁকতো। যে নাম ছেলেরা আঁকতো সে নাম অনুয়ায়ী উৎসবের সময় তারা প্রেমিক প্রেমিকা হতো এবং মাঝেমধ্যে ঐ সব প্রেমিক প্রেমিকারা বিয়ে করতো। তবে এটি আসলে সত্য কিনা তা জানা যায়নি। তা বিভিন্ন তথ্য থেকে সংগৃহীত।

এনআরপি সূত্রের মতে, প্রাচীন রোমে ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ”লুপারক্যালিয়ার” উৎসব উদযাপিত হতো এবং ঐ উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিলো রোমান উর্বরতা দেবতা লুপারকাসকে খুশি করা। অনেকের বিশ্বাস ”ভ্যালেন্টাইন্স ডে” পালিত হয় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু বা সমাধি বার্ষিকীকে স্মরণ করার জন্য-যা সম্ভবত ২৭০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি ঘটেছিল। হিষ্টোরী ডট কমের তথ্য অনুযায়ী ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে পোপ প্রথম গেলাসিয়াস ভালোবাসার কারণে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে ঈশ্বরের প্রিয় তালিকায় যুক্ত করেন এবং পঞ্চম শতাব্দীর ১৪ফেব্রুয়ারী প্রথম ”ভ্যালেন্টাইন্স ডে ”ঘোষনা করেন। প্রাচীন মিসরীয়দের বিশ্বাস হৃৎপিণ্ড আবেগ এবং সব স্মৃতির উৎস । এই অঙ্গকে মিসরীয়রা এতই বেশি মূল্য দিত যে মমি করার সময় বাকি সব অঙ্গ ফেলে দিলেও হৃৎপিণ্ড শরীরের ভেতর রেখে দিত। মিসরীয়দের মতো অ্যারিস্টটলও বিশ্বাস করতেন, হৃৎপিণ্ডই বুদ্ধিমত্তার ধারক। লোবাসা দিবসের প্রাচীনতম কবিতাটির জনক ছিলেন এক ফরাসি রাজপুত্র। ১৪১৫ সালে আজাঁকুর যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে বন্দী ডিউক অব অলিয়ঁ শার্ল কারাগারে বসে তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশে ওই কবিতাটি লিখেছিলেন। সময়ের সাথে সাথে এ দিবসটি বিশেষ রোমান্টিক প্রেমের দিনে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্টে প্রথম ১৭০০ এর দশকের গোড়ার দিকে হাতে তৈরি ভ্যালেন্টাইন বিনিময় শুরু হয়েছিলো। ১৮৪০-এর দশকে এস্টার এ. হাওল্যান্ড নামে একজন নারী শিল্পী এবং উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্টে ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা কার্ড তৈরী করে জনপ্রিয় করেন । ভ্যালেন্টাইন হাওল্যান্ড, “মাদার অফ দ্য ভ্যালেন্টাইন” নামে পরিচিত। তিনি এমন একটি সময়ে কার্ড ব্যবসা শুরু করেছিলেন যখন বেশিরভাগ নারীরা ঘরে বসে থাকতেন। নারীরা নেতৃত্ব দেওয়া দূরে থাক, চাকরি করার ও সুযোগ ছিল না। হাওল্যান্ড তার কার্ড তৈরির ব্যবসা প্রতিষ্ঠা এবং একটি সম্পূর্ণ শিল্পের পথপ্রদর্শক ছিলেন। ভালোবাসা দিবসে গোলাপ জনপ্রিয় হয়ে উঠে ভিক্টোরীয় যুগে কারণ, রোমান প্রেমের দেবী ভেনাসের প্রিয় ফুল ছিলো গোলাপ। যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয়ভাবে প্রথম ভ্যালেন্টাইনস ১৭ শতকের কাছাকাছি উদযাপন শুরু হয়ে। এরপর কানাডা, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালিত হয়ে আসছে।

ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে অনেকেই বেশ উৎফুল্ল থাকেন। এ দিনকে ঘিরে থাকে নানা ধরণের পরিকল্পনা যেমন রোমান্টিক ছবি দেখা, একসাথে বাইরে খেতে যাওয়া, পার্কে ঘুরা ইত্যাদি। রিটেইল ফেডারেশনের জরিপে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্টে ভ্যালেন্টাইন্স ডে এর উপহারের জন্য জনপ্রতি গড়ে প্রায় ১৬৮ ডলার খরচ করেছে, যা দেশব্যাপী প্রায় ২৬ বিলিয়ন। সোসাইটি অফ আমেরিকান ফ্লোরিস্টের মতে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-এর জন্য ২৫০ মিলিয়নেরও বেশি গোলাপ উ্ৎপাদিত হয়েছে। লাল গোলাপ সেই সংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অন্য একটি রিপোর্টে দেখা গেছে আর্থিক বিষেষজ্ঞরা বলছেন এ বছর আমরেকিরিকনরা ফুল, চকলেট এবং শুভেচ্ছা কার্ডের মতো ভ্যালেন্টাইন উপহারের জন্য ২৭.৫ বিলিয়ন অর্থ ব্যয় করবে।

বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং পয়লা ফাল্গুন এক সাথে উদযাপিত হচ্ছে। যদিও এর আগে পয়লা ফাল্গুন উদ্‌যাপিত হতো ১৩ ফেব্রুয়ারি। গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলা বর্ষপঞ্জির সংস্কার করায় এখন একই দিনেই দুটি উৎসব উদযাপিত হয়। দুটি উৎসব একসাথে উদযাপিত হওয়ায় বাংলাদেশে এই দিনটি বেশ ঘটা করেই পালন করা হয়। এ দিনে তরুণীরা বাসন্তী পোশাকের সাথে ফুল দিয়ে সাজগোজ করেন। অনেকে গাঁদা ফুলের মালার পাশাপাশি বিভিন্ন ফুল দিয়ে বানানো মুকুট পরে থাকেন। শুধুমাত্র মেয়েরা নয় ছেলেরা ও সেদিন নানা ধরণের পাঞ্জাবি পড়ে উদযাপন করেন দিনটি।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে। বিশ্ব ভালোবাসার রঙ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক। প্রিয়জনের জন্য উৎসর্গকৃত এই দিন হোক সুখের এবং ভালোবাসায় ভরে উঠুক সকলের আঙিনা।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!