রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

সম্ভাব্য ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: বিশেষজ্ঞদের নতুন সতর্কবার্তা



ছবি সংগৃহীত

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় প্রকাশ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় একটি গোপন ফল্ট বিদ্যমান, যা বাংলাদেশে ৯ মাত্রার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটানোর সক্ষমতা রাখে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশ তিনটি বৃহৎ টেকটোনিক প্লেট—ভারত, ইউরেশিয়া ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে এসব প্লেট আটকানো অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

গতকাল শনিবার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, গত দুই দিনে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তাঁর মতে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এমন ঘটনা আরও ২০ বার ঘটতে পারে, এবং ধীরে ধীরে কম্পনের মাত্রা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সময় আসেনি; পরিস্থিতি বুঝতে আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যদি ৫.৭ মাত্রার চেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়, তবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে পারে। বিশেষজ্ঞের মতে, সব ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদী অঞ্চলেই।

জাপান থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ রুবাইয়াত কবীরও জানান, বাংলাদেশের অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখানে তিনটি বিশাল প্লেটের মিলনে প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি হয়। ভারতীয় প্লেট উত্তর–পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে ধাক্কা দিচ্ছে, ফলে এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

এদিকে নরসিংদীর ঘোড়াশাল এলাকায় দুদিন ধরে যে ভূমিকম্প হয়েছে, সেখানে মাটিতে দেখা দেওয়া ফাটল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ। বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ স ম ওবায়দুল্লাহ জানান, সাত সদস্যের একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, বিশেষ করে ঘোড়াশাল ডেইরি ফার্ম ও পলাশ রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে গিয়ে ধসে পড়া মাটির নমুনা সংগ্রহ করেছে। পরীক্ষার পর জানা যাবে ভূমিকম্পের ধরন ও এর গভীরতা।

ঢাবির ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “সামনে আরও বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে। আজকের কম্পন সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। প্লেটগুলো আটকানো জায়গা থেকে সরে যেতে শুরু করেছে, যা আমরা ২০১৬ সাল থেকেই সতর্ক করছি।”

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের গবেষণায় বলা হয়, গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচে থাকা মেগাথার্স্ট নামের একটি বিশাল ফল্ট মাইলের পর মাইল জুড়ে পললের নিচে লুকিয়ে রয়েছে। এই ফল্টই ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম। গবেষকরা জানান, এটি দুই প্লেটের সাবডাকশন জোনে অবস্থিত।

ড. সৈয়দ হুমায়ুন বলেন, “বাংলাদেশে অসংখ্য ফল্ট থাকলেও সবগুলো নিয়ে উদ্বেগ নেই। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত দুই প্লেটের সংযোগস্থল, যেখানে গত ৮০০–১,০০০ বছরে সঞ্চিত শক্তি এখনো বের হয়নি।” সাবডাকশন জোনে হওয়া ভূমিকম্প অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হয়—যেমন প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অব ফায়ার অঞ্চলের কম্পনগুলো সাধারণত ৭.৫ মাত্রার বেশি হয়।

তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, কক্সবাজার থেকে মিয়ানমান পর্যন্ত যে ফল্ট লাইন রয়েছে সেখানে ১৭৬২ সালের ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন তিন মিটার উঁচুতে উঠে এসেছিল এবং ওই ঘটনায় বঙ্গোপসাগরে সুনামি হয়ে প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়। যদিও সেই অঞ্চলের শক্তি তখনই বের হয়ে যায়, এখন সেখানে নতুন করে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে হিমালয়ের নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেট ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে—ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এমন প্রতিবেদন প্রকাশের একদিন পরই বাংলাদেশে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। বিষয়টি সত্য হলে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ বিভিন্ন প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত জটিল এলাকাতেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। তবে সঠিক চিত্র জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, পৃথিবীর কঠিন ভূত্বক বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত এবং এ প্লেটগুলো ভাসমান অবস্থায় নড়াচড়া করে। প্লেটগুলো সংঘর্ষ বা সরে গেলে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ, কিংবা পর্বতমালা সৃষ্টি হয়। পৃথিবীতে সাতটি বড় প্লেট এবং অসংখ্য ছোট সাব-প্লেট রয়েছে। ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষেই হিমালয় সৃষ্টি হয়েছে, এবং এ অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে পড়ে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় প্লেটের নিচের অংশ ধীরে ধীরে ভেঙে ম্যান্টলে ঢুকে যাচ্ছে। এই ভাঙন ভূত্বকে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে, যা ভূমিকম্পের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!