রবিবার, ৩ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাড়ছে আর্থিক চাপ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে চ্যালেঞ্জে সরকার



ছবি : সংগৃহীত

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় বৃদ্ধি, রাজস্ব ঘাটতি এবং জ্বালানি সংকট মিলিয়ে অর্থনীতিতে চাপ তীব্র হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে গতি আনতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ কিছুটা কমানো হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও বাড়বে।

অর্থবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সরকারের ব্যয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ব্যয় প্রায় ৪.৮০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান বলছে, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। তুলনামূলকভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এ হার ১২ থেকে ১৯ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১২ শতাংশ। বাংলাদেশে এ অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৭ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় বাজেট ঘাটতি বাড়ছে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এ প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী কয়েক বছরে ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ এই পাঁচ বছরে মোট প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যার মধ্যে ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার মূলধন এবং ৭.৬ বিলিয়ন ডলার সুদ।

আরও দীর্ঘমেয়াদে, ২০২৫-২৬ থেকে ২০৩৪-৩৫ সময়কালে মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে চাপ আরও বাড়বে। আবার দেশীয় উৎস থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, আগামী বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং খাদ্য মজুত জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ গ্রহণের হার বেড়ে যাওয়ায় চাপ দ্রুত বাড়ছে। আগামী পাঁচ বছরেই ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের বাধ্যবাধকতা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প—যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং যমুনা রেল সেতু—উচ্চ ব্যয়ের কারণে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অর্থনীতিবিদরা আরও উল্লেখ করেছেন, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা, অর্থ পাচার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে না পারা—এসব কারণও বর্তমান অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, আগামী ৫ থেকে ১০ বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!