শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

বেসরকারি খাত থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ



ছবি :সংগৃহীত

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের উদ্যোগে প্রায় ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ইতোমধ্যে ১২টি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে মোট ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুক্তি করেছে। এসব প্রকল্পে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ টাকা ১২ পয়সা।

বিপিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত এই দর আগে চুক্তিবদ্ধ একই ধরনের প্রকল্পগুলোর তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৫ সেন্ট কম।

বিভিন্ন জেলায় হবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প

চুক্তিবদ্ধ ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। পাবনার ঈশ্বরদীতে স্থাপন করা হবে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র।

কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট করে দুটি এবং বাগেরহাটের মোংলায় আরও একটি ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ঈশ্বরদীতে আরও একটি ৭০ মেগাওয়াটের প্রকল্প রয়েছে।

অন্য প্রকল্পগুলো মৌলভীবাজারের বিবিয়ানা ও সদর, নীলফামারীর জলঢাকা, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী এবং নোয়াখালীর সুধারামে স্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্পের সক্ষমতা ১০ থেকে ৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে।

কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুরের ভাইস চেয়ারম্যান ইমরান করিম জানান, তার প্রতিষ্ঠান ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার তিনটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তিনটি প্রকল্পই ২০২৮ সালের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎেও প্রণোদনা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহ দিতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার।

এই কর্মসূচির আওতায় ব্যাটারিসহ ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৫২ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৭৩ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত এবং ৩৭৮ দশমিক ৫৬ মেগাওয়াট অফ-গ্রিড।

বিপিডিবির নিজস্ব প্রকল্প

বিপিডিবি নিজস্ব অর্থায়নেও ৬৮৯ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আইপিপিগুলোর সঙ্গে করা চুক্তিগুলো সরকারের বৃহত্তর জ্বালানি মিশ্রণ কৌশলের অংশ। এর লক্ষ্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রচলিত, বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো।

তিনি জানান, রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করেছে বিপিডিবি। এছাড়া ফেনীর সোনাগাজীতে ২২২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করেছে অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়তা কোম্পানি (আইআইএফসি)। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি নিজস্ব অর্থায়নে ৬৮৮ কিলোওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪ হাজার ১৯৫ কিলোওয়াট-পিক সক্ষমতা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

এর আগে নিজেদের ভবন ও জমিতে ১৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য দরপত্রও আহ্বান করেছিল বিপিডিবি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় লক্ষ্য

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করাই এর উদ্দেশ্য।

সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০-এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

এছাড়া বায়ু, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং অ্যাগ্রিভোলটাইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারবে।

তার মতে, সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহিত করা গেলে এ খাতে সরকারের বিনিয়োগের প্রয়োজনও কমে আসবে।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!