
ভিসা প্রত্যাখ্যানের সীমা ১০ থেকে ৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসার নিয়ম কঠোর হওয়ায় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের দেওয়া ভর্তি প্রস্তাব আগেভাগেই প্রত্যাহার করছে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারের নতুন বিধিনিষেধের প্রভাব পড়ছে একদিকে বিদেশে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ওপর, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভরশীল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক অবস্থার ওপরও।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিসা প্রত্যাখ্যানের গ্রহণযোগ্য সীমা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে। ফলে নিয়োগের অনুমতি হারানোর আশঙ্কা এড়াতে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে যেসব দেশ থেকে আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যান বা আবেদন প্রত্যাহারের হার বেশি, সেসব দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব বাতিলের প্রবণতা বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন করতে সাধারণত সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তির নিশ্চয়তা প্রয়োজন হয়। তাই ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হলে শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদনপ্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এফটির প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের তথ্য বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হার বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী ভিসার মোট আবেদনের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৩ সালে হারটি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
- বাংলাদেশ: ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে আবেদন প্রত্যাহারের হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে।
- পাকিস্তান: আবেদন প্রত্যাহারের হার ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
- ভারত: হার ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আবেদন প্রত্যাহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা এনরোলির তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ইতিমধ্যে ৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষা খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি বাড়ানোর পেছনে অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে সরকারের উদ্বেগ রয়েছে। এফটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু দেশের নাগরিক শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে পরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই বাড়ানো হচ্ছে।
হোম অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাজ্যে ইতিবাচক অবদান রাখেন। তবে অভিবাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষার্থী নিয়োগ করতে হবে।
তবে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ঝুঁকির মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করায় বৈধ উদ্দেশ্যে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কারণ, কোনো দেশের সব আবেদনকারীকে একইভাবে বিবেচনা করা না হলেও সামগ্রিক প্রত্যাখ্যানের হার বাড়লে সেই দেশ থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলো নিরুৎসাহিত হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল বিধিনিষেধ নয়, ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোস্মিথের অভিযোগ, আগের তুলনায় ভিসা প্রক্রিয়াকরণ এখন কম অনুমানযোগ্য হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, কিছু ক্ষেত্রে অসংগতিপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ যুক্তিতে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা আগে অন্য কোনো দেশে পড়াশোনার কথা বিবেচনা করেছিলেন বলে তাঁদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ রয়েছে। আবার গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রিতে ভর্তি হতে ইচ্ছুক কিছু শিক্ষার্থীকে এমন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার কারণে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যেগুলো সংশ্লিষ্ট কোর্সের অংশ ছিল না বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি।
ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক স্টিভেন ম্যাকগুইয়ার কিছু সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী এবং পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, একটি ঘটনায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান নরউইচে—এ বিষয়টিও বুঝতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি গত বছরের শেষ দিক থেকে কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। ভিসা নীতির কঠোরতা, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই চাপের মুখে রয়েছে।
এ অবস্থায় ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহারের প্রবণতা বাড়লে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় আরও কমে যেতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী ভেনেসা উইলসন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আর্থিক চাপের কারণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্গঠন, কর্মী ছাঁটাই এবং কোর্স ও ক্যাম্পাস বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের উপাচার্য জেমস মিলারের মতে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ বন্ধ করেছে। তাঁর আশঙ্কা, চলতি বছরে অনেক প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ডের উপাচার্য স্যার ডেভিড বেল বলেছেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন পরিস্থিতি বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আবেদন প্রত্যাহারের হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানোর অর্থ হলো, আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির প্রস্তাব পেলেই পুরো প্রক্রিয়া নিশ্চিত হয়ে গেছে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানভেদে ভর্তি নীতি ও ভিসা প্রক্রিয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ কমিয়ে দিলে আবেদনকারীদের পছন্দের প্রতিষ্ঠান ও কোর্সে ভর্তির সুযোগও সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের লক্ষ্য অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানো এবং ভিসা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনে করছে, কঠোর সীমা ও অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের কারণে বৈধ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
হোম অফিস নিয়োগপ্রক্রিয়া উন্নত করতে আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহায়তা করার কথা জানিয়েছে। তবে ভিসা প্রত্যাখ্যানের গ্রহণযোগ্য সীমা ৫ শতাংশ বহাল থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ঝুঁকি কমাতে দেশভিত্তিক নিয়োগনীতি আরও কঠোর করতে পারে।
এর ফলে বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা সংকুচিত হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে ভিসা সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগনীতি এবং সরকারের পদক্ষেপের ওপর।



