শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

বিশ্বঋণ ছাড়াল ৩৬৫ লাখ কোটি ডলার, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র; বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম



ছবি :সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে সরকারি-বেসরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৩৬৫ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১০ লাখ কোটি ডলার। মোট ঋণের হিসাবে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সরকারি ঋণের পরিমাণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশের সমান।

আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের ঋণ হিসাব করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬৫ লাখ কোটি ডলারের বেশি। বিশ্বের জনসংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।

বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সরকারি ঋণের পরিমাণে প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১২৭ শতাংশ।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের সরকারি ঋণ ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের ঋণ ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। তবে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি, ১৯৯ শতাংশ।

তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ১০২ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ফ্রান্সের ঋণ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা ইতালির সরকারি ঋণ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। সপ্তম স্থানে থাকা জার্মানির ঋণ ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।

অন্যদিকে, ভারতের অবস্থান অষ্টম। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ৮৩ শতাংশ। নবম অবস্থানে থাকা কানাডার ঋণ ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার। দশম স্থানে থাকা ব্রাজিলের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার।

বিশ্বের দেশগুলোর সরকারি ঋণের পরিমাণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। দেশটির সরকারি ঋণ প্রায় ২০ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার। জিডিপির তুলনায় এই ঋণের অনুপাত ৪০ শতাংশ।

ঋণের মোট পরিমাণ দিয়ে একটি দেশের আর্থিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না। দেশের অর্থনীতির আকার, আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং ঋণের বিপরীতে সুদের হারও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি ঋণের সুদ বাবদ ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।

এই ব্যয় বৈশ্বিক সামরিক খাতের মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি। বিশ্বে সামরিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যয় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের রাজস্বের বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবসরকালীন ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় কমানোর পথে হাঁটতে হতে পারে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি নিয়ে অসন্তোষ, আবাসনসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থের ঘাটতির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে এসব কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

এর মধ্যে ফ্রান্সের পরিস্থিতি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পাশাপাশি শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলেছে।

এ পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই মেয়াদে জার্মানির ঋণের সুদের হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। সুদের হারের এই পার্থক্য ইঙ্গিত করে, ফ্রান্সের ঋণপত্র কিনতে বিনিয়োগকারীরা জার্মানির তুলনায় বেশি মুনাফা চাইছেন।

এর আগে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোপীয় ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশকে ঋণ সংগ্রহে উচ্চ সুদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর্থিক সহায়তা নিতে হয়।

বর্তমানে ফ্রান্সের সরকারি ঋণের সুদের হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউরোপে যুক্তরাজ্যের ঋণের সুদের হার ছাড়া অন্য দেশগুলোর তুলনায় ফ্রান্সের পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারি আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা দেশটির জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সরকার সাধারণত অর্থ সংগ্রহের জন্য ঋণপত্র বিক্রি করে। বিনিয়োগকারীরা এসব ঋণপত্র কিনে সরকারকে অর্থ দেন এবং বিনিময়ে নির্ধারিত হারে সুদ পান। ঋণপত্রের মেয়াদ শেষ হলে সরকার মূল অর্থ ফেরত দেয়।

বাজারে ঋণপত্রের দাম কমে গেলে সাধারণত এর সুদের হার বেড়ে যায়। ফলে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হয়। এতে শিক্ষা, হাসপাতাল ও সড়ক অবকাঠামোর মতো জরুরি খাতে অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা কমতে পারে।

সরকারি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব ব্যক্তিপর্যায়েও পড়তে পারে। বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং অন্যান্য ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক ঋণের ক্রমবর্ধমান পরিমাণের পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয় এখন বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ঋণের দায় মেটানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা সচল রাখতে পর্যাপ্ত অর্থ নিশ্চিত করাই দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!