মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শাহনাজ সুলতানা

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সমাজের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব



বিগত দিনে বাংলাদেশে যতোবার বেড়াতে গিয়েছি ততবার-ই একজন মহিলাকে দেখেছি বাসার কাজকর্মে সাহায্য করতে। শান্ত স্বভাবের ঐ মহিলার দুটি মেয়ের মধ্যে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বছর কয়েক আগে। কিছুদিন পূর্বে শুনেছি উনার স্বামী ছোট মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন পাশের গ্রামের এক যুবকের সাথে যার বয়স সাতাশ বছর। এই বিয়েতে মেয়েটির সম্মতি ছিল না, বেশ কয়েকবার অসম্মতির কথা জানানোর পরও তার বাবা জোরপূর্বক তার বিয়ের আয়োজন করেন। কিশোরী মেয়ে তা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি, জোরপূর্বক আয়োজিত এই বিয়েকে ঠেকানোর জন্য কোন উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পাশের বাড়ীর এক ভদ্রমহিলার সহযোগীতায় সে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে তার এই বিয়েতে অসম্মতির কথাটি জানায়। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গ্রামের মুরব্বিরা বিয়ে বাড়িতে এসে বিয়ে ভেঙ্গে দেন এবং মেয়েটি ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোথাও বিয়ে দেওয়া যাবে না বলে অঙ্গীকার করান।

খবরটি শোনার পর মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলাম মেয়েটিকে । মাত্র বার বছর বয়সে সে তার ভবিষ্যত উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে সাহস সঞ্চয় করে যে ভাবে অভিভাবকেদের অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে কঠোরভাবে মোকাবেলা করছে, সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমাদের সমাজে প্রতিটি নাগরিকদের উচিত শুধুমাত্র বাল্যবিবাহ নয় – যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, এসিড নিক্ষেপ, যৌতুকসহ যত ধরণের ঘৃণ্যতম মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড রয়েছে তার বিরুদ্ধে এগিয়ে আসা।

বর্তমানে নারীরা আর পিছিয়ে নেই। বিশ্বের প্রতিটি দেশে অধিকাংশ নারীরা অন্য কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং অনেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করে সফল নারী হিসাবে সমাজে প্রতিষ্টিত হচ্ছেন। আমাদের নারীরা পুরুষের সাথে সমানভাবে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আসনে এবং অবদান রাখছেন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকান্ডে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই এমন এক ধূসর সময় ছিল পৃথিবীতে, যখন নারীদের শুধু ভোগের বস্তুই মনে করা হতো। পরিবার বা সমাজে তাদের চাওয়া পাওয়ার কোন মূল্য দেওয়া হতো না। অনেকের ধারণা ছিল, নারী মানেই যৌনক্ষুধা মোটানোর আশ্রম, সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত। বিশেষ করে আমাদের পুরুষশাষিত সমাজে নারীরা ছিলেন বারাবরই অবহেলিত এবং প্রতারিত। এমনও সময় পেরিয়ে এসেছি, যে সময়টাতে পরিবারে কন্যা সন্তান জন্মালে সদ্য প্রসূতি মায়ের উপর নেমে আসতো সামাজিক, পারিবারিক, শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন যা শুধুমাত্র ভুক্তভোগিরা ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারবে না।

আদিযুগের অবসান ঘটে বর্তমানে চারপশে যখন নারী উন্নয়নের জয়গান তখন কিছু কিছু খবরাখবর সত্যিই ভাবনায় ফেলে দেয়। প্রশ্ন জাগে আমরা কি আসলেই আদি যুগের ধ্যান ধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পেরেছি? আমাদের অভিবাবকরা কি সত্যিই বেরিয়ে আসতে পেরেছিন কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিঁড়ে? না, কেন জানি মনে হয় এখনো অধিকাংশ অভিবাবকরা মুক্ত হতে পারেননি পুরোপুভিঅবে। অনেকের ধারণা মেয়েদের লেখাপড়া করে কি হবে তাদের তো ঘরেই থাকতে হবে আজীবন। যে পুরুষ দু’বেলা দু’মুটো ভাত এবং বছরে এক জোড়া কাপড়ের গ্যারান্টি দিতে পারবে, সে পুরুষই তাদের মেয়ের জন্য উপযুক্ত । যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজ মেয়েকে উক্ত পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে পারলেই হাফ ছেড়ে বাচঁবেন। কিন্তু যে পুরুষটির সাথে তাদের মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন, সে পুরুষটা যদি মেয়ের বয়সের চেয়ে দ্বিগুণ বয়স এবং অ-শিক্ষিত হয় সেটাকে তারা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে দেখেন না। তারা ভাবেন, বিয়ের জন্য শুধু একটি পুরুষ খুবই প্রয়োজন, তার শিক্ষা, বয়স এবং আচার আচরণ, অতীত , বর্তমান কোন কিছুই নিয়ে তারা মোটেই তোয়াক্কা করেন না । এমনও দেখেছি বিয়ের বয়স হয়নি, লেখাপড়া বন্ধ করে দাদার বয়সী লোকের কাছে পনের, ষোল বছরের মেয়েদের বিয়ে দিতে। কিন্তু বিয়ে দেবার সময় একবারও ভাবেন না যে মেয়ের কোন মতামত আছে কি না, বা বয়সের দ্বিগুন পুরুষের সাথে অল্প বয়সী একটি মেয়ে কি ভাবে কাটাবে জীবন? এছাড়া অল্প বয়সে বিয়ের পর ঘন ঘন বাচ্চা প্রসবের দরুণ অনেক মেয়েরা পুষ্টিহীনতায় ভুগে এবং যথাসময়ে উপযুক্ত সু- চিকিৎসার অভাবেও অনেক নারীরা মৃত্যুবরণ করেন অহরহ।

বাংলাদেশে বাল্য বিবাহ এক জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাল্যবিবাহ বন্ধের দাবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলন হয়েছে এবং তা বন্ধের লক্ষে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের আওতায় বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এ আইনে শিশুর বিয়েও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এ সমস্যা প্রতিরোধে যথাযত আইন থাকলে ও বাস্তবে এ আইনের কতোটুকু ব্যবহার হচ্ছে তা ভাবনার বিষয়। দ্য মেজরিটি এ্যক্ট অনুসারে ১৮ বছরের নীচে কোন ব্যক্তি ভোটাধিকার প্রাপ্ত হন না এবং তারা কোন দেওয়ানী চুক্তিও করতে পারবেন না। মুসলিম বিয়ে যেহেতু একটি দেওয়ানি চুক্তি, কাজেই একজন নাবালক বা নাবালিকা তারা নিজে কোন চুক্তি করতে পারবেন না। ১৯৭৪ সালের শিশু আইনটি সংশোধন করে ১৯৮৪ সালের সংশোধন অনুসারে বিয়েতে বর ও কনের বয়স পরিবর্তন করে বরের ক্ষেত্রে ২১ এবং কনের ক্ষেত্রে ১৮ নীচে বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নারী শিশু আইন ও অন্যান্য আইনে ১৬ থেকে আটারো বছর, এমন কি ২১ বছর বয়সী ব্যক্তিকে শিশু হিসাবে গণ্য করা না হলেও ১৯৮৪ সালের সংশোধনে ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষ এবং ১৮ বছরের কম বয়সী নারীকে বৈবাহিক ব্যাপারে শিশু ও নাবালক বা নাবালিকা হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে যারা নিজের ইচ্ছায় অনুপযুক্ত বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন অথবা যাদের অভিবাবক কর্তৃক অনুপযুক্ত বয়সে বিবাহ সম্পন্ন হবে, তাদের উক্ত আইনের ৪, ৫, ও ৬ ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে এবং তাদের সর্বোচ্চ এক মাসের জেল অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।

আমরা যারা বিলেতে বসবাস করি সবাই জানি, বিলেতে কোন ছেলে বা মেয়েকে ১৮ বছরের নীচে বিয়ে দেওয়া যায় না এবং জোড়পূর্বক কোন ছেলে বা মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইলে অভিবাকদের কঠোর আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। আর এই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রায় সব অভিবাকরা তাদের সন্তানকে ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে দিতে বিরত থাকেন। এ ছাড়াও আগের তুলনায় বিলেতে অধিকাংশ অভিবাকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে এখন খুবই সচেতন, সন্তানদের লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য যা যা প্রয়োজন নিজ সাধ্য অনুযায়ী তারা সব ধরণের সাহায্য ও সহযোগিতা করেন।

বিলেতের তুলনায় বাংলাদেশে চিত্র একটু অন্য রকম। অনেকের মতে বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ হচ্ছে দারিদ্রতা, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, লিঙ্গবৈষম্যসহ নানা ধরণের একাডেমিক চাপ। কিন্তু তাই বলে, নিজ সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা না করে তাদের মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে অভিবাকরা যখন মানবতাবিরোধী কঠোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন খুবই খারাপ লাগে। আমাদের সমাজে প্রতিটি অভিভাবকেরই উচিত সব ধরণের কুসংস্কার পরিত্যাগ করে নিজ সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে তাদেরকে সহযোগিতা করা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া। বাল্য বিবাহ বন্ধের লক্ষ্যে সমাজে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও সাহসী হতে হবে এবং জাতীয় এই সমস্যার বিরুদ্ধে সামাজিক, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রিয়ভাবে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করি।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!