অর্থকরী ফসল পাট চাষাবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সময় মতো বীজ বপণ, অন্তবর্তী পরিচর্যা এবং সময় মতো কর্তন। এর সাথে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাতলা করণ। পাতলা করণটা হতে হবে অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে। যেন বেশি পাতলা না হয়। আবার ঘনও যেন না হয়। বেশি পাতলা করলে পাট গাছ মোটা হবে, তবে আঁশের মান খারাপ হবে। আবার কম পাতলা হলে অর্থাৎ ঘন হলে পাট গাছ বেশি চিকন হবে, ফলন কম হবে এবং আঁশ ছাড়ানো কষ্টকর হবে। এ ক্ষেত্রে ভালো ও উন্নতমানের আঁশের জন্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, হেক্টর প্রতি ৪-৫ লাখ পাট গাছ রাখা উচিৎ। তবে ক্ষেতের সর্বত্রই যেন এই পরিমিত পাতলা করণ বজায় থাকে। বীজ বপণের ২০-৬০ দিনের মধ্যে ২/৩ বারে পাতলা করণের কাজ সমাধা করতে হবে। উল্লেখ্য, পাতলা করণের মাধ্যমে সংগৃহীত কচি পাটের পাতা ও ডগা শাক হিসেবে অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। বাজারে পাট শাকের চাহিদাও প্রচুর। উল্লেখ্য, পাট পাতায় প্রচুর পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণ বিদ্যমান। বলা বাহুল্য, শাক ছাড়াও সবজি হিসেবে পাট পাতার ব্যবহার দেশে বহুল প্রচলিত।
প্রচুর খাদ্যগুণ সম্পন্ন খেজুরের প্রতিটি অংশই উপকারী। চাষাবাদে খেজুরের গুরুত্ব তাই অনেক। এক সময় ধারণা ছিল, খেজুর মরু অঞ্চলের ফল। কিন্তু এখন দেশে এর সফল চাষাবাদের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, খেজুর গাছ দীর্ঘ খরা সইতে পারার পাশাপাশি তীব্র ঝড়, তীব্র ঠান্ডা, লবণাক্ততা এমনকি দীর্ঘ বন্যাও অনায়াসে সইতে পারে। অর্থাৎ মরু অঞ্চল ছাড়াও আমাদের দেশেও খেজুর বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ সম্ভব এবং তা অবশ্যই লাভজনক। উল্লেখ্য, বাণিজ্যিকভাবে খেজুরের চাষাবাদ বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তায় একটা বড় অবদান রাখতে পারে। কেননা, খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, ঝড় ও ঠান্ডায় উৎপাদনের পাশাপাশি খেজুর স্বাভাবিক ভাবে ৩/৪ বছর সংরক্ষণ করা যায়।
উল্লেখ্য, খোরমা-খেজুরের বীজ থেকে সহজে চারা হয় না। তবে আশার কথা দেশের বিভিন্ন নার্সারীতে এখন খোরমা-খেজুরের ভালো চারা পাওয়া যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদের জন্য দেশে ২২ ফুট দূরত্বে চারা লাগানো যেতে পারে। সে অনুযায়ী প্রতি একরে ৫০টি খেজুর গাছ লাগানো যেতে পারে। পারিবারিক চাহিদা মেটানোর জন্য বাড়ী-ঘরের আশে-পাশে, ক্ষেতের আইলে, পতিত জায়গায় এমনকি রাস্তার ধারে ২/৪টি খেজুর গাছ লাগানো যেতে পারে। উপযুক্ত পরিচর্যায় চারা লাগানোর ৫-১০ বছরের মধ্যে খেজুর গাছ থেকে ফল পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য, পৃথিবীর প্রথম চাষকৃত ফল খেজুর। প্রায় নয় হাজার বছর পূর্বে খেজুর গাছ রোপণের রেকর্ড প্রাচীন নথিপত্রে রয়েছে।
দেশে অনেকেই সীমিত আকারে হলেও ছাদে চাষাবাদ করছেন। ছাদে চাষাবাদ নানা কারণে প্রশংসিত হচ্ছে। এতে পরিবেশ সুরক্ষা ছাড়াও টাটকা শাক-সবজি, ফলমূল ও ফুলের প্রাপ্তির পাশাপাশি আছে নাগরিক জীবনে সময় কাটানো আর সুস্থ-সবল থাকার নিশ্চয়তা। সাধারণত: ছাদে চাষাবাদে টব এবং হাফ ড্রাম ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, টব বা হাফ ড্রামের আকার যেন গাছের আকার অনুযায়ী হয়। বড় জাতের গাছ ছোট টবে কিংবা ছোট জাতের গাছ বড় টব/ড্রামে না লাগানো উচিৎ। সাধারণত: ছাদে কমলা, কামরাঙ্গা, লেবু, মাল্টা, জলপাই, লিচু, পেয়ারা, বাতাবী লেবু (জাম্বুরা) ইত্যাদি ফলমূল, বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি এবং ফুলের চাষাবাদ করা হয়। উল্লেখ্য, অগোছালো ভাবে নয়, ছাদে পরিকল্পিত ভাবে চাষাবাদ করা লাভজনক। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তি কিংবা কৃষিবিদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এবং জাতীয় সীড বোর্ড (এনএসবি) কর্তৃক ২০০৮ সালে অনুমোদিত ও একটি উন্নতমানের ধান সুগন্ধী বাসমতী বা ব্রি-৫০। এ ধানের জীবনকাল ১৪৫ দিন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধানের চাষাবাদে অভাবনীয় সাফল্যে ইতিমধ্যে কৃষক/কৃষাণীরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধানের চাষাবাদ কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। বাসমতী ধান (ব্রি-৫০) চাষাবাদের জন্য দরকার উঁচু ও মাঝারী উঁচু জমি, যেখানে পানি সেচের সুব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া, এ ধানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- রোগ বালাই কম, পোকা-মাকড়ে তেমন আক্রান্ত হয় না এবং বিশেষ কোন পরিচর্যারও প্রয়োজন হয় না।
এখন অনেকেই টবে শাক সবজি চাষাবাদ করেন। এর অনেক গুলো সুবিধাও আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বিষমুক্ত শাক সবজি উৎপাদন, প্রয়োজনের সময় শাক সবজি সংগ্রহ এবং টাটকা শাক সবজি ভক্ষণ যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী সাধারণত: টবে চাষাবাদের উপযোগি শাক-সবজি হলো- টমেটো, বেগুন, মরিচ, ধনে পাতা, পুদিনা, থানকুনি, পুঁইশাক, মটরশুটি, নাগাঢুলা প্রভৃতি। টবে শাক-সবজি উৎপাদনের তিন ভাগের দুই ভাগ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটির সংগে এক ভাগ পাতা সার মিশ্রণ থাকলে ভালো হয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে টবের মাটি যেন ঝরঝরে ও হালকা হওয়ার সাথে সাথে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া ছোট ছিদ্রযুক্ত ঝাঁঝরি দিয়ে শাক-সবজি রোপিত টবে পানি দিতে হবে এবং সযতেœ হাত দিয়ে আগাছা পরিস্কার করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদনে পরাগায়নের ক্ষেত্রে সাহায্য করে মৌমাছি। একই সাথে বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্যান্য কারণের মধ্যে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের অন্যতম একটি কারণ হলো মৌমাছির সংখ্যা হ্রাস। চাষাবাদে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার মৌমাছি হ্রাসের জন্য অনেকাংশে দায়ী বলে অনেকে মনে করেন। এর সাথে আছে পরজীবির আক্রমণ। উল্লেখ্য, জাতি সংঘ মৌমাছির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন তথা চাষাবাদে সাফল্য লাভের জন্য মৌমাছির বসবাস ও প্রজনন উপযোগি আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে কৃষি সংশ্লিষ্ট সবার সজাগ হওয়া উচিৎ।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক এবং আইপিএম ল্যাবের প্রধান গবেষক ড. মো: বাহাদুর মিঞা উদ্ভাবন করেছেন ‘বাউ বেগুন-১’। চাষাবাদে এ বেগুনের বৈশিষ্ট্য হুলো- গাছ মধ্যম আকৃতির, প্রতিটি ফলের ওজন ২৫০-৩৫০ গ্রাম, ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা এবং ফল পচা প্রতিরোধী। সব ধরণের মাটিতেই বাউ বেগুন-১ চাষ সম্ভব হলেও বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগি। মধ্য সেপ্টেম্বর-মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত বীজতলায় বীজ বপন এবং মধ্য অক্টোবর-মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত মূল জমিতে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য সারি থেকে সারি এবং চারা থেকে চারা রোপণের দূরত্ব হবে ৭৫ সে:মি:। উপযুক্ত পরিচর্যায় হেক্টর প্রতি এ বেগুন ৪০ টন পর্যন্ত হতে পারে। ০৬ আগষ্ট ২০১১
লেখক: সম্পাদক – আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী অনিয়মিত প্রকাশনা)।




