বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৬ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আব্দুর রশীদ লুলু

চাষাবাদ বিষয়ক টুকিটাকি – ৪০



 জনপ্রিয় সবজি গোল আলু চাষাবাদে পরিচর্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে ফসলের উৎপাদন। পরিচর্যার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন লাগানোর ৩০-৩৫ দিন পর গোড়ায় অবশ্যই মাটি দেয়া হয়। সারির দু’পাশ থেকে মাটি তুলতে হবে। আলুর গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেয়ার পর কচুরিপানা দিয়ে মাটি ঢেকে দেয়া ভালো। কচুরিপানার অভাবে খড়-কুটো বা পাতা-লতা দ্বারা ঢেকে দেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া খুব খেয়াল রাখতে হবে অন্তত: দুই মাস যেন আলুর চাষাবাদের জমি আগাছামুক্ত থাকে।

 ৫.৫-৬.৫ অম্লমানের মাটিতে সবচেয়ে ভালো জন্মানো ফুলকপির আগাম চাষাবাদের জন্য আগস্ট মাসে, মধ্যম চাষাবাদের জন্য সেপ্টেম্বর মাসে এবং নাবী চাষাবাদের জন্য অক্টোবর মাসে বীজ বপণের উপযুক্ত সময়। ফুলকপির আগাম চাষাবাদের কয়েকটি জাত হলো: আর্লি জায়েন্ট, অগ্রহায়ণী, পুশা দিপালী, কার্তিকা, আর্লি স্নোবল ও আর্লি পাটনা। মধ্যম চাষাবাদের জাত হলো: পৌষালী, গ্লোবল এক্স, স্নোবল ওয়াই, হোয়াইট টপ ও রাক্ষুসী। নারী চাষাবাদের জাত হলো: হোয়াইট মাউন্টেন, ইউনিট স্নোবল, বেনারশী ও মাঘী। উল্লেখ্য, ফুলকপি চাষাবাদে প্রতি হেক্টর জমিতে সাধারণত ৩০০-৩৫০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।

 প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ও পুষ্টিকর সবজি বাঁধাকপির বিভিন্ন ধরনের আগাম, মধ্যম ও নাবী জাত ছাড়াও সারা দেশে চাষাবাদ উপযোগী তিনটি ভালো জাত হলো: ইপসা বাঁধাকপি-১, বারি বাঁধাকপি-১ (প্রভাতী) এবং বারি বাঁধাকপি-২ (অগ্রদূত)। বাঁধাকপি মূলত: শীতল ও আদ্র জলবায়ুর উপযোগী ফসল। এছাড়া দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটি বাঁধাকপি চাষাবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সাধারণত: ভাদ্র-কার্তিক মাস বাঁধাকপির বীজ বপণের উপযুক্ত সময়। উল্লেখ্য, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বাঁধাকপি অত্যন্ত উপকারী সবজি।

 যকৃতের জন্য উপকারী বেগুন এখন সারা বছর চাষাবাদ সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, শীত মৌসুমে বেগুনের ফলন ভালো হয়। চাষাবাদের উপযোগী বেগুনের অনেকগুলো জাত রয়েছে। যেমন- কাজলা, নয়নতারা, ইসলামপুরী, নয়নকাজল, মুক্তকেশী, উত্তরা, শিংনাথ ইত্যাদি। হাইব্রিড জাতের মধ্যে রয়েছে- সুরভী, চমক, মোহনী, লাকি, লাবণী, শ্রাবণী, বিজয়, খুশি, হাসি, আনন্দ, উৎসব, কাজল, বনানী ইত্যাদি। উল্লেখ্য, সাদা বেগুন ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী সবজি।

 শীতকালের পাশাপাশি এখন দেশে জনপ্রিয় সবজি শিম গ্রীষ্মকালেও চাষাবাদ হচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন শিম চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষক/কৃষাণী লাভমান হচ্ছেন, এমন খবরও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আসছে। এ ক্ষেত্রে আগাম চাষাবাদের জন্য সাধারণত: রূপবান এবং নাবী চাষাবাদের জন্য ঘৃতকাঞ্চন জাত লাগানো হয়। আগাম চাষাবাদের জন্য ১-৩০ জুনের মধ্যে এবং নাবী চাষাবাদের জন্য ১-২০ জুলাইয়ের মধ্যে বীজ রোপণ করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্রীষ্মকালীন শিম চাষাবাদের মাধ্যমে আগাম সবজি পাওয়ার পাশাপাশি পতিত জমির সদ্ব্যবহার হয়। এ ছাড়া, জমিতে সেচের পানির কম প্রয়োজন হয়, শ্রমিক কম লাগে, জনশক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার হয়। সব মিলিয়ে অল্প খরচে অধিক লাভ হয়।

 ফুলকপির চাষাবাদে সময় মতো ফসল সংগ্রহ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যথায় বিশেষ করে দেরীতে ফসল তুললে ফুলকপির রং এবং স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। মঞ্জুরী বা কান্ড নরম হয়ে পড়ে এবং উপরের দিকে লোমশ হয়। ফলে বাজারে চাহিদা ও দাম কমে যায়। যা চাষাবাদ সংশ্লিষ্টদের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত: জাত ভেদে চারা লাগানোর ৬০-৯০ দিনের মধ্যে ফুলকপি সংগ্রহ/উত্তোলনের উপযোগী হয়। এ ছাড়াও ফসল সংগ্রহের আগে লক্ষ্য রাখতে হবে, ফুল সাদা ও শক্ত হয়েছে কি না। কেননা ফুল যখন পরিপূর্ণতা লাভ করে তখন তা সাদা ও শক্ত হয়।

 কলা চাষাবাদে বিশেষত: বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদে সার ব্যবস্থাপনা একটি জরুরী বিষয়। অনেকে এ বিষয়ে গুরুত্ব না দেয়ায় আশানুরূপ ফলন পান না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কলা চাষাবাদে জমি তৈরির শেষ পর্যায়ে বিঘা প্রতি ৩.৫-৪.০ টন পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার প্রয়োগ করা উচিৎ। এ ছাড়া প্রতিটি মাদায় (গর্তে) ৬ কেজি গোবর, ৫০০ গ্রাম খৈল, ১২৫ গ্রাম ইউরিয়া, ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমপি, ১০০ গ্রাম জিপসাম, ১০ গ্রাম জিংক এবং ৫ গ্রাম বরিক এসিড প্রয়োগ করে মাদা (গর্ত) মাটি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এ ছাড়াও পরবর্তী সময়ে ২ কিস্তিতে গাছ প্রতি ১২৫ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম এমপি তিন মাস অন্তর অন্তর প্রয়োগ করে কলার চাষাবাদে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশের শীতকালীন আবহাওয়া পুষ্টিকর ও সুস্বাদু সবজি (এবং ফল) টমেটো চাষাবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সব ধরণের মাটিতে টমেটো চাষাবাদ সম্ভব হলেও দোআঁশ এবং বেলে দোআঁশ মাটিতে ফলন ভালো হয়। এ ছাড়া সাধারণত ২০-২৫ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় টমেটো সবচেয়ে ভালো জন্মে। উল্লেখ্য, তাপমাত্রার প্রভাবের ওপর টমেটোর ফলন অনেকটা নির্ভর করে। আগাম চাষাবাদের জন্য আগস্ট মাসেই টমেটোর বীজ বপণ করতে হয়। নাবী ফসলের জন্য নভেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত বীজ বপণ করা যেতে পারে।

লেখক: সম্পাদক – আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা)।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন