বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

চোরের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, লাইব্রেরি, বাসা, দোকান। সিসি ক্যামেরাতেও আটকাচ্ছে না চোরচক্র।

ওসমানীনগরের খন্দকারবাজার এলাকায় দিনদিন বাড়ছে চুরি



সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের বৃহত্তর খন্দকার বাজার এলাকায় সাম্প্রতিক রহস্যজনকভাবে বেড়েই চলছে চুরির ঘটনা। একে একে চুরি হয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, বাসা এবং অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। লাখ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিচ্ছে চোরচক্র। প্রশাসনের দারস্থ হয়েও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। উপর্যুপুরী এসব চুরির ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এলাকাবাসী ধারণা করছেন, স্থানীয়ভাবে বড় রকমের কোন অপরাধী চক্র গড়ে উঠছে। যাদের ধারাবাহিক অতৎপরতায় নিয়মিত এসব চুরির ঘটনা ঘটছে। সিসি ক্যামেরাতেও তাদের আটকে রাখা যাচ্ছে না।

সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা নাগাদ স্থানীয় চুনারপাড়া দক্ষিণ মসজিদের ইমামের কক্ষে চুরি সংঘটিত হয়। এতে ২টি মোবাইলসহ অন্যান্য জিনিসপত্র চুরি হয়েছে। এ ব্যাপারে ওসমানীনগর থানায় একটি সাধারণ ডাইরি করা হয়েছে। এর আগে গত আগস্ট মাসের ১০তারিখ বৃহত্তর খন্দকারবাজার এলাকার হুসননমকী মোহাম্মদিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। ঘটনার ওইদিন মাদ্রাসা বন্ধের কারণে শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত ছিলেন। চোরচক্র মাদ্রাসার ষ্টিল আলমিরা ভেঙ্গে নগদ ৩৬হাজার টাকা, ১টি রোলেক্স ঘড়ি, স্পিকার, ইন্টারনেট রাউটার ডিআরসহ প্রায় ১লাখ ২০হাজার টাকার মালামাল নিয়ে যায়। চোরদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি মাদ্রাসার ফ্রিজে থাকা মাদ্রাসা বডিংয়ের এতিম শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা আনুমানিক ৫০/৬০ কেজি গোশত। একই রাত্রে হুসননমকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় বারের মতো চুরির উদ্যোগ নেয় চোরচক্র। তারা বিদ্যালয়ের একটি কক্ষের তালা ভেঙ্গে ফেলে। ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণ কাজের শ্রমিকদের সাড়াশব্দে চোরচক্র চুরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য এর আগে গত ২৮মে হুসননমকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথমবার চুরির ঘটনা ঘটেছিল। চোরেরা সেদিন বিদ্যালয়ের ওয়াশবøকের তালা ভেঙ্গে পানির টেপসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়।

এরও আগে গত এপ্রিল মাসের ৮তারিখ হুসননমকী জামে মসজিদে চুরির ঘটনা ঘটে। চোরচক্র মসজিদের মাইকের মেশিন, ৫বান্ডিল ইলেট্রিক ক্যাবলসহ প্রায় লক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে যায়। ঘটনার কয়েকদিন পর এলাকার যুবসমাজ সন্দেহবশত স্থানীয় এক যুবককে আটক করেন। জিজ্ঞাসাবাদে সে মসজিদে চুরির সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি প্রদান করে। পরবর্তীতে তাকে ওসমানীনগর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

এদিকে গত আগস্ট মাসের প্রথম দিকে খন্দকার বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ও খন্দকারবাজারের হোমিও চিকিৎসক ডা. সুকুমার সরকারের স্বপরিবারে থাকা খন্দকারবাজারস্থ ভাড়াবাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। ২আগস্ট থেকে ৮আগস্ট পর্যন্ত সময়ে তিনি তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় ছিলেন। চোরচক্র তালা ভেঙ্গে বাসায় প্রবেশ করে এবং ৪ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ ৭০ হাজার টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। এঘটনায় শিক্ষক ডা. সুকুমার সরকার ওসমানীনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

এছাড়া হুসননমকী মোহাম্মদিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় চুরির বিষয়েও ওসমানীনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এছাড়াও গত বছর খন্দকারবাজারস্থ জননী লাইব্রেরিতে চুরির ঘটনা ঘটে। ওই রাতে চোরচক্র আনুমানিক ৬০/৭০হাজার টাকার মালামাল নিয়ে যায়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৮মে রাতে খন্দকারবাজারস্থ আবরার মেডিসিন সেণ্টারে চুরির ঘটনা ঘটে, চোরচক্র নগদ ৩লাখ টাকা নিয়ে যায়। এর আগে খন্দকার বাজার সেবা হেলথ সেণ্টারে চুরির ঘটনায় নগদসহ কয়েক লাখ টাকার ঔষধ চুরি হয়। গত জুনে ঈদুল আযহার আগের রাতে খন্দকার বাজারের আরও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নগদ কয়েক লাখ টাকা চুরি হয়।

এদিকে প্রায় নিয়মিত চুরির ঘটনা ঘটলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না ওসমানীনগর থানা পুলিশ। জানা গেছে, হুসননমকী মোহাম্মদিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় চুরির ঘটনার পরম মাদ্রাসার পক্ষ থেকে ওসমানীনগর থানায় লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে। পুলিশ একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও কাউকে গ্রেফতার করেনি। এ বিষয়ে আলাপকালে মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা রশীদ আহমদ বলেন, মাদ্রাসা বন্ধ থাকায় বডিংয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ আমরা বাড়িতে চলে যাই আর এই সুযোগে মাদ্রাসায় চুরির ঘটনা ঘটেছে। চোরচক্র আমাদের মাদ্রাসার সিসি ক্যামেরার সরঞ্জাম (ডিভিআর) সহ যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় চোরচক্র কুকুর সাথে নিয়ে আসার বিষয়ে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। মাদ্রাসার মতো পবিত্র স্থানে যেসব কক্ষে শত শত পবিত্র কুরআন রয়েছে, সেইসব কক্ষে কুকুর প্রবেশ করিয়ে চোরচক্র গর্হিত কাজ করেছে। আমরা এসব অপরাধীদের গ্রেফতার এবং শাস্তি চাই।

খন্দকারবাজারে নিজের ভাড়াটিয়া বাসায় চুরির বিষয়ে আলাপকালে খন্দকার বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়ির শিক্ষক ও হোমিও চিকিৎসক ডা. সুকুমার সরকার বলেন, আমি হতবাক। হুসননমকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ঝর্ণা চৌধুরী আলাপকালে তার বিদ্যালয়ে চুরি বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি উধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

হুসননমকী জামে মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিদ্যালয়ে চুরির বিষয়ে আলাপকালে গ্রামের প্রবীণ মুরুব্বি আশিকুর রহমানসহ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আবরার মেডিসিন সেণ্টারের প্রোপ্রাইটর আব্দুল জলিল বলেন, লাখ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে কোন বিচার পাইনি। বরং আমরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে টাকা রাখি কেন বা আরও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করিনা কেন, এসব নানা প্রশ্নবানে বিদ্ধ হতে হয়। এলাকাবাসী, বাজার পরিচালনা কমিটি এবং প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় দিন দিন চুরির ঘটনা বাড়ছে। চোররা ইতোমধ্যে বেপরোয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে এই মূহুর্তে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের জান-মাল মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়বে।

এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে ওসমানীনগর থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মো. মোনায়েম মিয়া বলেন, এলাকায় পুলিশী টহল অব্যাহত রয়েছে। অপরাধের সাথে জড়িতদের ধরতে আমরা সব সময় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!