বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দীর্ঘ নয় বছরের অপেক্ষার অবসান : বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সিরিজ জয়



সিরিজ জয়ী বাংলাদেশ দল। ছবি : ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট

শেষ ওয়ানডেতে সেন্ট কিটসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৮ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। তিন ম্যাচের সিরিজ জিতে নিয়েছে ২-১ ব্যবধানে।

যাতে ঘটলো দীর্ঘ নয় বছরের অপেক্ষার অবসান। কারণ ৯ বছর পর দেশের বাইরে দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ জেতা হলো বাংলাদেশের। সবশেষ জিতেছিল ২০০৯ সালের অগাস্টে জিম্বাবুয়েতে। তার আগে সেবছরই জুলাইয়ে সিরিজ জয় এসেছিল ক্যারিবিয়ানে। সব মিলিয়ে এটি দেশের বাইরে বাংলাদেশের পঞ্চম সিরিজ জয়।

সেন্ট কিটসে শেষ ওয়ানডেতে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তাজা। শুরু থেকে উইন্ডিজ বোলাররা আটকে রাখেন আগের ম্যাচে বিস্ফোরক ব্যাটিং করা এনামুল হক বিজয়কে। তামিম ইকবালের রানের চাকা ছিল সচল। খোলস থেকে বের হতে পারেননি এনামুল।

জেসন হোল্ডারের শর্ট বলে হুক করতে চাইলেও ব্যাটে-বলে সংযোগ ঠিকমতো হয়নি। মিডঅনে সহজ ক্যাচ নেন কিরন পাওয়েল। ৩৫ রানের মাথায় ৩১ বলে ১০ রান করে বিদায় নেন এনামুল।

তামিমকে নিয়ে হাল ধরেন সাকিব। শুরু থেকেই করেন আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং। বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য এ জুটি এগিয়ে নিয়ে যায় দলের রান। দুজন মিলে গড়েন ৭১ রানের জুটি। সাকিব বড় স্কোরের আভাস দিয়েও ফিরে যান ৩ চারে ৪৪ বলে ৩৭ রান করে। অ্যাশলে নার্সের বলে ছক্কা হাঁকাতে চেয়ে সুইপ করে ধরা পড়েন কিমো পলের হাতে।

এরপর রানের গতি বাড়ান তামিম ও মুশফিকুর রহিম। নার্সের বলে মুশফিকের ছক্কা হাঁকানোর পরের ওভারে কটরেলের বলে ছক্কা হাঁকান তামিম। ৩১ তম ওভারে কিমো পলের বলে দুই চার মারেন তামিম। ১০০ থেকে ১৫২ রানে পৌঁছাতে মাত্র ৫২ বল লাগে বাংলাদেশের।

মুশফিক বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জাগালেও তার অপমৃত্যু ঘটে। ১২ রান করে অ্যাশলে নার্সের লেগ স্টাম্পের লাইনের বল খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান মুশফিক।

এরপর তামিমকে নিয়ে ৪৮ রানের জুটি গড়েন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। নার্ভাস নাইন্টিতে প্রবেশের পর দ্বিতীয় ছক্কা হাঁকান তামিম। পরের ওভারে ক্যারিয়ারের একাদশতম শতক তুলে নেন তামিম ইকবাল। শতকের পর আর ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। বিশুর বলে সুইপ করে ধরা পড়েন কিরন পাওয়েলের হাতে। দলীয় ২০০ রানের মাথায় ১০৩ রান করে ফিরেন তামিম। শতকটি তিনি সাজান ৭ চার ও ২ ছক্কায়।

তামিমের শতক বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহ গড়তে সাহায্য করেছে। ছবি: এএফপি

অনেকটা চমকে দিয়েই ছয় নম্বরে ব্যাট হাতে নেমে যান মাশরাফি বিন মুর্তাজা। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে ৫৩ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে নিয়ে যান মাশরাফি। মাশরাফির লক্ষ্য ছিল দ্রুত রান তোলা।

হোল্ডারের করা ৪২ তম ওভারে মারেন টানা তিন চার। হোল্ডারের পরের ওভারে ছক্কা হাঁকান মাশরাফি। অপর প্রান্তে থাকা মাহমুদউল্লাহও দারুণ ব্যাটিং করেন। ফিরে যান হোল্ডারের বলেই। থার্ড ম্যানের মাথার উপর দিয়ে মারার চেষ্টা করতে গিয়ে গেইলের হাতে ধরা পড়েন মাশরাফি। ৪ চার ও ১ ছক্কায় ২৫ বলে ৩৬ রান করে বিদায় নেন অধিনায়ক।

শেষে ঝড় তুলেন মাহমুদউল্লাহ। তাকে সঙ্গ দেন সাব্বির রহমান ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। ৪৮ তম ওভারে পলের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে অর্ধশতক পূর্ণ করেন মাহমুদউল্লাহ । ৪৯ তম ওভারে দুই বলে দুই চার মেরে পরের বলে আউট হয়ে যান সাব্বির রহমান (৯ বলে ১২)।

সাব্বিরের বিদায়ের পরের দুই বলে দশ রান নেন রিয়াদ। ঐ ওভারে রান হয় ১৯। শেষ ওভারে মোসাদ্দেককে সাথে নিয়ে আরো ১২ রান যোগ করলে ৩০১ রানের বড় সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ।

দুই উইন্ডিজ ওপেনার ক্রিস গেইল ও এভিন লুইসকে প্রথমদকে আটকে রেখেছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তাজা ও মেহেদি হাসান মিরাজ। দারুণ লাইন ও লেন্থ বজায় রেখে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করছিলেন দুজন। গেইল খোলস থেকে বেরিয়ে এসে আগ্রাসী রূপ ধারণ করলেও মন্থর ব্যাটিং করেন লুইস। ষষ্ঠ ওভারে মিরাজের বলে এক চার ও এক বিশাল ছক্কা হাঁকান গেইল।

বিধ্বংসী ব্যাটিং করতে থাকেন গেইল। প্রতি ওভারেই বলকে পাঠাচ্ছিলেন সীমানার বাইরে। বাংলাদেশকে প্রথম সাফল্য এনে দেন অধিনায়ক মাশরাফি। প্রথম দুই ওয়ানডের মতো এ ম্যাচেও মাশরাফির গুড লেন্থের বলে পরাস্ত হন লুইস। ব্যাটের কানায় লেগে বল জমা পড়ে মুশফিকের গ্লাভসে।

এরপর তিন নম্বরে নামা সাই হোপকেও আটকে রাখে বাংলাদেশ। তবে অপর প্রান্তে গেইলের ঝড় অব্যহত থাকে। ১৫ তম ওভারেই অর্ধশতকে পৌঁছে যান গেইল। অর্ধশতকের পর হয়ে উঠেন আরো ভয়ঙ্কর। মাহমুদউল্লাহর এক ওভারে মারেন দুই ছয়।

গেইলকে থামান রুবেল হোসেন। রুবেলের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে লং অনে মিরাজের হাতে ধরা পড়েন গেইল। ৬ চার ও ৫ ছক্কায় ৬৬ বলে ৭৩ রান করে ফিরেন তিনি।

তৃতীয় উইকেটের জুটিতে শিমরন হেটমেয়ার ও হোপ যোগ করেন ৬৭ রান। তবে রানের গতি ছিল বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রণে। আগের ম্যাচে শতক হাঁকানো হেটমেয়ারকে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠার আগেই বোল্ড করেন মিরাজ। ১৭২ রানের মাথায় আউট হন হেটমেয়ার (৩০)। এক ওভার পরেই রান আউট হয়ে ফিরেন কিরন পাওয়েল (৪)। দ্রুত দুই উইকেট নিয়ে ম্যাচে সুবিধাজনক স্থানে চলে যায় বাংলাদেশ।

হোপ ও রোভম্যান পাওয়েল মিলে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। গড়েন ৪৫ রানের জুটি। ৯৪ বলে ৬৪ রান করে মাশরাফির বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে বিদায় নেন হোপ। তবে একাই লড়াই চালান পাওয়েল। ৪৫ তম ওভারে মুস্তাফিজের বলে দুই ছক্কা হাঁকিয়ে উইন্ডিজদের আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন।

শেষ পাঁচ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৫৭ রান। মাশরাফি দারুণ বোলিং করে রান দেন মাত্র ৬। পরের ওভারে সাকিবের বলে বাউন্ডারি হাঁকান পাওয়েল, রান হয় ১১। পরের ওভারে মুস্তাফিজ ফিরিয়ে দেন হোল্ডারকে। হোল্ডারকে সাজঘরে ফেরালে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল হয়।

শেষ ১২ বলে ৩৪ রান দরকার হলেও ৪৯ তম ওভারে রুবেল দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৬ রান দিলে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় উইন্ডিজরা। শেষ ওভারে ৯ রান করলে ১৮ রানের জয় পায় টাইগাররা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ৩০১/৬ (তামিম ১০৩, এনামুল ১০, সাকিব ৩৭, মুশফিক ১২, মাহমুদউল্লাহ ৬৭*, মাশরাফি ৩৬, সাব্বির ১২, মোসাদ্দেক ১১*; কটরেল ১/৫৯, হোল্ডার ২/৫৫, বিশু ১/৪২, পল ০/৭৭, নার্স ২/৫৩, গেইল ০/১৪)।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৫০ ওভারে ২৮৩/৬ (গেইল ৭৩, লুইস ১৩, হোপ ৬৪, হেটমায়ার ৩০, কাইরান পাওয়েল ৪, রোভম্যান পাওয়েল ৭৪*, হোল্ডার ৯, নার্স ৫*; মাশরাফি ২/৬৩, মিরাজ ১/৪৫, মুস্তাফিজ ১/৬৩, মোসাদ্দেক ০/১০, মাহমুদউল্লাহ ০/২০, রুবেল ১/৩৪, সাকিব ০/৪৫)।

ফল: বাংলাদেশ ১৮ রানে জয়ী

সিরিজ: ৩ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: তামিম ইকবাল

ম্যান অব দা সিরিজ: তামিম ইকবাল

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!