মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কবি ও কবিতা : শফিকুল ইসলাম



কবি শফিকুল ইসলাম

উদভ্রান্ত যুগের শুদ্ধতম কবি শফিকুল ইসলাম। তারুণ্য ও দ্রোহের প্রতীক । তাঁর কাব্যচর্চার বিষয়বস্তু প্রেম ও দ্রোহ। কবিতা রচনার পাশাপাশি তিনি অনেক গান ও রচনা করেছেন। তার দেশাত্ববোধক ও সমাজ-সচেতন গানে বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার।

শফিকুল ইসলামের জন্ম ১০ই ফেব্রুয়ারী, সিলেট জেলা শহরের শেখঘাটস্থ খুলিয়াপাড়ায়। একাত্তরের মু্ক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পূর্বে সিলেট শহরের বাগবাড়ী এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর পিতার নাম মনতাজ আলী। তিনি পেশায় একজন কাষ্টমস অফিসার ছিলেন। তাঁর মাতার নাম শামসুন নাহার। তিনি একজন গৃহিণী ছিলেন।

শফিকুল ইসলাম সিলেট জেলার এইডেড হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও মদন মোহন মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও সমাজকল্যাণে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এছাড়া এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে এম,এ ইন ইসলামিক ষ্টাডিজ ডিগ্রী অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শিক্ষাজীবনে অনন্য কৃতিত্বের জন্য স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন।

কর্মজীবনে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা কবি শফিকুল ইসলাম চাকরীসূত্রে বিসিএস(প্রশাসন) ক্যাডারের একজন সদস্য। তার কর্মজীবনের শুরু কুষ্টিয়া ডিসি অফিসে সহকারী কমিশনার হিসেবে।তিনি ঢাকার প্রাক্তন মেট্রোপলিটান ম্যাজিষ্ট্রেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাবেক এডিসি। এছাড়া ও তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরে উপপরিচালক ছিলেন। তিনি স্বরাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব, অর্থমন্ত্রণালয়ের ইআরডিতে, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে কর্মরত।

লেখালেখির শুরু ছাত্রজীবনে স্কুল ম্যাগাজিনে লেখালেখির প্রচেষ্টা থেকে। সেটি ছিল ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ। তখন কবি ক্লাস সেভেনে পড়েন। কাব্যচর্চা দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৮০সালে সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদের উন্মুক্ত চত্বরে কবিতা পাঠের মাধ্যমে প্রথম জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ। মদন মোহন কলেজে পড়াকালিন তাঁর সম্পাদনায় ‘স্পন্দন’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের হয়। আর সেই ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা বের হয়।সেটি ছিল একটি কবিতা। এরপর কলেজ ম্যাগাজিনে তার লেখা কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। চাকরীসূত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মকালীন সময়ে তার কবিতা ও গান বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তীতে স্থানীয়, জাতীয় ও অনলাইন পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়।

ছা্ত্রজীবনে ১৯৮১সালে তৎকালীন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে দেশব্যাপী আয়োজিত সাহিত্য প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত হন। এছাড়া আন্তর্জাতিক লেখক দিবস উদযাপন পরিষদ কর্তৃক লেখক সম্মাননা পদক ২০০৮প্রাপ্ত হন। সম্প্রতি তাঁর জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ এই অনন্য কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি নজরুল স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য বিভিন্ন পদকে ভূষিত হন।

তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থসমূহঃ এই ঘর এই লোকালয়(২০০০) প্রকাশিত হয় প্রবর্তন প্রকাশন থেকে । একটি আকাশ ও অনেক বৃষ্টি(২০০৪) প্রকাশিত হয় আমীর প্রকাশন থেকে। তবু ও বৃষ্টি আসুক(২০০৭) ও শ্রাবণ দিনের কাব্য (২০১০) প্রকাশিত হয় আগামী প্রকাশনী থেকে । দহন কালের কাব্য(২০১১) ও প্রত্যয়ী যাত্রা(২০১২) প্রকাশিত হয় মিজান পাবলিশার্স থেকে।

গীতি সংকলনঃ মেঘ ভাঙ্গা রোদ্দুর(২০০৮) প্রকাশিত হয় আগামী প্রকাশনী থেকে। এছাড়া রয়েছে আড়াই হাজারের অধিক গান নিয়ে ‘শফিকুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতা’ নামের পাঁচ খণ্ড বিশিষ্ট গ্রন্থ।

কবি শফিকুল ইসলামের কয়েকটি কবিতা –

প্রভু হে যে তোমারে ভালবেসেছে

প্রভু হে যে তোমারে ভালবেসেছে
তুমি তার চোখে আনলে জল,
তোমার প্রেমের পথে পথে ছড়ানো
শুধু দুঃখ কেবল।

দুখের গরল মন্থন শেষে
অমৃত পিয়াস মিটবে কি শেষে,
প্রেমের পথের এ কঠিন সাধনা
মিলনে কি হবে সফল।

জীবন শেষেও যদি থাকে বিরহ যাতনা
সারা জীবনের এ প্রেম হবে কি বৃথা,
তবু পাওয়া না পাওয়ার হিসেব না কষে
তোমার প্রেমে রয়েছি অবিচল।

বাবা নেই আজ 

বাবা নেই আজ,
বাবার স্মৃতিগুলো আজও রয়ে গেছে
বাবা বলত, থেমে যাসনে খোকা,
তোকে অনেক দূর যেতে হবে, অনেক বড় হতে হবে।

একদিন বাবা আমাকে হাত ধরে
হাটতে শেখাতো জীবনের পথে
আজ জীবন পথে একাই হাটছি আমি, বাবা আজ নেই সাথে,
বাবা আজ তোমাকে খুব মনে পড়ে,
অনুভবে খুজে ফিরি তোমাকে।

বাবা বলত, সুখে থাকা বড় কথা নয়”
বড় হল সৎ ভাবে বেঁচে থাকা
জয় পরাজয় বড় কথা নয়,
বড় কথা মিথ্যের সাথে আপোষ না করা।”
বাবা আমি খুব ভাল থাকার বিনিময়েও
এতটুকু ছাড় দিইনি মন্দকে।

একদিন স্বপ্ন হারিয়ে যায়

একদিন স্বপ্ন হারিয়ে যায়
থাকে শুধু স্বপ্ন-ভাঙার বেদনা।
এক সময় যে পাখী
শাখায় বসে গান গেয়েছিল,
সেও উড়ে যায় নিলীমায়-
পেছনে পড়ে থাকে
তার ঝরা পালক।

একদিন প্রাণের অতি নিকটজন
সেও দুরে চলে যায়-
পেছনে পড়ে থাকে স্মৃতি, শুধু স্মৃতি।
তেমনি করে একদিন তুমিও চলে গেছ
পেছনে পড়ে আছি আমি, শুধু আমি ॥

যদি স্বপন হারিয়ে যায় নয়ন থেকে

যদি স্বপন হারিয়ে যায় নয়ন থেকে
সব কামনা ঝরে যায় মন থেকে, প্রাণাধিক
আমার জীবনে সেদিন ও তুমি প্রাসঙ্গিক।।

যদি জোয়ারের জল আসে তেড়ে
ঝড়ো বাতাসে পাল যায় ছিড়ে,
তবুও আমি ছুটে যাব তোমার কাছে
যতই আধার আসুক ঘিরে চতুর্দিক।।

এপথ ওপথ ঘুরে অবশেষে
আমি ফিরব বারবার তোমার পথে,
স্বপ্ন দেখব তোমার চলার সাথী হতে-
তোমার-ই পথে আমি নিরন্তর পথিক।।

আর কেউ কাদুক না কাদুক হয়ত আমি না কাদলে

আর কেউ কাদুক না কাদুক হয়ত আমি না কাদলে
এই পৃথিবীটা হতনা সুন্দর,
তাই কান্নাই লেখা ভাগ্যে আমার জীবনভর।

রোদের ঝিলিক লাগা ঘাসের শিশির জুড়ায় মন
কে ভাবে গত রাত্রির এ যে গোপন কান্নার প্রস্রবণ,
কত অশ্রুজলে ভেসে গেছে এ হৃদয়
কে রাখে তার খবর।

বছর ঘুরে বর্ষা আসে আবার চলে যায়
বছর জুড়ে থাকে বর্ষা হৃদয়ে আমার,
অনন্ত বর্ষা ধারায় বর্ষ জুড়ে
সিক্ত থাকে আমার অন্তর।

মায়ের কথা মনে হলেই

মায়ের কথা মনে হলেই,
আমার ছায়াশীতল শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত
একটি ছায়াবৃক্ষের কথা মনে পড়ে।
মায়ের কথা মনে হলেই,
আমার মায়াবী জোছনার কথা মনে পড়ে
যার আছে আঁধার-নিবারক হিমেল আলো
অথচ উত্তাপ নেই।

মায়ের কথা মনে হলেই,
চৈত্রের গরম-লাগা ভরদুপুরে
একটি শান্ত শীতল সরোবরের কথা মনে পড়ে-
যার জলে ঝাঁপ দিলে মুহূর্তে জুড়িয়ে যায় দেহ-মনের উত্তাপ।

আর মনে পড়ে সেই দুটি চোখ,
অফুরন্ত স্নেহ-ঝরা সেই দৃষ্টি-
যা সর্বক্ষণ ছায়ার মতো আমার যাত্রাপথে নিবদ্ধ থাকত।
সেই শুভ দৃষ্টির অমৃত পরশ
সর্ব বিপদ-আপদ থেকে আমাকে আগলে রাখত।

মায়ের কথা মনে হলেই,
চলার পথে অদৃশ্য বনফুলের
হাওয়ায় মেশা অমৃতময় সৌরভের কথা মনে পড়ে –
যা নিমিষে অস্তিত্বের পরতে পরতে মোহময় আমেজ ছড়িয়ে
সারাক্ষণ এ মনটাকে মাতিয়ে রাখে সুমধুর সৌগন্ধে।
আমার চলার পথে
নিরন্তর আমায় ক্লান্তিহীন প্রেরণা যোগায়।
আর আমি একটু একটু করে এগিয়ে চলি
আরো এগিয়ে চলি,
এক সময় গন্তব্যে পৌঁছে যাই ॥

তোমার বিরহে কবেই আমি

তোমার বিরহে কবেই আমি
হৃদয়ে গড়েছি ব্যথার তাজমহল,
তোমার হৃদয় আমার প্রেমের সমাধিস্থল।

তুমি তো জান না প্রিয়তমা
এই হৃদয়ে কত ব্যথা আছে জমা,
আমার গোপন কান্নায় কত রাত্রি হয়েছে উতল ।

মানুষ ভালবাসে সুখী হতে
আমি বেসেছি দুঃখ পেতে,
দুঃখ ভরা জীবনে আমার সান্ত্বনা শুধু আখীজল ।

কেউ তো জানেনা আমি যে জ্বলে জ্বলে

জানি আমি, কেউ তো জানেনা আমি যে জ্বলে জ্বলে
ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ হয়ে যা্চ্ছি তিলে তিলে।।

সবার হাসিতে আমি হেসেছি
সবার সাথে আমি গেয়েছি,
আসর শেষে চলে গেলে সবাই
কেদেছি একাকী অন্তরালে।।

আমার হাসিতে মুগ্ধ সবাই
হাসির আড়ালে কান্না কেউ দেখে নাই,
কেউ বুঝেনি, কত যে বেদনা লুকানো
এই বুকের তলে।।

তুমি নেই একথা আমি বিশ্বাস করি না

তুমি নেই একথা আমি বিশ্বাস করি না
তোমার কফিনে আমি ফুল দিতে পারবনা
তুমি নেই একথা মেনে নিতে পারব না।

যতদিন বেচেছিলে কারো হয়নি সময়
মরণে তারা পেয়েছে অবসর সময়,
এসেছে সবাই দল বেধে,সুর তুলে করছে কান্না।

অশ্রু মুছে রুমালে শেষ কান্না করে
শেষ দেখা দেখে কতজন যাচ্ছে চলে,
আমি তো জানি আমার কান্নার শুরু এখানে
এ কান্নার শেষ কোথা জানিনা।

আকাশের মেঘ ও ফুরায় এক সময়

আকাশের মেঘ ও ফুরায় এক সময়
আমার আখীজল কোনদিন ফুরাবে না,
যতদিন থাকব বেচে এ পৃথিবীতে
জানি এ কান্না আমার থামবে না ।

যদি ভাগ্যক্রমে গুপ্তধন পেয়ে যাই হঠাৎ
হাতে পেয়ে যাই যদি আকাশের চাদ,
তবু তোমায় হারানোর ক্ষতিপূরণ হবে না
তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না ।

থাকে থাক পৃথিবী জুড়ে যত সুন্দরী
নেমে আসুক আকাশ থেকে যত অপ্সরী,
এ জীবনে তোমায় হারানোর বেদনা
তবু আমি কোনদিন ভুলতে পারব না ॥

কবির সাথে যোগাযোগ : sfk505@yahoo.com

 

 

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!