বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সেই দিন - এই দিন

এক সময় কলাপাতার শিরনিতেও তৃপ্তি ছিল!



লন্ডনে কোথাও আমি কলাগাছ দেখি নাই। তবে কলাপাতা দেখেছি। কিন্তু এই কলাপাতা সেই কলাপাতা নয়। এই কলাপাতা হলো একটি রেস্তুরা। যার বাণিজ্যিক নাম ‘কলাপাতা রেষ্টুরেন্ট’। ইস্ট লন্ডনে এ রেস্তুরাটির অবস্থান থাকায় স্থানীয় বাঙালীরা এটিকে শুধু ‘কলাপাতা‘ হিসাবেই চালিয়ে দেন। এভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ চলে আসছে এই নামকরণের অভিধাটি। মনে হয় যতদিন এই রেস্তুরা চলবে ততদিনই তা অব্যাহত থাকবে। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সুযোগ আর হবে না রেস্তুরাটির।

এদিকে বাংলাদেশে কিন্তু কলাগাছের অভাব নাই। হাঁটে, মাঠে, ঘাটে, বাড়ির আঙ্গিনায় সবখানেই কলাগাছ পাওয়া যায়। এ সমস্ত কলাগাছে কমবেশী ফসল ধরে। এর মধ্যে বাড়ীর আঙ্গিনায় যেগুলিতে কলা উৎপন্ন হয় সেগুলি সে বাড়ীর মালিকানায় যারা থাকেন তারাই ভোগ করেন আর অন্যান্য স্থানে যেগুলি উৎপন্ন হয় তার হিসাব কেউ রাখে বলে মনে হয় না। তবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ফসলের কথা আলাদা।

এবারে ‘কলা পাতা’ প্রসঙ্গে আসা যাক। কলাগাছের কোন ডাল নেই। আছে শুধু পাতা। আর এটাই হলো আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। তবে এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘সিন্নি’। সিন্নিকে আবার সীরনীও বলা হয়ে থাকে। গ্রামের সাধারণ মানুষ কলাপাতা ও সিন্নির সাথে স্ব-বিশেষ পরিচিত। তাই তারা কোন ছোটখাট খাওয়া-দাওয়ার বিষয়কে উদাহরণ হিসাবে ‘কলাপাতার সিন্নি‘ হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন।

আমরা যারা ছোটবেলা কোন বাড়ীতে বা মসজিদে শিরনির দাওয়াত পেতাম তখন খালি হাতেই সেখানে গমন করতাম। আর গমনের পর প্রথমেই শুরু হতো ‘বসার স্থান’ দখলের প্রতিযোগিতা। লম্বা লাইন ধরে কেউ বসে পড়ত আবার কেউ দাঁড়িয়ে থাকতো। কেউ কেউ আবার চালাকি করে দুই পা আগ বাড়িয়ে বেশী জায়গা দখলের প্রচেষ্টা চালাতো। তবে প্রতিক্ষার প্রহর বেশী হলে আস্তে আস্তে সে প্রচেষ্টায় ভাটা পড়তো।

এরপর শুরু হতো কলাপাতা বিতরণের পালা। প্রত্যেককে একটি করে পাতার অংশ বিশেষ দেয়া হতো। আর সে পাতায়ই দেয়া হতো শিরনি। এ সমস্ত শিরনির অধিকাংশটিতেই তরকারীর চামচের অর্ধেক পরিমাণ শিরনি দেয়া হতো। এটা পাওয়ার পর কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে তা সাথে সাথেই গলাধঃকরণ করে ফেলতো। আবার কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অন্যান্যদের সাথে ভাগ ভাটোয়ারা করে ভক্ষণ করতো। বয়স্করা আবার বাড়িতে নিয়ে এসে ছোটদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। আর এটা পরম তৃপ্তিসহকারে বাচ্ছারা উপভোগ করতো। এমনও দেখা গেছে শিশুরা যখন কান্নাকাঠি করতো তখন শিরনি এনে দেয়ার কথা বল্লে তারা কান্না থামিয়ে দিত।

এই শিরনি খাওয়ার পর কে কতটুকু তৃুপ্তি লাভ করতো তা বুঝতাম না। কিন্তু আশ্বস্থ হতো যে, একটা কিছু হজম করা হয়েছে। অনেকে প্রশান্ত মনে বাড়ি ফিরতো। আত্মতৃপ্তির ভাব লক্ষ্য করা যেত ছেলে-মেয়েদের মধ্যেও।

কিন্তু আজকালকার অবস্থা সম্পূর্ণরুপে ভিন্ন হয়ে গেছে। মসজিদে বা অন্য কোথাও আর সেই কলাপাতার শিরনির আয়োজন তেমন একটা দেখা যায় না। তার বদলে হতে দেখা যায় বড় বড় পার্টি। যেমন ইফতার পার্টি, ঈদ পার্টি, জন্মদিনের পার্টি প্রভৃতি। আর এগুলি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে বা আলিশান হল সমুহে। সেখানে যে যতটুকু ইচ্ছা নিজ হাতে প্লেটে নিয়ে উদরপূর্তি করতে পারেন।

কিন্তু তাতেও অনেকের মধ্যে তৃপ্তির ভাব লক্ষ্য করা যায় না। সর্বত্র শুধু খাই খাই অবস্থা। যতই দিন যাচ্ছে ততই এ অবস্থা যেন বেড়েই চলেছে। শেষ পর্যন্ত এ সর্বগ্রাসী অবস্থা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। কারণ আমরা সেই আগের মত এখন আর কলাপাতার শিরনির মত অল্পতে তুষ্ঠ নই। যার যতটুকু আছে তার চাইতে আরো বেশী করে পেতে চাই। আর এ জন্যই সর্বত্র চলছে অশুভ প্রতিযোগিতা। যেকারণে অস্থিরতা শুধু বেড়েই চলেছে।
এখানে কলাগাছ, কলাপাতা ও শিরনির কথা রুপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আসলে এ লেখায় তখনকার সময়ের আত্মতৃপ্তি এবং বর্তমান সময়ের তৃপ্তির কথাই তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হয়েছে। আমরা যদি আগের মত অল্পতে তুষ্ঠ থাকতাম তবে হয়তো সমাজে এত হানাহানি এবং অশান্তির সৃষ্টি হতো না। একটি সুখী,শান্তিময় ও সমৃদ্ধিশালী সমাজে বসবাস করতে পারতাম আমরা।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সম্পাদক, দর্পণ ম্যাগাজিন লন্ডন।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!