শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পশু-পাখির চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি: আনিসুল আলম নাহিদ



মহাত্মা স্যামুয়েল হ্যানিম্যান (১৭৫৫-১৮৪৩) আবিষ্কৃত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি আর্ত-মানবতার পাশাপাশি পশু-পাখির চিকিৎসায়ও বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে। সে প্রেক্ষিতে আমাদের আনোয়ারা এগ্রো ভিশনেও গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সফলতার সাথে ব্যবহার করে বাস্তবে অনেক সুফল পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধানতার সাথে উপযুক্ত অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।

পশু-পাখির চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির ব্যবহার কবে এবং কিভাবে শুরু হয় তা আঁচ করতে না পারলেও তথ্যানুসন্ধানে ধারণা করা যায়, হ্যানিম্যানের সময়কালে খুব সম্ভব তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়নি। পরবর্তীতে কোনো কোনো উৎসাহী চিকিৎসক হয়তো প্রয়োগ-পরীক্ষা করে দেখেন এবং হয়তো অনেকক্ষেত্রে তার সফলতা প্রত্যক্ষ করে পশু-পাখির চিকিৎসায় ব্যাপক ব্যবহার শুরু করেন। এরপর হয়তো এ বিষয়ে লেখালেখিও হয়। এভাবেই সম্ভবত ক্রমান্বয়ে এর বিশ্বব্যাপী বিস্তার ঘটে।

সাধারণত যে হোমিওপ্যাথিক ঔষধগুলো পশু-পাখির চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো হচ্ছে- আর্ণিকা, বেলেডোনা, চায়না, লিডাম, হাইপেরিকাম, কলচিকাম, একোনাইট ন্যাপ, এরালিয়া, সিনা, এন্টিম টার্ট, কার্বোভেজ, হিপার, থুজা, মার্কসল, সাইলেশিয়া, গ্রাফাইটিস, এপিস মেল, পালসেটিলা, রাস-টক্স প্রভৃতি।

পশু-পাখির চিকিৎসায় ব্যবহৃত কয়েকটি ঔষধের প্রয়োগ ক্ষেত্র নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো-

আর্ণিকা: কোনভাবে পশু-পাখি আহত হলে আর্ণিকা প্রয়োগে ভাল ফল পাওয়া যায়।

লিডাম: পশু-পাখি বিষাক্ত প্রাণি-পোকা মাকড়; যেমন- কুকুর, শৃগাল, সাঁপ, ভোলতা, মৌমাছি ইত্যাদি দ্বারা আক্রান্ত হলে লিডাম প্রয়োগ করতে হবে। পশু-পাখির শরীরে যদি কোন সময় লোহা বা পেড়েক বিদ্ধ হয় তাহলে অবশ্যই এই ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়।

এবসিন্তিয়াম: ঘোড়ার পেটে কৃমিতে সাধারণত এ ঔষধ ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষণ হল ঘোড়ার পেটে ব্যাথা হয়, পেছনের পা দিয়ে পেটে আঘাত করে এবং শুয়ে ছটপট করে। এ ঔষধ প্রয়োগে এই সমস্যাগুলো দূরীভূত হয় এবং কৃমিও নির্গত হয়। এ ধরনের লক্ষণে শুধু ঘোড়া নয়, অন্যান্য প্রাণি যেমন- মহিষ, গরু, ছাগল ইত্যাদিতেও এ ঔষধ প্রয়োগ করা যায়।

সিম্ফাইটম: কোনভাবে পশু-পাখির হাড় ভেঙ্গে গেলে সিম্ফাইটম প্রয়োগে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে ভাঙ্গা হাড় যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে ব্যন্ডেজ প্রয়োগ করা অতি আবশ্যক।

পালসেটিলা: নরম প্রকৃতির পশুপাখি যেগুলা সহজেই পোষ মানে এবং আদর পছন্দ করে কিন্তু গরমে কষ্ট পায় তাদেরকে যেকোনো অসুখ-বিসুখে এই ঔষধ প্রয়োগ করা যেতে পারে। বিশেষত এই প্রকৃতির যেকোন পশুর সহজ ডেলিভারীতে খুবই কার্যকর।

মার্কসল: যেকোন পশু-পাখির মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা ঝরলে, ক্ষত হলে, জিহ্ববা ঘা হলে, খোড়া পঁচে গেলে, গায়ে ঠান্ডা ফোঁড়া হলে এই ঔষধ খুবই কার্যকরী।

বেলেডোনা: রোদে পুড়ে পশু-পাখির জ¦র বা অন্যবিধ অসুখ হলে, লাল-গরম ফোঁড়া উঠলে বেলেডোনা প্রয়োগ করলে আশানুরুপ ফল পাওয়া যায়। বিশেষত আক্রান্ত পশুপাখির গায়ের রঙ লাল হলে তুলনামুলকভাবে আরো বেশি কার্যকরী।

রাসটক্স: ভেজা বা স্যাতস্যতে স্থানে বিচরণ/বাস করা পশুপাখি রোগে আক্রান্ত হলে, রোগের বৃদ্ধি যদি রাতে দেখা যায় এবং চটপট করে/শরীরে ব্যাথা থাকে তাহলে রাসটক্স প্রয়োগে আক্রান্ত পশু-পাখি আরোগ্য লাভ করবে।

থুজা: পশু-পাখির শরীলে আচিল দেখা দিলে এই ঔষধ কার্যকরী।

সিনা: কৃমি আক্রান্ত পশু-পাখি পা দিয়ে বারে বারে নাক-মুখ খুটলে, খাবারে অরুচি দেখা দিলে, বারে বারে দূর্গন্ধযুক্ত পাতলা পায়খানা করলে এই ঔষধ প্রয়োগ করা যেতে পারে। এতে ক্রমান্বয়ে রোগাক্রান্ত পশুপাখি সুস্থ্য-সবল হয়ে উঠবে।

প্রয়োগ পদ্ধতি এবং সাবধানতা: পশু-পাখির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ শততমিক অথবা ৫০সহ¯্রতমিক পটেন্সিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই পশুপাখির চিকিৎসায় অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের পরামর্শ/সাহায্য নেওয়া উচিৎ। উল্লেখ্য, ঔষধের মাত্রা এবং প্রয়োগ পদ্ধতির একটি সূক্ষ্ম বিষয় হোমিওপ্যাথিতে রয়েছে। মাত্রা বা প্রয়োগ পদ্ধতি যথাযথ/ সঠিক না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। মনে রাখা দরকার, পশু-পাখির ভাষা বুঝা যায় না। তাই এক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, আচার-আচরণ ও কারণের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হয়।

বাস্তব প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ/ অভিজ্ঞতা:
০১. লক্ষ্য করা গেল, সন্ধ্যার দিকে গৃহস্থের ডিম দেয়া মুরগীটা হঠাৎ করে সর্দি-কাশি ও হাপাঁনিতে আক্রান্ত হয়ে মাথাটা মাটির সাথে লাগিয়ে কষ্টে দাঁড়িয়ে আছে। দিনে ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করে নি। মুরগীটার এই অবস্থা দেখে গৃহস্থের মন খারাপ-নিশ্চয়ই রাতেই মারা যাবে। এর আগেও এই রকম অবস্থায় এই গৃহস্থের কয়েকটি মুরগ-মুরগী যখন তখন মারা গেছে। খাঁচা দিয়ে ঢেকে অসুস্ত মুরগীটি আলাদা করে রাখা হল। পরীক্ষণ-পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে আমরা মুরগীটিকে এরালিয়া (হোমিও ঔষধ) প্রয়োগ করি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মুরগীটা রাতের মধ্যেই সুস্থ্য হয়ে উঠল। পরদিন সকালে গৃহস্থ মুরগীটা দেখতে গিয়ে খাঁচা ফাঁক করতেই- মুরগীটা দে ছুট। গৃহস্থের আনন্দ অপার। বলাবাহুল্য, বছর খানেক ধরে সে মুরগীটা উৎপাদনে রয়েছে।

০২. আমাদের পোষা বিড়ালটা বাসার পাশঁ দিয়ে যাওয়া ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির ধাক্কায় গুরুত্বর আহত হয়। পিছনের একটি পা ভীষণ ফুঁলে যায়। সে পায়ে একদম ভর দিতে পারে না। তিন পায়ে ভর দিয়ে কোন রকমে ঘরের এক কোণে আশ্রয় নেয়। প্রিয় এই বিড়ালটার এই দূরবস্থা দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। কষ্টে তাকে হোমিও ঔষধ আর্ণিকা প্রয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে সিম্ফাইটম প্রয়োগের কথা ভাবা হয়, যেহেতু বিড়ালটার হাড় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য সিম্ফাইটম আর লাগেনি, আর্ণিকায়-ই পুরো আরোগ্য লাভ করে।

০৩. আমাদের প্রতিবেশি কৃষি নির্ভর পরিবারের ছেলেটা রাত ১০ টার দিকে ছুটে আসে, তাদের গরুর বাছুরের পেট ফেঁপে অবস্থা খারাপ- খাচ্ছে না, পায়খানা হচ্ছে না, জাবরও কাটছে না। দিনে অবশ্য প্রচুর পরিমাণ কাঁচা ঘাস খেয়েছে। তাকে তাৎক্ষণিক হোমিও ঔষধ কলচিকাম দেয়া হয় এবং বলা হয় সকালে অবস্থা সম্পর্কে অবগত করার জন্য। সকালে খোঁজ নিয়ে জানা গেল বাছুরটা রাতের মধ্যেই পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করেছে-খাচ্ছে, পায়খানা হয়েছে এবং যথারীতি জাবরও কাটছে।

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পশু-পাখির চিকিৎসা সংক্রান্ত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হলো- হোমিওপ্যাথিক গো-চিকিৎসা- (ডা. সন্তোষ কুমার মন্ডল), পশুপক্ষী পালন ও চিকিৎসা (ডা. ইউ কে চ্যাটার্জী), হোমিওপ্যাথিক পশুপাখি পালন ও চিকিৎসা ( ডা. এ. কে. চাকলাদার) ইত্যাদি।

উল্লেখ্য, এছাড়াও সাম্প্রতিক কালে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রায় হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বইয়ে পশু-পাখির চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আনিসুল আলম নাহিদ।।  হোমিওপ্যাথি ও কৃষি বিষয়ক লেখক এবং পরিচালক- আনোয়ারা হোমিও হল গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ, সিলেট।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!