বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

চাষাবাদ বিষয়ক টুকিটাকি: আব্দুর রশীদ লুলু



 ১৩ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের নীচে নয় এবং ৩৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের বেশী নয়, এমন আবহাওয়া কমলা চাষের উপযোগী। এ ছাড়া কমলা চাষের জন্য প্রয়োজন সুনিস্কাশিত বেলে দোঁআশ এবং দোঁআশ মাটি। নিয়মিত পরিচর্যার সাথে কমলা গাছে ১৭টি উপাদান সমৃদ্ধ সিলভা মিক্স সার প্রয়োগে গুটি ঝরা রোধ হয় এবং ফলন ভালো হয়।

 কাঁঠাল গাছ বিশ হাত দূরত্বে রোপণ করা ভালো। বন্যামুক্ত সব ধরণের মাটিতে কাঁঠাল চাষ করা গেলেও সুনিষ্কাশিত এবং উঁচু জায়গায় কাঁঠাল চাষ করা উচিৎ। কেননা কাঁঠাল গাছ দাঁড়ানো (জমা) পানি সহ্য করতে পারে না। ফল সংগ্রহের পর পর কাঁঠাল গাছের মরা ও অবিন্যস্ত ছোট ছোট ডালপালা ছাঁটাই করলে পরবর্তীতে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

 অন্য গাছের নীচে (ফাঁকা জায়গায়) ছায়াযুক্ত স্থানে আদা-হলুদ, কচু, মানকচু ও ধনিয়া চাষ করা যায়। এতে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত হয়।

 লেবু, পেয়ারা, রঙ্গন এসব গাছের মাটির কাছাকাছি অবস্থিত এক বছর বয়সের সবল-সতেজ ডাল নির্বাচন করে মাটির কাছাকাছি গিঁটের নীচে সযত্নে ৩-৪ সে.মি. পরিমাণ বাকল উঠিয়ে মাটি চাপা দিয়ে রাখলে কিছু দিন পর কাটা অংশে শিকড় গজায়। শিকড় গজানোর নীচে কেটে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে রোপণ করে সহজে কম সময়ে ফলন পাওয়া যায় এবং এতে মাতৃগাছের গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে।

 পেঁপের বীজ সংগ্রহের জন্য অনেকেই বীজ রোদে শুকিয়ে থাকেন। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রোদে শুকিয়ে পেঁপের বীজ সংগ্রহ করলে বীজ গজানোর হার কমে যায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই গজায় না। পেঁপে বীজ সংগ্রহের জন্য বীজ ছাই দিয়ে চটকে উপরের পিচ্ছিল আবরণ মুক্ত করে ছায়ায় শুকিয়ে পলিথিন ব্যাগে বা বায়ুরোধী কাঁচের বৈয়ামে রাখা ভালো। এতে প্রায় এক বছর পর্যন্ত পেঁপে বীজের আশানুরূপ অংকুরোদগম ক্ষমতা বজায় থাকে।

 কৃষি ও কৃষকের কল্যাণকামীরা বলছেন, চাষাবাদের বীজের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়ে কৃষক পর্যায়ে নিজের প্রয়োজনীয় বীজ নিজেকেই সঠিক পদ্ধতিতে উৎপাদন করতে হবে এবং তা বোনার আগ পর্যন্ত সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে হবে।

 কেঁচোর আক্রমণ থেকে জমি রক্ষার প্রাকৃতিক উপায় হলো, নিম পাতার গুঁড়া ছিটানো। অনেকেই বলেন, এতে চমৎকার ফল পাওয়া যায়।

 জনপ্রিয় ফল লিচু দেশের সর্বত্র কম বেশী উৎপন্ন হলেও গভীর দোঁআশ পলি মাটি লিচু চাষের জন্য উপযোগী। তবে অম্লযুক্ত মাটিতে লিচু সবচেয়ে ভালো হয়। এ ছাড়া লিচু গাছের জন্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। জ্যৈষ্ঠ মাস লিচুর চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। ফল সংগ্রহের পর অত্যধিক ডালপালা ও পাতা ছাটাই করে দিলে লিচুর ভালো ফলন পাওয়া যায়।

 প্রচুর আলো-বাতাস এবং পানি নিষ্কাশন সুবিধা সম্বলিত উর্বর দোঁআশ মাটিতে শাক-সবজি ভালো হয়।

 শীত প্রধান দেশের দামী ফল স্ট্রবেরী বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি উপযোগী জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। স্ট্রবেরী সব ধরণের মাটিতে হলেও বেলে দোঁআশ মাটিতে ভালো হয়।

 মসলা (পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন প্রভৃতি) চাষাবাদের জন্য প্রয়োজন বেলে দোঁআশ মাটি। উল্লেখ্য, আমাদের দেশ পর্যাপ্ত বেলে দোঁআশ মাটি থাকা সত্ত্বেও অনেক কৃষকের এ সংক্রান্ত জ্ঞানের ও ভালো বীজের অভাবে পর্যাপ্ত মসলা উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

 দেশীয় সাধারণ ধানের চেয়ে উচ্চ ফলনশীল ধানের উৎপাদন বেশী হলেও উচ্চ ফলনশীল ধান চাষে খরচ হয় দেশীয় সাধারণ ধান চাষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশী। এছাড়া দেশীয় সাধারণ ধানের তুলনায় উচ্চ ফলনশীল ধান মাটি থেকে গ্রহণ করে প্রায় তের গুণ বেশী পুষ্টি উপাদান।

 কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতকালে ফল গাছের যতবেশী যথাযথ পরিচর্যা হবে, পরবর্তীকালে ফল গাছে ততবেশী ও গুণগত মানসম্পন্ন ফল পাওয়া যাবে।

 সুস্বাদু ও দৃষ্টি নন্দন আপেল কূল ও বাউকূল সারা দেশেই চাষাবাদ সম্ভব। তবে শুকনা, কঙ্করময়, খুব কর্দমাক্ত, খুব লবণাক্ত এবং মোটা বালুকণাযুক্ত মাটিতে আপেল কূল ও বাউকূল ভালো হয় না। প্রতি একরে তিনশ গাছ রোপণ করা যায়। উপযুক্ত পরিচর্যা করলে রোপণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ফল পাওয়া সম্ভব। আপেল কূল ও বাউকূলের বছরে দুইবার ফলন পাওয়া যায় এবং একটি গাছ সাধারণত: পনের বছর পর্যন্ত ফলন দিয়ে থাকে।

 টমেটো, মরিচ, বেগুন প্রভৃতি চারা ক্ষেতে রোপণের পর ২/৩ দিন ছায়ার ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হয়। এতে চারা মরার আশংকা কম থাকে।

 ক্ষেতে বিশেষত: সবজি ক্ষেতে ও ফুল বাগানে বিকালে পানি দেয়া ভালো।

 ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনের জন্য শাক-সবজিতে বাজারে প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহার না করেও মেহগনি গাছের ফল দিয়ে নিজেদের তৈরী ভেষজ কীটনাশক দিয়ে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন সম্ভব। অনেকে এই পদ্ধতিতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন।

 ক্ষেতের সব পোকামাকড় নির্বিচারে মারা ঠিক নয়। অনেক বন্ধু পোকা রয়েছে যেগুলো ক্ষেতের জন্য উপকারী। অতএব পোকা নিধনের আগে বন্ধু পোকা-শত্র পোকা চিনতে হবে। উল্লেখ্য, বন্ধু পোকা পরাগায়নের মাধ্যমে সবজি ও ফল-ফসলে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

 অনেকের ধারণা, মৌমাছি ফুলে বসলে ফসলের ক্ষতি হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, মৌমাছি ফুলে বসলে কৃষকের উপকার হয়, ফলন ভালো ও বেশী হয়। বিশেষ করে সরিষা ও লিচু ফুলে মৌমাছি বসলে সফল পরাগায়ন হয়। যা ফলন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

লেখক: সম্পাদক- ‘আনোয়ারা’ (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা), সিলেট।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!