রবিবার, ২২ মে ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আব্দুর রশীদ লুলু

অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিম: অনুভবে অনুভূতি



অনেক গুণে গুণান্বিত এবং অনেক অভিধায় অভিষিক্ত অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের সাথে আমার চাক্ষুষ দেখা বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক পরিষদ (বাহোপ), সিলেট শাখার সম্মেলনে ২০১৫ সালে সিলেট শহরে। প্রধানত: ডা. বীরেন্দ্র চন্দ্র দেব এবং ডা. পলি রানী মজুমদারের আগ্রহে জরুরী কাজ রেখে আমি ওই সম্মেনে অংশগ্রহণ করি। স্বভাব মতো আমি সম্মেলন শুরুর অনেক আগেই সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত হই। সম্মেলন শুরু হতে দেরী হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে বরাবর যেটা করি, সেটা হচ্ছে ব্যাগে রাখা বইপত্র পড়ে সময় কাজে লাগানো। ওই সম্মেলন কক্ষেও হৈ চৈয়ের মধ্যে পড়তে থাকি, সহি উদ্দেশ্য সম্মেলন শুরুর আগ পর্যন্ত পড়ব। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের ২/১ জন এসে সৌজন্যমূলক জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছেন। এদিকে দর্শক গ্যালারির প্রথম সারিতে একেবারে আমার ঘাঁ ঘেষে বসা ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত নির্বিকার অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিম, যিনি উক্ত সম্মেলনের প্রধান অতিথি এবং বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। তাঁর সাথে এর আগে আমার চাক্ষুষ আলাপ-পরিচয় না হলেও মাসিক হোমিও চেতনার ‘হোমিও সংবাদ কণিকা’য় বিভিন্ন সংবাদের সাথে তাঁর ছবি দেখেছি। এতদসত্ত্বেও তাঁকে আমি চট করে চিহ্নিত করতে পারিনি। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দেশের একমাত্র নিয়মিত ও পরিচ্ছন্ন হোমিও চিকিৎসা বিষয়ক প্রকাশনা মাসিক হোমিও চেতনার তিনি প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক। যে মাসিকে ইতোপুর্বে আমার অনেকগুলো লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া যে মাসিক আমরা আগ্রহ সহকারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি এবং আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান আনোয়ারা ফাউন্ডেশন পরিচালিত আনোয়ারা হোমিও হল গ্রন্থাগার ও আর্কাইভে এবং রাজীব স্মৃতি গ্রন্থাগারে যত্নে সংরক্ষণ করি।

যা হোক, কাছে বসে তিনি বোধ হয় আমার পড়াশোনা তথা সময়ের যথাযথ ব্যবহার লক্ষ্য করছিলেন। ইতোমধ্যে সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের তাঁর প্রতি বিশেষ নজর আমাকে সচেতন করে। জানা গেলো, তিনি আমার অন্যতম প্রিয় ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিম। যিনি চট্টগ্রাম শহরের একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। প্রশাসনসহ বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। পরিচয় পাওয়ার পরপর আমি দ্রুত তাঁকে সালাম দিয়ে নিজের নাম বলি। সহাস্যে সাথে সাথে ‘আমার ভাই’ বলে তিনি আমাকে বগলদাবা করে বুকের সাথে আন্তরিকভাবে জড়িয়ে ধরেন। আমি অভিভূত হয়ে যাই। তিনি আমার বউ-বাচ্ছার খবর নেন, ক’দিন ধরে মাসিক হোমিও চেতনায় লেখা না পাঠানোর কারণ জিজ্ঞেস করেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত কারণ না বলে বিষয়টা এড়িয়ে যাই এবং মনে মনে পুনরায় লেখা পাঠানোর পরিকল্পনা করি।

যা হোক, সম্মেলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি মনোযোগী দর্শক-শ্রোতা ছিলাম। সেখানে দু’কথা বলার সুযোগও আমার হয়। আমি প্রধানত: পরিচ্ছন্ন ও নিয়মিত মাসিক হোমিও চেতনার জন্য অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমকে সিলেটের হোমিও সমাজের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিম প্রধান অতিথির জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য রাখেন। সম্মেলনের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি শুরুতে তাঁর নজর কাড়ে। বিষয়টা প্রথম থেকে আমি আঁচ করতে পারলেও স্বভাবত: বিশেষ করে উদ্যোক্তাদের মন খারাপ হতে পারে ভেবে টু শব্দ করি না। অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিম তাঁর বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ঘুড়ি আকাশ ওড়ার পেছনে শুধু বাতাস ভূমিকা রাখে না, বরং ঘুড়ির সুতা যার হাতে তারও বড় একটা ভূমিকা থাকে। সুতা ছেড়ে দিলে প্রচুর বাতাস সত্ত্বেও সুউচ্চ আকাশে ওড়া ঘুড়ি ডিগবাজি খেয়ে পতিত হয়। পরোক্ষভাবে তিনি সম্মেলনের ব্যস্ত কর্তাকে ঈঙ্গিত করে এটা হয়তো বলতে চেয়েছেন- যতই ব্যস্ততা থাকুক নিয়ন্ত্রণটা নিজের হাতে রাখতে হয়, নতুবা প্রচুর পরিশ্রমের পরও সাফল্য সুতা কাটা ঘুড়ির মতো ডিগবাজি খায়। চমৎকার কথা-উপমা।

হাল্কা-পাতলা আর সাদা দাঁড়ি সম্বলিত পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত সুন্দর দেহ সৌষ্ঠবমন্ডিত অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমকে প্রথম দর্শনে আমার ফেরেশতা ফেরেশতা মনে হয়। ধর্মপ্রাণ এই মানুষটার আচার-আচরণ এবং কথাবার্তার ন¤্রতা যে কাউকেই আকর্ষণ করার কথা। আমিও প্রথম সাক্ষাৎ-আলাপে অভিভূত হয়ে যাই। সেই ২০১৫ সাল থেকে অদ্যাবধি তাঁর সাথে বিভিন্নভাবে আমার সম্পর্ক/যোগাযোগ অব্যাহত আছে। কখনো আমি চিঠিপত্র লিখি, কখনো সেলফোনে সরাসরি আলাপ হয় এবং কখনো এসএমএস চালাচালি হয়। সেলফোনে কথা হলে প্রায়ই আগেভাগে তিনি সালাম দিয়ে বসেন এবং নিয়মিত আমার ছেলে কম্পিউটার প্রকৌশলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ লেখক আনিসুল আলম নাহিদের খোঁজ নেন। মাসিক হোমিও চেতনা স্টাডি এবং অন্যান্যভাবে যতদূর জানি, তিনি ১৯৪৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভারতের কেরালা রাজ্যে এক ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধশালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য দিয়ে সম্ভবত: চট্টগ্রাম তাঁর প্রতিষ্ঠা। তাঁর সুযোগ্য সহধর্মীনি জোহরা এ করিম বিগত ১৬ জুন ২০২১ ভোরে চট্টগ্রামে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আয়াজ করিম ইংল্যান্ড প্রবাসী। দু’মেয়ে ডা. হাফসা করিম ও ডা. সাফিয়া করিম, দু’জনই ডিএইচএমএস ডিগ্রিধারী। সিলেটের বিশিষ্ট হোমিও চিকিসক ড. নজীর আহমদ (মরহুম) এবং কক্সবাজারের বিশিষ্ট হোমিও চিকিৎসক ও কবি কবীর আহমদ (মরহুম) দু’জনেই বিভিন্ন সময়ে অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বলা বাহুল্য, এ দু’জনের সাথে শেষ সময়ে এসে একটানা কয়েক বছর আমার প্রায় নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এছাড়া কলকাতার বিশিষ্ট হোমিও চিকিৎসক ও লেখক অধ্যাপক ডা. বিজয় ভানু দত্ত (প্রয়াত)- এর লেখায়ও বিভিন্ন সময়ে অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের গুণপনার বিষয়ও উঠে এসেছে। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে- “বিশ্ববাসীর নিরোগ জীবন যাপনের গবেষক, হোমিওপ্যাথির যাবতীয় অগ্রগতির সংগ্রামী যোদ্ধা, মানব কল্যাণের সার্বিক কর্মকান্ডের নেতৃত্বদানকারী বিশিষ্ট সমাজসেবী ও হোমিও চিকিৎসা বিজ্ঞানী অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিম।” সত্যি, হ্যানিম্যান ও হোমিওপ্যাথির প্রতি তাঁর অনেক আন্তরিকতা-ভালোবাসা।

২০১৭ সালে বাহোপ সিলেট শাখার সম্মেলনে আবার আমার সরাসরি অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের সাথে দেখা হয়। তিনি সেই আগের মতো হাসিমুখে ভাই বলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং আমার ছেলের কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসকদের অনেকেই বিকেলে চেম্বার করতে চলে গেলেও আমি মূলত: প্রধান অতিথি অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের জ্ঞানগর্ভ কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অবস্থান করি। এবারও তাঁর কথা আমাকে উৎফুল্ল করে।

আমি বিভিন্নভাবে অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের কাছে অনেক ঋণী। অনেক ব্যস্ত মানুষ তিনি, তবু আমাকে মাঝেমাঝে সময় দেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিনি আনোয়ারা ফাউন্ডেশন পরিচালিত আনোয়ারা হোমিও হল গ্রন্থাগার ও আকার্ইভ এবং রাজীব স্মৃতি গ্রন্থাগারে সহযোগিতা করছেন। এ সুযোগে উদ্যোক্তা পরিবার এবং আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমার লেখার পাশাপাশি ২০২১ সাল থেকে আমার ছেলে আনিসুল আলম নাহিদের বৈচিত্র্যধর্মী কয়েকটি লেখাও তাঁর হাত দিয়ে মাসিক হোমিও চেতনায় প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনলাইন ও অফলাইন পত্রিকার পাশাপাশি মাসিক হোমিও চেতনায় প্রকাশিত লেখাগুলো আমার ছেলেকে উজ্জীবিত করছে। ইতোমধ্যে সে অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের একটি ইংরেজি লেখা বাংলায় অনুবাদ করেছে। ভবিষ্যতে তাঁর সাথে আমার ছেলে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। বড় পরিসরে কাজ করতে আগ্রহী নাহিদ তাঁর সাথে দেখা করতে সিলেট থেকে সুদূর চট্টগ্রামে ছুটে যেতেও প্রস্তুত। আমার ধারণা, প্রাণবন্ত অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের সান্নিধ্য পেলে সে চমৎকার উপভোগ করবে। নাহিদ হোমিওপ্যাথি বিষয়ক তার প্রথম বইয়ের ভূমিকাও অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের দ্বারা লেখাতে আগ্রহী।

আমি সর্বান্ত:করণে অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল করিমের সুস্থ শতায়ু কামনা করি। আশা করি, ভবিষ্যতে আমাদের কাজে-কর্মে বিশেষত: আনোয়ারা হোমিও হল গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ এবং হ্যানিম্যান ও হোমিওপ্যাথি বিষয়ক প্রকাশনা “হোমিও আলো” বিষয়ে তাঁর পরামর্শ ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

লেখক: সম্পাদক – আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা)।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!