রবিবার, ২২ মে ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রাপ্ত ভোট: লুৎফুর- ৫৪.৯%, বিগস- ৪৫.১%

ইতিহাস গড়লেন লুৎফুর: তৃতীয়বার মেয়র নির্বাচিত



লুৎফুর রহমান। ছবি: খালিদ হোসাইন

।। কাইয়ূম আব্দুল্লাহ, লণ্ডন থেকে ।। আবারও অবিশ্বাস্য এক ইতিহাস গড়লেন লুৎফুর রহমান। বিপুল ভোটে তৃতীয়বারের মতো টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। সম্ভাব্য সকল প্রিডিকশনকে মিথ্যা প্রমাণিত করে প্রথম ধাপের গণনায়ই সর্বোচ্চ সংখ্যক ৪০,৮০৪ তথা ৫৪.৯% শতাংশ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির প্রার্থী বর্তমান মেযর জন বিগস পেয়েছেন ৩৩,৪৮৭(৪৫.১%) ভোট। প্রথম প্রিফারেন্সে লুৎফুর রহমান পেয়েছিলেন ৩৯,৫৩৩ ভোট আর জন বিগস পেয়েছিলেন ২৭,৮৯৪ ভোট। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম রেফরেন্স ভোট এককভাবে ৫১% কারো পক্ষে না পড়ায় দ্বিতীয় প্রিফারেন্স ভোট গণনা করতে হয়। দ্বিতীয় প্রিফারেন্সে ভোটেও লুৎফুর রহমানের ভূমিধ্বস জয় অক্ষুণ্ণ থাকে। আর তৃতীয় স্থানে রয়েছেন আরেক বাঙালি প্রার্থী, লিবডেমের রাবিনা খান, তিনি পেয়েছেন ৬,৪৩০ এবং কনজারভোটিভ প্রার্থী এলিয়ট উইভার পেয়েছেন ৪,২৬৯ ভোট।

লুৎফুর রহমানের ঐতিহাসিক বিজয়ে বৃটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আনন্দের বন্যায় ভাসছে। স্যোশাল মিডিয়ার সুবাদে সাথে সাথে সর্বত্র এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ এবং অন্যান্য বাংলাদেশী সমাজে চলছে খুশির আমেজ। তবে লুৎফুর রহমানের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনে দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়াতে হয়েছে। একদিকে আদালতের খড়গ, অন্যদিকে চরম ডানপন্থী ব্রিটিশ মিডিয়া এবং নিজ কমিউনিটিরও একটি অংশের চরম বিরোধীতা নানা ধরণের বিরোধীতা ও কূটচালকে চ্যালেঞ্জ করেই লুৎফুর রহমানকে প্রত্যাশিত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়েছে। তাঁর বিজয়ের পেছনে টাওয়ার হ্যামলেটসের সাধারণ জনগণের নিরঙ্কুশ মমতা ও সমর্থনই ছিলো মূল ভূমিকা।

গত ৫ মে‘র স্থানীয় সরকার নির্বাচনে টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণ ইতিপূর্বে বিশেষ ইলেক্ট্রোরাল কোর্টের রায়ে পদচ্যুত হওয়া লুৎফুর রহমানকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে জনগণ যে ক্ষমতার উৎস সেটিরই শক্ত জানান দিয়েছেন তারা। লেবার প্রার্থী বর্তমান মেয়র জন বিগস এবং অ্যাসপায়ার প্রার্থী বারার প্রথম নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমানের মধ্যে হাট্টাহাট্টি লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথা থাকলেও নির্বাচন শুরু হওয়ার দিন থেকেই সবার মুখে লুৎফুর, লুৎফুর এবং লুৎফুর — সেটির প্রতিফলন ঘটলো শুক্রবার বিকেলে প্রকাশিত ভোটের ফলাফলেও। একই সাথে রাজনীতির মাঠ থেকে প্রায় নির্বাসিত হওয়া লুৎফুর রহমান তাঁর কাজের মাধ্যমে যে বারার বাসিন্দাদের মনের মণিকোঠায় শক্ত আসন গড়তে পেরেছিলেন তারও অভূতপূর্ব প্রকাশ ঘটলো ভোটের এমন ফলাফলে।
বৃহস্পতিবার ভোট শুরু হওয়া পর থেকে শুক্রবার প্রায় ৬টায় ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত এরকম শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে সময় গেছে টাওয়ার হ্যামলেটসবাসীদের। সবার মনেই একটি জিজ্ঞাসা ছিলো— কী হবে ভোটের ফলাফল? তাদের পছন্দের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারবেনতো? লুৎফুর রহমানের বিজয় ঠেকাতে মূলধারার ডানপন্থী মিডিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে লুৎফুর ঠেকানোর নানা মিশন এবং মন্তব্য হজম করতে হয়েছে সাধারণ জনগণের বৃহৎ অংশকে। তবে উৎকণ্ঠার পাশাপাশি দৃঢ় আশাবাদও ছিলো অনেকের মনে। শেষ পর্যন্ত সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রত্যাশিত ইতিহাস সৃষ্টিকারী ফলাফলে বিজয়ী হলে লড়াকু বাঙালি লুৎফুর রহমান।

উল্লেখ্য, লেবার দলের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে দল ত্যাগ করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে লুৎফুর রহমান ২০১০ সালে বারার প্রথম নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। অতঃপর ২০১৪ সালে তিনি পুনঃনির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে অনিয়মসহ নানা অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার রায়ে তাকে মেয়রের পদ হারাতে হয়। একই সাথে আদালতের রায়ে তাকে ৫ বছরের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণেও নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়। অনেকের ধারণা ছিলো তিনি আর ফিরতে পারবেন না। সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ পার করে রাজনীতিতে ফেরেন এবং নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণা দিয়ে আবার আলোচনায় আসেন।

গত ২০ ফেব্রুয়ারী নিজের টুইটারে দেয়া এক বার্তায় লুৎফুর রহমান নিজেকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে বলেছিলেন, কেবল অ্যাসপায়ার দলই টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবারের সার্ভিস কর্তন, ট্যাক্স বৃদ্ধি এবং রাস্তা বন্ধ করার অবসান করতে পারে। আগামী দিনগুলোতে টাওয়ার হ্যামলেটসের পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতকে ঢেলে সাজাতে নিজের পরিকল্পনাও তুলে ধরেছিলেন তিনি।

লুৎফুর রহমানের প্রার্থীতা ঘোষণার পরপরই মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচকভাবে শিরোনাম হতে শুরু করেছিলো টাওয়ার হ্যামলেটস এবং এখানকার বাংলাদেশিরা। স্পেকটেটর এবং ইভিনিং স্ট্যাণ্ডার্ড লুৎফুর রহমান টাওয়ার হ্যামলেটসের কলঙ্কিত মেয়র হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর সাজার বিস্তারিত প্রায় নিয়মিত তুলে ধরছিলো তাদের প্রতিবেদনগুলোতে। কিন্তু কিছুতেই লুৎফুর রহমানকে ঠেকানো সম্ভব হয়নি। বিপুল জনরায়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁরই করা উক্তি “আমি মচকাবো তবু ভাঙ্গবো না” এর অবিশ্বাস্য বাস্তব প্রমাণ রাখতে সক্ষম হলেন লুৎফুর রহমান।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!