শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

তারিক বিন যিয়াদের অনন্য ভাষণ।। হাবীব নূহ



১.
তারিক বিন যিয়াদ বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন,

أيها الناس، أين المَفَرُّ؟

আরে সহযোদ্ধাগণ!
তোমরা পালাবে কোথায়?
(পালাবার পথ কোথায়?)

البحرُ من ورائكم، والعدوُّ أمامَكم وليس لكم واللَّهِ إلا الصدقُ والصَبْرُ.

সাগর তোমাদের পিছনে, শত্রু তোমাদের সামনে, এবং আল্লাহর কসম, বিশ্বাস ও ধৈর্য ভিন্ন তোমাদের আর (এখন) কিছুই নেই।

واعلموا أنكم في هذه الجزيرة أَضْيَعُ من الأيتام في مَأْدُبَةِ اللِّئام،

মনে রেখো,
এই দ্বীপে একটি নিকৃষ্ট ভোজনশালায় এতিমদের চেয়েও বেশি (যেন) নিতান্ত হারিয়ে গেছ।

وقد اسْتَقْبَلَكم عدوّكم بِجَيْشِهِ وأَسْلِحَتِهِ، وأَقْواتُه موفورةٌ ، وأنتم لا وَزَرَ لكم إلا سيوفُكم ولا أقواتَ إلا ما تَسْتَخْلِصُونَه من أيدِي عدوِّكم،

এদিকে,শত্রু তার সেনাবাহিনী আর অস্ত্রশস্ত্র সহ মোকাবিলায় অবতীর্ণ হয়েছে।আর শত্রু,তারা তো (ধনবলে বলীয়ান আর ) সৈন্যসামন্তে পরিপূর্ণ। অপরদিকে তোমাদের মোটে তরবারি ছাড়া ভারী কিছুই নেই।

বস্তুত, শত্রুর হাত থেকে (যদি) কিছু ছিনিয়ে নিতে পারো,তবে তা ছাড়া আর কোন শক্তি তোমাদের (থাকবারও) নয়।

(অর্থাৎ তোমাদের জীবনের একমাত্র সুযোগ যা বাকি আছে তা হল, শত্রুর হাত থেকে [বিজয়] ছিনিয়ে নিতে পারা)

وإِن امْتَدِّتْ بكم الأيامُ على افتقارِكم ولم تُنْجِزوا لكم أمراً ذهبتْ رِيحُكم، وتَعَوّضَتِ القلوبُ من رُعْبِها منكم الجَرَاءَةَ عليكم،

আর যদি এই দৈন্য দশার দিনগুলি দীর্ঘায়িত হয় এবং বিজয়ের বিষয়টি মীমাংসিত না হয় তবে তো বাতাসই চলে যাবে (অর্থাৎ আশা,ভরসা সব ফুটো ও ফাঁকা হয়ে যাবে)
এবং তোমাদের হৃদয়গুলি তখন সাহসিকতার পরিবর্তে শত্রুর ভয়ে ভীত হওয়ার মাশুল গুণতে থাকবে।

(তাই, ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করা আগেই অথবা স্বপ্ন চৌচির হবার আগেই, ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে [বিজয়ের জন্য] সুপ্ত সাহসিকতাকে উন্মুক্ত কর)

فادفعوا عن أنفسكم خُذْلانَ هذه العاقبة من أمركم
بِمُنَاجَزَةِ هذا الطاغية.

সুতরাং অনাগত সেই অবমাননাকর পরিণতি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতেই তোমাদেরকে এই অত্যাচারী শাসককে পরাজিত করতেই হবে।

فقد ألقت به إليكم مدينَتُه الحصينة، وإنّ انتهاز الفُرْصَة فيه لممكن إن سمحتم لأنفسكم بالموت، وإنّي لم أحذِّركم أمراً أنا عنه بنَجْوة, ولا حملتكم على خُطة أرخصُ متاع فيها النفوسُ (إلاَّ وأنا) أبدأ بنفسي،

জালিমের একটি সুরক্ষিত শহর (আজ) তোমাদের সামনে, এটি জয় করার সুযোগ তখনই হবে যদি তোমরা মরতে প্রস্তুত হও।

আর আমি এমন কিছু সম্পর্কে তোমাদেরে সতর্ক করছি না যা থেকে আমি নিজেকে বাঁচাতে চাচ্ছি।(গোপনে আত্মরক্ষারও কোন পরিকল্পনা আমি করছি না) বরং (এ সময়ে) এমন এক রূপরেখা পরিকল্পনা করা হয়েছে যেখানে সবচেয়ে সস্তা সওদা হবে ‘আত্মার’ অধিকন্তু (এ সওদা) আমি নিজেকে দিয়েই শুরু করতে চাই।
(অর্থাৎ শাহাদতের জন্য আমি তোমাদের আগেই পুরাপুরি প্রস্তুত)।

واعلموا أنّكم إن صَبرتم على الأشق قليلاً، استمعتم بالأرْفَه الألذِّ طويلاً

এবং জেনে রেখো (বন্ধুগণ),
যদি তোমরা সবচেয়ে কঠিন কিছুর জন্য সামান্য ধৈর্য ধরতে পরো তবে তোমরা দীর্ঘ সময়ের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সুখ (সুফল) উপভোগ করতে পারবে।
…।
(نفح الطيب للمَقَّري و
جمهرة خُطب العرب)

২.
লম্বা, সুঠাম দেহী আর সুডৌল চেহারার সাহসী যোদ্ধা তারিক বিন যিয়াদ উল্লিখিত ভাষণ যখন দিচ্ছিলেন তখন তাঁর আশপাশ প্রায় বারো হাজার সৈন্যের সমাবেশ ছিল।তারিক ছিলেন তাঁদের সেনাপতি।তাঁর সেনাদলে ছিল বারবার এবং আরব সেনা।অল্প কিছু ছিল অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তবে অধিকাংশ ছিল বারবার যোদ্ধা।

এর আগে তারিক আফ্রিকা থেকে তাঁর বাহিনী নিয়ে যাত্রা করে Mons Calpe পাহাড়ের কাছে অবতরণ করেন।Mons Calpe জায়গাটি আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরের প্রবেশপথে অবস্থিত।এই জায়গাটিই বিশ্বে এখন জিব্রাল্টার নামে পরিচিত।যা তারিকের নামকেই প্রতিনিধিত্ব করছে কারণ,জিব্রাল্টার হল মূলত ‘জাবাল আল তারিক’ جبل طارق তারিক এর পাহাড়।পরবর্তীতে বাক্যটির বিকৃতি ঘটে এবং স্পেনীয় ভাষায় জিব্রাল্টার অপভ্রংশে পরিণত হয়।ঠিক তেমনি (Strait of Gibraltar) জিব্রাল্টার প্রণালীও তারিককে চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে রাখবে।
চারটি বড় বড় জাহাজে করে তারিকরা এখানে পৌঁছান।এখানে পদার্পণের পর তারিক জাহাজগুলো কে জ্বালিয়ে দিতে আদেশ করেন যাতে করে সেনাদের আর পিছুটান না থাকে।জাহাজ পুড়ানোর এ ঘটনাতে ঐতিহাসিকগণ দুটি দলে বিভক্ত।একদল এটি স্বীকার করছেন আর অপর দল এর যথার্থ প্রমাণ খুঁজে পাচ্ছেন না।

৯২ হিজরীর রামাদ্বান মাস তথা ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের দশ জুলাইয়ের পর কোন এক সময় তারিক সেনাদের উদ্দেশ্যে এই ভাষণটি দিয়ে তাঁদের অনুপ্রাণিত করেন।তারিক সেনাদের মাঝামাঝি একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রথমে স্রষ্টার প্রশংসা-বাক্য এবং সালাওয়াত আলান নাবী পেশ করেন অতপর উল্লিখিত ভাষণ প্রদান করেন।

তিনি যখন কথা বলছিলেন উপস্থিত সেনারা তখন তাঁদের অধিপতির বক্তব্যে উজ্জীবিত হচ্ছিল।তাঁদের হৃদয়ের সংশয় আর ভয়গুলো,তারিকের বক্তব্যের প্রতিটি বাক্যের বিনিময়ে উবে উবে পাশের আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পতিত হচ্ছিল আর এর বদলে সাগর-মহাসাগরের ঢেউগুলোর ন্যায় হৃদয়ে বিশ্বাস ও সাহসের ঢেউগুলো উত্তাল হচ্ছিল।
অতঃপর প্রতিটি হৃদয়, বুকে ধারণ করা এক মহাসাগর বিশ্বাস আর এক সাগর সাহস নিয়ে গুয়াডেলেটের যুদ্ধে ভিসিগথ রাজা রডারিকের এক লাখের উপর সেনাদলকে মোকাবিলায় হারিয়ে দিতে সক্ষম হন।
বিজয়ের সে দিনটি ছিল ১৯ জুলাই [According to the Metropolitan Museum of Art] আর চাঁদ মাসের তারিখে ২৮ রামাদ্বান ছিল দিনটি।

তাঁর এই যুগান্তকারী বক্তব্য ইতিহাসের যেন বেশ বড় এক অধ্যায়।এই ভাষণ, সুদীর্ঘ প্রায় আটশ বছরের একটি ইতিহাস রচনা করে।মুসলিমদের, ইউরোপ বিজয়ের বিশেষ ঐতিহ্যের কাহিনীর কাহিনী শুরু হয় এই বক্তব্যে।
৩.
তারিকের ভাষণ এতটুকুই ছিল না বরং আরো দীর্ঘ হয়ত ছিল।তবে খুব বেশি লম্বা ছিল না।
আরো দুই বা তিন প্যারাগ্রাফ বেশি হয়ত হবে।
এ ভিন্নতা ঐতিহাসিকদের কারণে হয়েছে।তাঁদের গ্রন্থে কোথাও লম্বা, কোথাও ছোট।আবার কোথাও মাঝামাঝি ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে।সূত্রের ভিন্নতার কারণে এমনটি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে তারিকের ভাষণের মুখ্য বিষয় এবং সৌন্দর্য্য উল্লিখিত অংশে যথাযথ চলে এসেছে।আপাত হয়ত এতটুকু যথেষ্ট।
৪.
তারিক বিন যিয়াদ ছিলেন বাগ্মী বা সুবক্তা।মোহনীয়তা ও লালিত্য ছিল তাঁর ভাষায়।পরন্তু তাঁর ভাষা ছিল ‘অলংকারে’ সমৃদ্ধ।তাঁর অসাধারণ ভাষা শৈলীর কারণে আরব বিদ্বান আর প্রজ্ঞাবান ঐতিহাসিকদের কাছে তাঁর ভাষণ বরাবর আলাদা গুরুত্ব পেয়ে আসছে।যদিও তাঁর ভাষণের সমাদর মুসলিম, অমুসলিম, আরব এবং অনারব, সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই রয়েছে।

অন্যান্য ভাষায় তাঁর ভাষণের অনুবাদে বেশ তারতম্য লক্ষ করা গেছে।অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি মূল আরবি থেকে তাঁর বক্তব্যের মর্মোদ্ধার করার প্রয়াস চালিয়েছি।
৫.
তারিক বিন যিয়াদকে পৃথিবীর সবাই ভাল পাবে এমন হতে পারে না।মানবিক দোষ তো মানুষের থাকা অতি স্বাভাবিক।তবে অনেকের কাছে তারিকের মূল দোষ—তাঁর মূল ধর্ম ছেড়ে মুসলিম হওয়া, ইসলামে শিক্ষা-দীক্ষা নেওয়া, মুসলিম সেনাপতি হওয়া, পশ্চিমকে বিজয় করা ইত্যাদি হয়ত তাঁর অপরাধ।
তাঁদের কাছে তাঁর ভাষণে গন্ধ খোঁজা আর গন্ধ পাওয়া মামুলি ব্যাপার।
জেনে রাখা ভাল যে,কিছু ইতিহাসবেত্তা এমন আছেন যাদের এক ধরণের ইতিহাসীয় ঘ্রাণশক্তি আছে যা খুব প্রখর তবে এ প্রখরতা শুধু বিশেষ এক ধর্মের বেলায়ই দেখা যায়।তাঁদের অনুসন্ধানের চশমার পরকলা এবং অনুসন্ধানের অণুবীক্ষণ ও দূরবীক্ষণ যন্ত্রের লেন্স বা অবতল লেন্স বিশেষ এক ধর্মের ক্ষেত্রে বিশেষ এক লাল বর্ণে যেন রঞ্জিত।
পক্ষান্তরে কিছু মুসলিম ঐতিহাসিকও এমন আছেন যারা ন্যায়ের মানদন্ড ঠিক রাখতে সক্ষম হন না, কখনো কখনো তাঁরা আবেগ তাড়িত হয়ে একপেশে বেমানান হেলে পড়েন।
তারিক বিন যিয়াদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

চলবে …..
(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত হবে)

লেখক: মুফতি

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন