
বেশ কিছুদিন আগেও গ্রামের প্রায় প্রতিটি মসজিদে কুরআন শিক্ষার প্রভাতী মক্তব চলত। শিশুদের কুরআন শিক্ষা এবং ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র ছিল এসব সকালের মক্তব। সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থীরা শুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াত, প্রয়োজনীয় মাসয়ালা, দুয়া-দরুদ এবং নামাজ-রোজার নিয়ম-কানুন শিখত। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মক্তব শিক্ষা অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আর শিশুদের তেমন দলবেঁধে মসজিদের মক্তবে যেতে দেখা যায় না, আর গ্রামবাংলার জনপদ আলিফ, বা, তা এর শব্দে মুখরিত হয় না।
এমন সময় সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ানবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বশিরপুর মাস্টার বাড়িতে মক্তব শিক্ষা পুনরায় চালু করা এক প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি শুধু হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার ধারাকে জীবন্ত রাখবে না, শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সঠিক ভিত্তি গড়তেও সহায়ক হবে।
জানাযায়, বশিরপুর মাস্টার বাড়ি মক্তবটি ১৮৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় এখানে আরবি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা শিক্ষা ও প্রদান করা হতো। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে তালতলা বশিরপুর জামে মসজিদ পাকাকরণ হয়ে নির্মাণ হলে মক্তবটি মসজিদ প্রাঙ্গণে স্থানান্তর করা হয়। তবে মসজিদটি কিছুটা দূরে হওয়ায় এবং বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে স্থানীয় মুরুব্বি ও অভিভাবকদের অনুরোধে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে পুনরায় মাষ্টার বাড়িতেই মক্তব কার্যক্রম চালু করা হয়।
বর্তমানে এ মক্তবে ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছেন। এখানে শিশুদের সূরা, কেরাত, নামাজ, কুরআন তেলাওয়াতসহ নুরানি শিক্ষার পাঠদান করা হয়। সপ্তাহে ছয় দিন (শুক্রবার ব্যতীত) নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সময়ে শিশুদের মক্তবে অংশগ্রহণের আগ্রহ সন্তোষজনক। বশিরপুর মাস্টার বাড়ি মক্তবটি বশিরপুর পঞ্চায়েত কমিটির সার্বিক পরিচালনায় এবং জহুর-হুসনেআরা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অর্থায়নে মক্তবের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে আলাপকালে জহুর-হুসনেআরা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উপদেষ্টা প্রফেসার বদরুজ্জামান বলেন, মক্তব শিক্ষা শিশুদের নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে মক্তব পরিচালনায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ধীরেধীরে মুরুব্বিদের শূণ্যতা এবং অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি।
তিনি মক্তবের পরিসর সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে আরও একজন শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
মক্তবের শিক্ষক হাফিজ মাওলানা মামনুনুর রহমান জানান, শুরুর দিকে তেমন সাড়া না পেলেও বর্তমানে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। অভিভাবকরা নিজেরাই সন্তানদের নিয়ে মক্তবে আসছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লে শ্রেণিকক্ষ বড় করা ও অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন হবে।
এদিকে, ২০২৪ সালে পুনরায় চালু হওয়া এই মক্তবের সমাপনী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে মক্তব প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই সমাপনী অনুষ্ঠানে ৪জন কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সনদ, কুরআন শরীফ ও সচিত্র নামাজ শিক্ষার বই তুলে দেওয়া হয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন জহুর-হুসনেআরা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উপদেষ্টা প্রফেসার বদরুজ্জামান, মক্তব শিক্ষক হাফিজ মাওলানা মামনুনুর রহমান, বশিরপুর পঞ্চায়েত কমিটির সহসভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. আলাউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মীর সানুর মিয়া, সদস্য সেলিম খান, সাহাজ উদ্দিন সাজু, স্থানীয় ইউপি সদস্য খন্দকার আব্দুর রকিব, শিক্ষানুরাগী মুজিবুর রহমান মস্তফা, শাহরিয়ার উদ্দিন শাহান, সাহবাজ উদ্দিন সোহান, আশরাফ উদ্দিন সিজান এবং বালাগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি সাংবাদিক শাহ মো. হেলালসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।





