সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে তিন ধাপে পাল্টা ব্যবস্থা



ছবি :সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ কোনো দেশ যোগ দিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে ইরান। এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভূমিকম্পসম’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই। তিনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেহরান তিন ধাপে পদক্ষেপ নেবে।

গত শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব রেজাই এ সতর্কবার্তা দেন।

বিশ্বের সব দেশ, বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশীদের যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের অংশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্ত হলে তেহরান তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে।

রেজাই আরও সতর্ক করেন, কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বের হতে দেওয়া হবে না। এমনকি হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথও এর আওতায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

তিন ধাপে পাল্টা ব্যবস্থা

রেজাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের প্রতিক্রিয়া তিন ধাপে এগোবে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করবে তেহরান। তাদের ওয়াশিংটনের অবস্থান থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হবে।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কাজ না হলে দ্বিতীয় ধাপে সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থে আঘাত করার মতো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে জানান তিনি। তৃতীয় ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত না জানালেও তার বক্তব্যে কঠোরতর পাল্টা ব্যবস্থার ইঙ্গিত রয়েছে।

বিকল্প রপ্তানি পথের প্রসঙ্গ আসায় বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও তেহরানের হুমকির আওতায় পড়তে পারে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি পরিবহনে এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে তেহরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান আগেভাগেই সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের সতর্ক করে দিতে চাইছে। কোনো হামলার প্রস্তুতিকেও ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আজিজির বিশ্লেষণে, ইরানের বর্তমান সামরিক কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, সম্ভাব্য হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা ঠেকানোর চেষ্টা করা। দ্বিতীয়ত, হামলা হলে তুলনামূলক বড় মাত্রায় পাল্টা আঘাত করে প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।

চাপে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানের প্রতিবেশী এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোও ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে। তারা একদিকে ইরানের হামলার বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চাইছে না।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এসব দেশের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

গত সপ্তাহে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে ইরান। ২০২২ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল।

এর আগে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতেই উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার কৌশল অনুসরণ করছে।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবনের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ইরানে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার প্রভাব এসব দেশেও পড়বে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসির মতে, কূটনৈতিক সমাধানের ওপর আস্থা কমে গেলেও এ অঞ্চলের কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদি আরেকটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ব্যয় বহন করতে চাইবে না।

নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের এই হুঁশিয়ারির মধ্যেই তেহরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসতে পারে বলে জানা গেছে। এতে আগে থেকেই সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দেন। ইরানকে সহায়তা বা কোনো ধরনের ‘লাইফলাইন’ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও বলেন, দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিতে হবে, নইলে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা চীনের প্রতিও তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি চীনে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান সরকার ভেঙে পড়বে বলে যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল দাবি করে তিনি বলেন, বাস্তবে ইরানের প্রতিরোধ ও জাতীয় ঐক্য সেই হিসাবকে ভুল প্রমাণ করেছে।

কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘও তেহরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানি বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের ঘটনায় ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধের পাশাপাশি দেশটির বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ করা হয় এবং কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ইরানি পণ্য আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং দুই দেশের বাণিজ্যের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা দেন। পরের বছর ইরানের জ্বালানি খাতে নির্দিষ্ট সীমার বেশি বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার আইন পাস করে মার্কিন কংগ্রেস।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপকরণ ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও নিষেধাজ্ঞা দেয়।

২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি—জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ—সই করে। চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতার বিনিময়ে দেশটির ওপর থাকা বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা ছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। একই সঙ্গে তেহরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করা হয়।

২০১৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসিকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে দেশটির পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা খাতসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। এরপর ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেন প্রশাসনও ইরানের বিরুদ্ধে অধিকাংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। গত সেপ্টেম্বরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়।

ফলে কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন অনিশ্চয়তা। ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারির পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কতটা অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকবে এবং একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখবে—এখন সেটিই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!