
ছবি :সংগৃহীত
হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে বরফ, হিমবাহ ও গলিত পানির পরিস্থিতি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অস্থিতিশীলতা নেপালসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে নতুন ধরনের ভয়াবহ দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট নেপালে সংঘটিত ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
ওই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ভাটির দিকে চিতওয়ান পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে জানা গেছে, এবারের বন্যার সূত্রপাত কোনো প্রচলিত হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ থেকে হয়নি। লেন্ডে উপত্যকার প্রায় ৫ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় একটি বিশাল হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ধসে পড়া বরফ ও পাথরের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি ঘনমিটার হতে পারে। বিপুল এই বরফ-পাথর উপত্যকার নিচে আছড়ে পড়ে পানি, পলি ও বড় বড় শিলাখণ্ড প্রবল গতিতে ভাটির দিকে ঠেলে দেয়। স্যাটেলাইট চিত্র এবং ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্যও হিমবাহ ধসের ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গবেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দীর্ঘদিনের ঢাল অস্থিতিশীলতা এবং টেকটোনিক কার্যক্রম এই বিপর্যয়ের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। একই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়েছিল।
ঘটনার দুই দিন পর ধসে পড়া বরফ ও পাথরের স্তূপে তৈরি নতুন একটি ধ্বংসাবশেষ-বাঁধযুক্ত হ্রদ উপচে পড়তে শুরু করে। এতে সাময়িকভাবে উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। পাশাপাশি ভাটির বিভিন্ন জনপদের জন্য নতুন করে সতর্কতা জারি করা হয়।
জিএলওএফ থেকে ভিন্ন ধরনের বন্যা
হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফ সাধারণত মোরেইন কিংবা হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ঘটে। তুষার, বরফ বা শিলাধস হ্রদে পড়ে বড় ঢেউ সৃষ্টি করলেও বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। আবার বাঁধের ভেতরের বরফ গলে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত পানির চাপে সেটি দুর্বল হয়ে পড়ার ঘটনাও রয়েছে।
তবে ২৬ আগস্টের বিপর্যয় ছিল ভিন্ন ধরনের। এখানে প্রথমে কোনো হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভাঙেনি। বরং বিশাল একটি হিমবাহ সরাসরি পাহাড় থেকে ধসে উপত্যকায় পড়ায় বন্যার ঢেউ তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ঘটনাকে ‘গ্লেসিয়ার কলাপস ফ্লাড’ বা হিমবাহ ধসজনিত বন্যা হিসেবে বর্ণনা করছেন।
তবে দুই ধরনের দুর্যোগের পেছনেই উষ্ণায়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে হিমবাহ দ্রুত পাতলা হয়ে যাচ্ছে, বরফের কাঠামো দুর্বল হচ্ছে এবং হিমবাহের কিনারায় গলিত পানির আধার বাড়ছে।
ঝুঁকির তালিকায় ৪৭টি হিমবাহ হ্রদ
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা আইসিআইএমওডির ২০২৩ সালের এক মূল্যায়নে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
নেপালকে কেন্দ্র করে পরিচালিত যৌথ মূল্যায়নে কোশী, গণ্ডকী ও কর্ণালী অববাহিকার ৪৭টি হিমবাহ হ্রদকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি নেপালে, ২৫টি তিব্বতে এবং একটি ভারতে অবস্থিত।
তবে নেপালে হিমবাহ হ্রদের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। বিভিন্ন জরিপে দেশটিতে প্রায় ২ হাজার ৭০ থেকে ৩ হাজার হিমবাহ হ্রদের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে ৪৭টি হ্রদের তালিকাটি দেশের সব হিমবাহ হ্রদের হিসাব নয়; বরং অগ্রাধিকারভিত্তিতে চিহ্নিত সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের তালিকা।
নেপালের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হলো, দেশটির বহু নদীর উৎস তিব্বতে। ফলে নেপালের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন অনেক হিমবাহ হ্রদই দেশটির সীমানার বাইরে অবস্থিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালের পর দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত ও চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যার পুনরাবৃত্তি বেড়েছে।
উষ্ণায়নের সঙ্গে বাড়ছে নতুন হ্রদের সংখ্যা
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ যে হারে বরফ হারাচ্ছে, তুষারপাত সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। ফলে হিমবাহ দ্রুত পিছু হটছে। পেছনে রয়ে যাওয়া পাথর, মাটি ও বরফের স্তূপ প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করছে। এসব বাঁধের পেছনে জমতে থাকা গলিত পানি ধীরে ধীরে বড় হ্রদে রূপ নিচ্ছে।
এভারেস্ট অঞ্চলের ইমজা সো এবং মানাসলু এলাকার থুলাগি হ্রদ এ ধরনের পরিবর্তনের উদাহরণ। ঝুঁকি বাড়ছে মূলত দুই দিক থেকে—একদিকে হ্রদে পানির পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে আশপাশের ঢাল, পারমাফ্রস্ট ও ঝুলন্ত হিমবাহ ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে।
এর ফলে তুষারধস, ভূমিধস কিংবা বরফধস হ্রদে পড়ে আকস্মিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা বড় ধরনের বন্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
সাম্প্রতিক বন্যা নেপালের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। ভোতে কোশী ও সিয়াব্রুবেসীতে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় নদী পরিমাপ কেন্দ্রগুলো দ্রুত বাড়তে থাকা নদীর পানি শনাক্ত করে সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু এবারের ঘটনায় সতর্কবার্তা পাঠানোর আগেই বন্যার তোড়ে কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেপালের ভূখণ্ডে প্রবেশের কয়েক মিনিটের মধ্যেই বন্যার ঢেউ সিয়াব্রুবেসীতে পৌঁছে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর গেজগুলো সচল থাকলেও এত অল্প সময়ে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হতো। কারণ বর্তমান সতর্কীকরণ ব্যবস্থা মূলত ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা বর্ষাকালীন বন্যার জন্য পরিকল্পিত। আকস্মিক হিমবাহ ধস, তুষারধস কিংবা নতুন ধ্বংসাবশেষ-বাঁধ সৃষ্টি হয়ে সৃষ্ট বন্যা শনাক্তের জন্য এ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
সীমান্তের ওপারের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ
নেপালের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তিব্বতের হিমবাহ ও হ্রদসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া। নেপাল ও চীন সীমান্তে অবস্থিত মাত্র একটি হিমবাহ হ্রদ—সিরেনম্যাকো—দুই দেশ যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
অথচ নেপালের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বহু হিমবাহ হ্রদ তিব্বতের ভেতরে অবস্থিত। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাসুয়াগড়ি বিপর্যয়ের পর ভোতে কোশীর উৎস অঞ্চলের হিমবাহ হ্রদ নিয়ে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময়ের জন্য নেপাল অনুরোধ জানায়।
২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও প্রয়োজনীয় চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য এখনো আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট নেই বলে চীনা পক্ষ জানিয়েছে।
চার ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদগুলোর পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে কমানো এবং প্রয়োজন হলে কার্যকর নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে আকস্মিক হিমবাহ ধস, তুষারধস এবং ধ্বংসাবশেষজনিত বন্যা দ্রুত শনাক্তে পৃথক পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।
তিব্বতের হিমবাহ ও হ্রদগুলোর রিয়েল-টাইম তথ্য নেপালের সঙ্গে বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি উচ্চঝুঁকির নদী উপত্যকাগুলোতে নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক এবং বসতি নির্মাণের নীতিমালা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, হিমবাহ কিংবা হিমবাহ হ্রদসংক্রান্ত সব ধরনের ঝুঁকি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর উপস্থিতি কমিয়ে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।


