বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান-এ ‘লোক’ শব্দের যেসব অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে তা যথাক্রমে মানুষ, জনসাধারণ, একই ঐতিহ্যের ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়, folk, পৌরাণিকশাস্ত্র মতে স্বর্গ মর্ত্য ও পাতালের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিলোক, ভুবন, জগৎ, বিশ্ব, সপ্ত ভুবন (ভূঃ ভুবঃ স্বঃ মহঃ জনঃ তপঃ এবং সত্য), পরিচারক, মজুর।১ ফোকলোরের ক্ষেত্রে লোক বলতে একই ঐতিহ্যের ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কেই বোঝায়। ব্যতিক্রম ছাড়া এরূপ সমাজে সাধারণত শোষণ-বঞ্চনার ফলে কিংবা সমাজ-রাষ্ট্রের অযত্নের ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসর থাকতে দেখা যায়। ড. মানস মজুমদার ‘লোক’-এর সংজ্ঞায় বলেন,
‘লোক’ বলতে কোনো একজন মানুষকে বোঝায় না, বোঝায় এমন একদল মানুষকে যারা সংহত একটি সমাজের বাসিন্দা। অর্থাৎ নির্দিষ্ট একটি ভূ-খণ্ডে তারা বসবাস করে, তাদের আর্থিক কাঠামো একই রকম, জন্ম থেকে মৃত্যু এবং বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকলে একই ধরনের বিশ্বাস-সংস্কার, আচার-আচরণ, প্রথা-পদ্ধতি, উৎসব-অনুষ্ঠান পালন করে থাকে।’২
‘চর্যা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অনুষ্ঠান, আচরণ, ব্রত, বৈধ কার্যানুষ্ঠান। লোক+চর্যা=লোকচর্যা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ধর্মাচরণই লোকচর্যা। ‘ডণ্ডনাটো’ উড়িয়া ভাষার একটি শব্দ যার প্রচলিত বাংলা অর্থ ডণ্ডনাটক। আলোচ্য প্রবন্ধে ডণ্ডনাটো বলতে দণ্ডব্রত, দণ্ডপূজা, দণ্ডোৎসব, দণ্ডযাত্রা অর্থাৎ ডণ্ডব্রতের সাথে সম্পর্কযুক্ত সার্বিক অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। লোকসংস্কৃতির এই আলোচনায় চা বাগানের উড়িয়া ভাষা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ডণ্ডোৎসবের কল্যাণকর দিক খোঁজা হয়েছে।
কোনো জাতির ঐতিহ্যে যা কিছু কল্যাণকর উপাদান আছে, সংস্কৃতির কাজ হলো তা সংগ্রহ করে আত্মস্থ করে নেওয়া। এই সংগ্রহকে নিজের ভাণ্ডারে সঞ্চয় করে রাখা। কেন সঞ্চয় করা? বিশ্বমানবের মনের খোরাক সরবরাহ করার জন্য। তার আনন্দবিধানের জন্য।৩
স্বাভাবিক জীবনাচারের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কৃতিগুলো সরল ও সুন্দর। সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, জটিলতা নেই- আছে শুধু নীতি আর বিশ্বাস। অর্থনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত এই বিশ্বাসকে টলাতে পারে না। লোকসমাজের ধর্ম ও আধ্যাত্ম চিন্তা কোনো কালেই কম ছিল না। নীরবে নিভৃতে আধ্যাত্ম চিন্তা যেমন কাজ করে তেমনি তার আচরণিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে কোনো না কোনো উৎসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। যুগ যুগ ধরে মানুষ উৎসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জীবনকে উপভোগ করার চেষ্টা করে আসছে। অনুষ্ঠান যারা আয়োজন করেন তারা যেমন আনন্দিত হন তেমনি তাদের মাধ্যমে সমাজস্থ লোকজনও আনন্দ উপভোগ করেন। বহু জাতি, বহু ধর্মী, বহু সম্প্রদায় ও বহু ভাষাভাষীর ভারতবর্ষ সুদূর অতীতকাল থেকে বহু সংস্কৃতির জন্ম দিয়ে এসেছে। অনেক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়েছে, অনেক সংস্কৃতি টিকে আছে। বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে উড়িয়া ভাষা সম্প্রদায় হচ্ছে এমন একটা জনগোষ্ঠী- যাদের আদি বাসস্থান উড়িষ্যা প্রদেশ এবং যাদের রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই ভাষা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় উৎসব হচ্ছে ডণ্ডপূজা। এটা এমন এক অনুষ্ঠান যেখানে আছে কঠোর তপস্যার মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছার দৃঢ়তা।
‘ডণ্ড’ শব্দটি ‘দণ্ড’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ- যার আভিধানিক অর্থ শাস্তি। ভক্তগণ ভজনে-ভোজনে যে উপাসনা পদ্ধতি অবলম্বন করেন তাতে প্রচুর ক্লেশ সহ্য করতে হয়। নিজেকে নিজে শাস্তি দিয়ে আরাধ্য দেব-দেবীর মন জয় করে বরপ্রাপ্ত হওয়ার জন্যই কঠোর সাধনা। ডণ্ডপূজা মূলত শিব ও কালীর পূজা। ডণ্ডপূজা উড়িষ্যায় ঝামুজাতা, পটুয়াজাতা নামেও পরিচিত। কটক ও পুরী জেলায় এটি ঝামুজাতা নামে বেশি পরিচিত।
ডণ্ডপূজার উৎপত্তি হয় প্রাচীন কলিঙ্গ রাজ্যে। অষ্টম ও নবম শতকে উড়িষ্যায় বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয় শুরু হলে প্রাকৃতজনের মধ্যে তন্ত্রবাদের চর্চা এবং শৈবধর্মের বিস্তার হয়। তখন লোকজন শিবের পূজার্চনা শুরু করেন, বছরে একবার ডণ্ডনাচের আয়োজন করে উৎসবে মেতে ওঠেন। এভাবেই ডণ্ডপূজা ও ডণ্ডনাচের প্রচলন হয়। ১৫৬৮ খ্রিষ্টাব্দে রচিত ‘অভিনব চন্দ্রিকা’ গ্রন্থেও দণ্ডযাত্রার কথা উল্লেখ আছে। অনুমান করা যায়, সেই সময়েও ডণ্ডপূজা ও ডণ্ডনাচ জনপ্রিয় ছিল।৪
ডণ্ডপূজা ও ডণ্ডনাচ উড়িষ্যার গঞ্জাম, পুরী, বালাঙ্গীর, সম্বলপুর, ফুলবনি, ঢেঙ্কানাল প্রভৃতি এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়।৫ ব্রিটিশ আমলে উড়িষ্যা থেকে যারা চা বাগানে অভিবাসিত হয় তারাই মূলত বাংলাদেশে ডণ্ডপূজার ধারক ও বাহক।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত কালীঘাট চা-বাগানের ১০ নং লাইনে একটি মন্দির আছে। শ্রীশ্রী দক্ষিণা কালী মন্দির। এই মন্দিরে ডণ্ডপূজা হয়। ডণ্ডপূজায় কোনো ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয় না। উপাসকদের মধ্য থেকে অভিজ্ঞ একজন পৌরহিত্যের দায়িত্ব পালন করেন- যাকে উড়িয়া ভাষায় বলা হয় ‘জানি’। সেবায়েত মকরো তাঁতীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান নবনির্মিত মন্দির স্থলে একটা কুঁড়েঘরের মতো মন্দির স্থাপিত হয়েছিল। কালীঘাট চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলা থেকে আগত শাইবা তাঁতী নামে একজন ডণ্ডুয়া ডণ্ডপূজার প্রতীক ’চওরা’ নিয়ে আসেন। ‘চওরা’ হচ্ছে ত্রিভুজাকৃতির পরপর সংযুক্ত তিনটা শিলাপাথর। দেখতে অনেকটা মন্দিরের মতো চূড়াবিশিষ্ট। ‘জানি’র ভাষ্য মতে, শুরুর দিকে ‘চওরা’ ক্ষুদ্রাকৃতির ছিল। ধীরে ধীরে এটি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমান আকার ধারণ করেছে। ‘চওরা’ (শিলাখণ্ড)স্থাপনের পর থেকে কোনোদিন পূজা বন্ধ হয়নি। তারই পরম্পরায় এখন মকরো তাঁতী ও ভুবন তাঁতী এই মন্দিরের ‘জানি’ বা পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করছেন। ‘চওরা’র পাশাপাশি শিবলিঙ্গ স্থাপিত হয়েছে। মন্দিরে নিয়মিত পূজা হয়। শনি-মঙ্গলবারে ভক্তবৃন্দের সমাগম বেশি হয়। অনেকে মানত করেন। জনশ্রুতি আছে, এটা জাগ্রত মন্দির এবং এখানে মানত করলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। এই মন্দিরে চৈত্রমাসের অমাবস্যার তৃতীয়া তিথিতে ডণ্ডব্রত উৎসব শুরু হয় এবং পূর্ণিমাতে শেষ হয়। নারী-পুরুষ সকলেই এই ব্রত পালন করতে পারেন। নারীরা সাধারণত গৃহে থেকেই ব্রত পালন করেন। পুরুষদের মধ্যে যারা ব্রত পালন করতে মনস্থ করেন তাদেরকে মন্দিরে তেরোদিন অবস্থান করতে হয়। এই সময় ডণ্ডুয়ারা নারী সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেন। ব্রতের নিয়ম কঠোর। ডণ্ডব্রতের নিয়ম পালনে সামান্য ত্রুটি হলেই দণ্ড বা শাস্তি ভোগ করতে হয়। (ভক্তদের বিশ্বাস) স্বয়ং কালী এই দণ্ড প্রদান করেন। এজন্যই এর নাম ডণ্ডব্রত বা ডণ্ডপূজা।৬
যিনি ডণ্ডব্রত পালন করেন তাকে বলা হয় ডণ্ডুয়া। ডণ্ডুয়ারা প্রথমে নির্দিষ্ট দিনে মন্দিরে গিয়ে জানি বা পুরোহিতের মাধ্যমে দেবী কালীর নামে পৈতা ধারণ করেন। পৈতা ধারণের পর ব্রতধারী ব্রত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজ গৃহে যেতে পারেন না। তেরোদিন মন্দিরে অবস্থান করে কৃচ্ছ্রসাধন প্রক্রিয়ায় শুদ্ধভাবে একাগ্রচিত্তে সাধন-ভজনে দেবী কালীর গুণকীর্তন করেন।৭
দিনের বেলা একটা নির্দিষ্ট সময়ে ধূলিডণ্ড প্রদর্শন করেন। এরপর নির্দিষ্ট জলাধারে গিয়ে স্নান করেন। পূজা ও জলপান করে অর্ধরাত্র থেকে ডণ্ডনাচ প্রদর্শন করেন। ডণ্ডনাচ হচ্ছে শিব ও কালীর উপাসনা উপলক্ষ্যে প্রদর্শিত নাচ, গান এবং শারীরিক ক্লেশ-কসরতের সমন্বিত তপস্যা। ডণ্ডনাচের কতগুলো নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্র আছে। এগুলো যথাক্রমে-বীণাবাড়ি, ঢোল, ঢোলকি, ঘণ্টা, ঝান, বড় কর্তাল, হারমোনিয়াম, মোরলী বাঁশি, শিঙ্গা এবং ডমরু। বীণাবাড়ি বাজিয়ে অনুষ্ঠান শুরু ও শেষ করতে হয়। ব্রতধারীগণ লালসালু পরিধান করেন। ডণ্ডনাচে কেবল পুরুষরাই অংশগ্রহণ করতে পারেন।
ডণ্ডনাচ চারটি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে বন্দনা (সকাল বেলার প্রার্থনা), দ্বিতীয় পর্বে ধূলিডণ্ড (মধ্যাহ্নে), তৃতীয় পর্বে জলডণ্ড (অপরাহ্ণে), চতুর্থ পর্বে অগ্নিডণ্ড (মধ্যরাতে)।৮ ডণ্ডপূজার পর্বভিত্তিক প্রচুর গান আছে। এই পূজার আচার-অনুষ্ঠানগুলোও সর্বত্র একই রকম অনুষ্ঠিত হয় না। এলাকাভেদে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ-এ একটি মন্দির আছে— ‘শ্রী শ্রী দণ্ড কালী মন্দির’। মন্দিরকে বলা হয় কামনা ঘর। অনুষ্ঠানের শুরুতে বন্দনা করতে হয়। উড়িয়া ভাষায় কামনা ঘর বন্দনার একটি গান নিম্নরূপ:
প্রভারে বন্দিলী প্রভা দেবীকী
(ত্রিসুল্লে) বন্দিলী হরগৌরী কী
কল্লসে বন্দিলী মাতা কাল্লী কী
যাহার এই (উছুব)
যেতে (অছন্তী) সবা মধ্যর ॥৯
(ভাবানুবাদ: চিত্রে বন্দনা করি প্রভা দেবীকে, ত্রিশূলে বন্দনা করি হরগৌরীকে, ঘটে বন্দনা করি মাতা কালীকে, যার জন্য এই উৎসব এবং এই আসরে যত জন আছেন সবাইকে বন্দনা করি।)
ধূলিডণ্ড: প্রখর রৌদ্রে ধূলায় গড়াগড়ি দিয়ে নিজে কষ্টভোগ করে তপস্যা করার নাম ধূলিডণ্ড। এই সময় ডণ্ডুয়ারা অভিনয়ের মাধ্যমে কৃষি-শিল্প প্রদর্শন করেন। জমি আবাদ করে ফসল উৎপাদন, তৈল উৎপাদন, হলুদ পেষন, দেবীকে স্নান করানোর জন্য একটা কূপ খনন, দেবী সেই কূপে নেমে স্নান করার জন্য সিঁড়ি নির্মাণ করেন। ডণ্ডুয়ারা তখন পৈঠা বা সিঁড়ির মতো উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকেন এবং সেই মানব সিঁড়ির উপর অর্থাৎ ডণ্ডুয়াদের পিঠের উপর দিয়ে দেবীরূপী জানি (পুরোহিত) এবং ডণ্ডুয়াগণ হেঁটে হেঁটে কূপে নেমে স্নান করেন। অভিনয়ের এই দৃশ্য উপভোগের জন্য প্রচুর দর্শক সমবেত হন। ধূলিডণ্ড পর্বের ‘দুয়ার বন্নী গীত’ নিম্নরূপ:
‘কৃপা সাগর লোকনাথ হে কৃত্তিবাসী দিগম্বর
করিচ বিজয় অমুক গ্রামরে যো বন্দুচি তুম্ভ পয়র।
খেল্লশ রাগরে কাল্লীকা সংহঁরে তেরো ভক্তঘেনী সঙ্গে
খিতি ফেড়ুঅছ এই ধরাধামে যে কামনা লোকংক দারে।
গান্নি তেরোদিন প্রতি সাল্ল চৈত্ররে
গ্রামে গ্রামে হয়ি যাতরা লাগাইচ কামনা দণ্ড উভারে।
ঘটন্ন করিন্ন বাটরু বরিন্ন দণ্ড নাটুয়াকু নেব
ঘটকু বসাই আল্লতি লগাই যে জল্ল খিয়া তাংকু দিব।
উছুরেরে আন্নি খরা বল্লে জান্নি ভঙ্গাইবো ধুল্লী দণ্ড।
অর্ধ রাত্রি ঠারু নাট লগাইব যে সকল্ল দুরিত খণ্ড।
চিতকু দেইন্ন, কহু অছি শুন্ন, দুয়ার বরন্ন বিধি
চিকন্নরে ভূমি গোবরে লিপিব যে ফুল চন্দন মণ্ডাই
ছাড়িন্ন চাল্লকু করিন্ন মাপকু
কুড়িয়ে এক আঙ্গুল্ল সচন্দনে তঁহী
অষ্টপদং দল্লগুটি রখিব পঞ্চমনরে।
যতনেরে তঁহী ধানক কুটায়ী
পঞ্চরতত্ন কুম্ভ দেব যদি বা ন মিল্লে
পিতল্ল থাল্লিরে গো মৃত্তিকা সজাই থুইব।
ঝল্লতি নুহুয়ী ঝটতীরে তঁহী
অকাট বন্দর জল্ল করি তার মধ্যে
আন্নি তার মধ্যে যে পকাইব চুত ঢাল্ল।
নিক্ষণ্ন পড়িতা তণ্ডুল্ল নেই নুয়া সবারে রাখিব
মা ভৌন্নিয়ে টেকি বদনক গো
(হুল্লা হুল্লী) শব্দ দৈবো।
টান্নরে মাত মল্লিতা ঘৃত দেই জাল্লি দেব
মা ভৌন্নিয়ে টেকি বদন ক গো
(হুল্লা হুল্লী) শব্দ দেব।
যন্ত্র ন জান্নই মন্ত্র ন জান্নই গীত ন আমই মতে
সাধু সুদ্ধ জন দোষ ন ধরিব যে মহাদেব ভাসে গীতে।১১
শব্দার্থ: বন্নী= বন্দনা, তুম্ব= তোমার, পয়র=চরণ, খেল্লশ= খেলাধূলা, কাল্লীকা সংহঁরে=কালী দেবীর সাথে, খিতি ফেড়–অছ=মানতকারীর আতিথ্য গ্রহণ করেছি, বাটরু= রাস্তা থেকে, চিতকু= চিত্তে, আল্লতি=আরতি, অর্ধ রাত্রি ঠারু= অর্ধ রাত্রি থেকে, চিকন্নরে=সুন্দর করে, কুম্ভ=ঘট, ঝল্লতি=বিলম্ব, নিক্ষণœ=নতুন, মা ভৌন্নিয়ে=মা-বোনে, টেকি বদন= ঊর্ধ্বমুখী হয়ে।

ছবি: ধূলিদণ্ড পর্ব, পারকুল নাট্য সংস্থা, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ।
জলডণ্ড বা স্বপ্নডণ্ড: জলডণ্ডের অপর নাম স্বপ্নডণ্ড। পূজার আগের দিন ডণ্ডুয়ারা কামনা মন্দিরে নিশি পালন করেন। এখানে তান্ত্রিকভাবে কিছু বিধি পালন করা হয়। ডণ্ডুয়াদের ভাষ্য মতে, জানি তখন স্বপাদিষ্ট হন। অর্থাৎ জলডণ্ড বিধি পালনের জন্য কোন জলাধারের কাছে যেতে হবে তা তিনি স্বপ্নে অবগত হন। তারপর ব্রহ্মমুহূর্তে জানি সকল ডণ্ডুয়াকে নিয়ে নির্দিষ্ট জলাধারের নিকটে উপনীত হন। সেখানে দেবী কালী কোনো একজন ডণ্ডুয়ার ওপর ভর করেন। যার ওপর দেবী ভর করেন তাকে বলা হয় কালসী। কালসী তখন জানিকে ডণ্ডপূজা আহ্বান করার জন্য নির্দেশ দেন। জানি তখন ডণ্ডপূজার আহ্বান করেন। জনৈক ডণ্ডুয়ার ভাষ্যমতে ঠিক এই সময় বৃষ্টি হয় । বেশি না হলেও অল্প হয়। ডণ্ডুয়ারা এই সময় বৃষ্টির জলে ভিজেন বলে এর নাম জলডণ্ড। আবার এই পর্বে জানি স্বপ্নাদিষ্ট হন বলে এর অপর নাম স্বপ্নডণ্ড। জলের নিকট থেকে জানি তখন ডণ্ডুয়াদেরকে নিয়ে দেবী কালীর প্রতীক সহ গীতবাদ্য করে সারা গ্রাম পরিক্রমা করেন। সেই সময় স্লোগান দেন, “কৈলাস স্কন্দরো জাগো নিদ্রা ভাঙ্গো হে- সাবধান মণি-মা, বানাবরহে শিবশঙ্করো হে।” অর্থাৎ, গ্রামবাসী জাগো, নিদ্রা ভঙ্গ করো, মণি-মা আসছেন, ভূত-প্রেত-রোগ-ব্যাধি সহ সকল অপশক্তি সাবধান হয়ে যাও— মহাদেবের জয় হোক।

ছবি: অগ্নিদণ্ড পর্ব, পারকুল দণ্ড নাট্য সংস্থা, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ।
অগ্নিডণ্ড: ডণ্ডপূজার যে পর্বে আগুন নিয়ে সাধনা করা হয় তাকে অগ্নিডণ্ড বলে। আধুনিক কোনো প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া অগ্নিডণ্ডের অগ্নি উৎপাদন করতে হয়। অর্থাৎ, প্রাচীন পদ্ধতিতে বেতের ছড়িতে বেত ঘঁষে ঘঁষে আগুন প্রজ্জ্বলন করতে হয়। এভাবে আগুন ধরানো কঠিন কাজ। খড়ের বেণি বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে পূজা চলাকালীন সময় পর্যন্ত আগুন সংরক্ষণ করতে হয়। এ পর্বে জ্বলন্ত কয়লার ওপর হাঁটা এবং মশালের আগুন নিয়ে নৃত্য প্রদর্শিত হয়।
ডণ্ডযাত্রা: ডণ্ডপূজার প্রধান আকর্ষণ ডণ্ডযাত্রা। এটি রাতের বেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পৌরাণিক কাহিনির কোনো একটা অংশ পরিবেশন করা হয়। ডণ্ডুয়ারা এখানে অভিনয় করেন। সকল ডণ্ডুয়া যেহেতু পুরুষ সেহেতু অভিনয়ে নারী চরিত্রের প্রয়োজন হলে ব্রতধারী পুরুষদের মধ্য থেকে কেউ নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। অর্থাৎ কেউ সাজেন কালী, কেউ সাজেন দুর্গা ইত্যাদি। ডণ্ডনাচের লক্ষ্য দর্শকদের মধ্যে ধর্মীয় ভাব জাগানোর পাশাপাশি পবিত্র আনন্দ দান করা। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করা। বর্তমান ডণ্ডুয়াদের পূর্বপুরুষগণ ডণ্ডনাচে ‘দাতাকর্ণ’, ‘মহিরাবণ বধ’, ‘শনি-লক্ষ্মীর বিচার’, ‘রাজা বিক্রমাদিত্য’, ‘সীতা হরণ’, ‘রামের বনবাস’, ‘নয়নমালা’ প্রভৃতি পালা পরিবেশন করতেন। পূর্ববর্তী ডণ্ডুয়ারা (নাট্যশিল্পী) গত হওয়ার পর বর্তমানে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই পালাগুলো অভিনিত হয় না। বর্তমান ডণ্ডুয়ারা যেসব নাট্যপালা মঞ্চস্থ করেন তার কয়েকটি হলো- ‘শীতবসন্ত’, ‘সতী নারীর বনবাস’, ‘রাজা হরিশচন্দ্রের শ্মশান মিলন’, ‘প্রহল্লাদ চরিত্র’, ‘তুলসীর জন্ম’ ইত্যাদি।১৪
বর্তমানে প্রচলিত ডণ্ডনাচের একরাত্রির বিষয়বস্তু১৫ পাঁচটি পর্বে বিভক্ত করে উপস্থাপন করা হয়। পর্বগুলোর শিরোনাম যথাক্রমে ১) হাড়িনৃত্য, ২) প্রভানৃত্য ৩) হরগৌরী নৃত্য ৪) চড়য়া বিরো নৃত্য ৫) পাত্র-সওরা, ভাইধন, কেলা-কেলোন্নী, যোগী-যোগিয়ান্নী নৃত্য।
হাড়িনৃত্য: দণ্ডনাচের প্রধান আকর্ষণ হলো হাড়ি ও হাড়িয়ানীর নাচ। মঞ্চে প্রথমে হাড়ি প্রবেশ করে নৃত্যগীত করে। নৃত্যগীতের মাধ্যমে হাড়ি তার স্ত্রীকে আহ্বান করে। গীতের কথাটি নিম্নরূপ:
আসো লো পুনেইজন
এ সবাকো আসো বহন
বসিচন্তি এ সবাজন লো পুনেইজন
এ সবাকো আসো বহন।
অর্থাৎ,
এসো গো পূর্ণিমার চাঁদ
এসো শীঘ্রকরি
বসে আছেন সভাজন
পূর্ণ সকল আয়োজন
শুরু হবে হাড়িনৃত্য
এসো শীঘ্রকরি।
আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাড়িয়ানী মঞ্চে প্রবেশ করে নৃত্য করে। নৃত্যের এক পর্যায়ে হাড়ি ও হাড়িয়ানীর মধ্যে ঝগড়া লেগে যায়। একজন মধ্যস্থতা করে তাদের বিবাদ মিটায়। উড়িয়া ভাষায় তাকে বলে ‘ভলোলোক’। এই নৃত্যের মাধ্যমে বোঝানো হয় যে স্বামী মদ্যপান করলে সংসারে অশান্তি হয়। তাই কেউ যেন মদ্যপান না করে ও নেশাগ্রস্ত না হয়।
প্রভানৃত্য: দ্বিতীয় পর্যায়ে দুর্গা ও কালীর নৃত্য যাকে প্রভানৃত্য বলা হয়।
হরগৌরীর নৃত্য: তৃতীয় পর্যায়ে শিব ও পার্বতী মঞ্চে প্রবেশ করে নৃত্য করেন। দুজন দুই স্থানে নৃত্যগান করেন। কেউ কাউকে দেখেন না। পার্বতী গানে গানে শিবকে খুঁজেন। একপর্যায়ে শিব-পার্বতীর মিলন হয়। পার্বতী গানের মাধ্যমে শিবকে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি কোথায় ছিলেন। শিব গানের মাধ্যমে বলেন তিনি ভক্তের ডাকে ছুটে গিয়েছিলেন। পার্বতী তখন গানে গানে শিবের কাছে ডণ্ডব্রত সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করেন। শিব প্রশ্নের উত্তর দেন। তারপর শিবভক্ত নন্দী ও ভৃঙ্গী মঞ্চে প্রবেশ করে নৃত্যগীত পরিবেশন করেন। পরের ধাপে দুর্গার সাথে মহিষাসুরের যুদ্ধ হয় এবং দুর্গাপূজার পূর্ণ কাঠামো প্রদর্শিত হয়।
চড়য়া বিরো নৃত্য: দণ্ডব্রতের প্রধান ভক্ত চড়য়া- উড়িয়া ভাষায় যাকে ‘চড়য়া বিরো’ বলা হয়। চড়য়া মঞ্চে প্রবেশ করে নৃত্য প্রদর্শন করেন, গানের মাধ্যমে তার স্ত্রীদেরকে আহ্বান করেন। চড়য়ার দুই স্ত্রী। উড়িয়া ভাষায় তাদের বলা হয় চড়উন্নী। তারা মঞ্চে প্রবেশ করেন, গানে গানে স্বামী-স্ত্রীর বিবাদ হয়, মীমাংসা হয়। তারপর চড়য়া শিবের পূজা করেন এবং তপস্যার মাধ্যমে শিবকে আহ্বান করেন। চড়য়ার আরাধনায় শিব সন্তুষ্ট হয়ে পার্বতীকে নিয়ে তার সম্মুখে প্রকট হন এবং বর চাইতে বলেন। চড়য়া ‘ফাঁস’ নামক একটা অস্ত্র বর প্রার্থনা করেন। শিব ‘নাগফাঁস’ নামক একটা অস্ত্র চড়য়াকে প্রদান করেন। উড়িয়া ভাষায় এই অস্ত্রের নাম ‘চড়য়ানল্ল’। অস্ত্র দান করে শিব চড়য়াকে সতর্ক করে দেন। বলেন যে এই অস্ত্র দিয়ে শুক, সারি, ময়ূর, রাজহংস ও কবুতর এই পাঁচ ধরনের পাখি হত্যা করা নিষেধ। যদি এর মধ্যে ভুলবশত কোনো একটা পাখি হত্যা করা হয় তাহলে চড়য়া সর্পদংশনে মারা যাবেন। চড়য়া বর পেয়ে ‘নাগফাঁস’ অস্ত্র নিয়ে বনে শিকার করতে চলে যান। শিকার করতে করতে একসময় শিবের সতর্কবাণী ভুলে গিয়ে একটা শুকপাখি ও একটা কবুতর শিকার করে ফেলেন। তাতে শিব প্রকুপিত হন। এইসময় দুইজন সাপুড়িয়া আসেন। তাদের সাথে বিবাদ হয়। সাপুড়িয়া ক্ষুব্ধ হয়ে একটি সাপ ছেড়ে দেয়। সাপ চড়য়াকে দংশন করে। চড়য়া মাটিতে ঢলে পড়েন। এই মুহূর্তে মঞ্চে প্রবেশ করেন চড়য়ার ভাই উধবপাত্র। তিনি নাচগান করেন। এদিকে চড়য়ার দুই স্ত্রী তাকে খুঁজতে খুঁজতে বনের ভেতর প্রবেশ করে দেখে তাদের স্বামী মৃত অবস্থায় মাটিয়ে পড়ে আছেন। তখন তারা তাদের দেবর উধবপাত্রকে একজন বৈদ্য ডেকে আনতে বলেন। উধবপাত্র বৈদ্য আনেন কিন্তু চড়য়াকে বাঁচাতে পারেন না। বৈদ্য যাবার সময় বলে যান যে আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তোমরা তোমাদের ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করো। তখন চড়য়ার স্ত্রীগণ কেঁদে কেঁদে শিবকে আহ্বান করেন। শিব প্রকট হয়ে কৃপাবশত তাঁর ভক্ত চড়য়াকে বাঁচিয়ে তোলেন।
শেষ ধাপে পাত্র-সওরা, ভাইধন, কেলা-কেলোন্নী, যোগী-যোগিয়ান্নী নামক নৃত্য হয়। সবশেষে বীণ্নাকার এসে বন্দনা করে ডণ্ডনাট সমাপ্ত করেন। ডণ্ডযাত্রার এই বিষয়গুলোতে কতরকম যে লোকশিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। প্রাচীন সংস্কৃতির মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় লক্ষ্য করে অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ তাঁর ‘ভারতীয় সংস্কৃতির গোড়ার কথা’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, “অতি প্রাচীন যুগে আমরা যাত্রা ও কথকতার পরিচয় পাই। এগুলি যে কত বড় শিক্ষার বাহন তাহা আজও ঠিক বোঝা হয় নাই। নিরক্ষর কৃষকের মুখে কত অজানা সাধক কবির যে গান আজও শুনা যায় তাহা দর্শনের গভীরতম মূল তত্ত্বের ব্যাখ্যা। চর্যাচর্য, দেহতত্ত্ব, বাউল, ভাসান, মঙ্গলগান প্রভৃতি সঙ্গীত এ যুগেও কত শত বৎসর ধরিয়া নিরক্ষরদের মধ্যে চলিয়া আসিতেছে। ভারতের বারব্রতও সেই প্রাচীন সংস্কৃতি বহন করিয়া আসিয়াছে। শিক্ষা ও লেখাপড়া এক বস্তু নয়- এ কথাটা যদি একবার উপলব্ধি করিতে পারি তাহা হইলে বুঝিতে পারিব আমাদের নিরক্ষর গ্রামবাসীদের মতো শিক্ষিত গ্রামবাসী পৃথিবীতে আর নাই।”১৬ এই কথাগুলো ডন্ডযাত্রার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।
ডণ্ডুয়াদের ভোজনের নিয়ম: ব্রতধারী ডণ্ডুয়াগণ দিনের বেলা জলখাবার (খই, কলা, গুড়, পানি) এবং রাতের বেলা আতপ চালের ভাত, চানার ডাল, ঘি, কাঁচা মরিচ, লবণ এবং সব্জি ভোজন করেন। ভোগ রান্নার পর দেবীর সামনে ভোগ নিবেদন করা হয়। ভোগ ভাঙানির পর ব্রতধারীগণ একসাথে প্রসাদ ভোজনে বসেন, নিঃশব্দে প্রসাদ সেবা করেন, কেউ কোনো কথা বলতে পারেন না। অর্থাৎ, ভোজনের সময় কথা বলা নিষেধ। ভোজন চলাকালে ব্রতধারী নন এমন একদল ভক্ত উচ্চ শব্দে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে থাকেন। ভোজনের সময় ব্রতধারীর কানে যাতে বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি ছাড়া অন্য কোনো ধ্বনি প্রবেশ করতে না পারে তাই এমন ব্যবস্থা। এ সময় ব্রতধারীর কোনো কিছু প্রয়োজন হলে ইশারা-ইঙ্গিতে বলবে এবং পরিবেশনকারী তা সরবরাহ করবে। যদি কোনো কারণে অন্য শব্দ ব্রতধারী শুনতে পায় তাহলে ভোজন ত্যাগ করে চুপচাপ বসে থাকতে হবে। প্রসাদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত কোনো দ্রব্য (যেমন: ধান, কাঁকড় বা অন্য কিছু) পাওয়া গেলে ভোজন পরিত্যাগ করে চুপচাপ বসে থাকতে হবে। জানি বা পুরোহিতের ভোজন শেষ হলে সবাই একসাথে ভোজনাসন ত্যাগ করবে। ব্রত চলাকালে কোনো প্রকার নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা নিষেধ। কেউ গোপনে পান-সুপারি, বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি গ্রহণ করলেও তার পরিণাম ফল ভয়াবহ হয়। নির্ধারিত খাদ্য তালিকার বাইরে কোনো খাদ্য গ্রহণ করলে ব্রতীর পরিণতি খুব খারাপ হয়। ব্রতীর পরিবারকেও ডণ্ডপূজার নিয়ম নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হয়। নিয়ম পালনে সামান্য ত্রুটি হলেই ভক্তবৃন্দ অলৌকিকভাবেই শাস্তির মুখে পড়ে যান- এটাই ডণ্ডপূজার মাহাত্ম্য।১৭ ভক্তগণ শুদ্ধদেহ শুদ্ধচিত্তে মায়ের কাছে ব্যক্তিগত মঙ্গল এবং সর্বজনীন মঙ্গল কামনা করেন।
এই পূজার শেষ ধাপে মেরু পূজা হয়। মেরু পূজায় বিশেষ ফল আম লাগে। মেরু পূজায় আম নিবেদন না করে বছরের নতুন ফল হিসেবে আম খাওয়া নিষেধ। যারা মানত করেন জানির মাধ্যমে দেবীর পক্ষ থেকে তাদের হাতে একটা করে আম্রফল প্রদান করা হয়। মন্দিরে এসে ভক্তবৃন্দ মানত করেন। যারা মানত করতে চান তারা জানি-র উপস্থিতিতে মানত করেন। কারণ মানতকারীকেও ডণ্ডপূজার নিয়ম পালন করতে হয়। জানি-র উপর কিছু দায়িত্বও বর্তায়। পরবর্তী পূজায় জানি ব্রতীগণ সহ মানতকারীর বাড়িতে পায়ে হেঁটে উপস্থিত হন এবং পূজার কিছু বিধি পালন করেন। মানতকারীর বাড়ি যত দূরেই হোক মন্দির থেকে ভক্তগণ পায়ে হেঁটেই মানতকারীর বাড়িতে উপস্থিত হন।১৮

ছবি: ডণ্ডব্রতের নগরপরিক্রমা।
ডণ্ডপূজার বর্তমান অবস্থা: ডণ্ডপূজার বিধি-বিধান অত্যন্ত কঠোর। এই পূজার্চনা সময় সাপেক্ষ। সকলের পক্ষে এই পূজায় অংগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাই অনেক চা বাগানে উড়িষ্যা সমাজ থাকা সত্ত্বেও ডণ্ডপূজা অনুষ্ঠিত হয় না। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে কালীঘাট চা বাগান (শ্রীমঙ্গল), কেজুরিছড়া চা বাগান (শ্রীমঙ্গল), শমসেরনগর চা বাগান (কমলগঞ্জ), পারকুল চা বাগান (চুনারুঘাট), রেমা চা বাগান (চুনারুঘাট), জগদীশপুর চা বাগান (মাধবপুর), নোয়াপাড়া চা বাগান (মাধবপুর), রশীদপুর চা বাগান (হবিগঞ্জ), ধামাই চা বাগানের দুরবিনটিলা ও কটকটিলা (জুড়ী), শিলঘাট চা বাগানের মুরলীটিলা (জুড়ী), কাপনাপাহাড় চা বাগান (জুড়ী), বীরগোয়ালি চা বাগান (জুড়ী), এলাপুর চা বাগান (জুড়ী), রাজকি চা বাগান (জুড়ী), ফুলতলা চা বাগানের এলভিনটিলা (জুড়ী), সাগরনাল চা বাগান (জুড়ী), পাথারিয়া চা বাগান (বড়লেখা) প্রভৃতি বাগানে ডণ্ডপূজার আয়োজন করা হয়।
ডণ্ডপূজার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য উৎসাহী নতুন প্রজন্মের মধ্যে ডণ্ড নাট্য সংস্থা গড়ে উঠেছে। একটি সংস্থার নাম ‘পারকুল দণ্ড নাট্য সংস্থা’, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সংস্থাটি প্রতিবছর ডণ্ডনাটক মঞ্চস্থ করে। ২০২৩ সালে এটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা-য় ‘শিব-পার্বতীর নৃত্য’ নামে চল্লিশ মিনিটের একটি লোকনৃত্য মঞ্চস্থ করে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
চড়কপূজা ও ডণ্ডপূজা:
বাংলার চড়কপূজার সাথে ডণ্ডপূজার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
সাদৃশ্য: উভয়ক্ষেত্রেই শক্তির সাধনা করা হয়। উভয় অনুষ্ঠানেই পৌরাণিক শিব, কালীর পূজা এবং শিবগৌরী ও কালীর নৃত্য প্রদর্শন করা হয়। পূজা চলাকালীন ভক্তবৃন্দ নিরামিষ আহার করেন। উভয় পূজাতেই তান্ত্রিকতা এবং লৌকিক-অলৌকিক গল্প প্রচলিত আছে।
বৈসাদৃশ্য: উভয় পূজার উপাসনা পদ্ধতি ও পরিবেশনা ভিন্ন। চড়কপূজায় ভক্তদের পিঠে বড়শি বিদ্ধ করে চড়কগাছে চক্কর দেওয়া হয়; কিন্তু ডণ্ডপূজায় তা হয় না। চড়কপূজায় ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয়, ডণ্ডপূজায় ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয় না। চড়কপূজায় নির্দিষ্ট তিথিতে নির্দিষ্ট থলিতে ঘট স্থাপন করে পূজার্চনার পর সংকল্প মতে পাঁচদিন, সাতদিন বা দশদিনের জন্য ভক্তবৃন্দ সন্ন্যাসীর মতো নগর পরিক্রমায় বের হন। ডণ্ডপূজায় ডণ্ডুয়াগণ অলৌকিক নির্দেনার পর তেরোদিনের জন্য ডণ্ডব্রত পালন করেন। চড়কপূজায় নিশাকালে কালীপূজা হয়, রাত দুইটা থেকে চারটার মধ্যে ‘কালীকাচ’ হয়। ডণ্ডপূজায় রাতে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং পৌরাণিক কোনো একটা কাহিনির ওপর নাটক পরিবেশিত হয়। চড়কের দিন চড়কগাছ তোলা, হরগৌরীর পূজা, ভক্তের গায়ে বড়শি গেঁথা, চড়কগাছে চক্কর দেওয়া, নগরভিক্ষা সহ সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা একদিনেই সম্পন্ন হয়। ডণ্ডপূজায় তা অনুসরণ করা হয় না। চড়কপূজার প্রধান চারটি নৃত্যের নাম যথাক্রমে: খড়গনৃত্য, হরগৌরীনৃত্য, কালীনৃত্য ও ভক্তনৃত্য। ডণ্ডপূজার নৃত্য ডণ্ডনাচ বা ডণ্ডনাটা নামেই পরিচিত। তবে ডণ্ডনাচের উপবিভাগও আছে। যেমন: হাড়িনৃত্য, প্রভানৃত্য, হরগৌরী নৃত্য, চড়য়া বিরো নৃত্য, পাত্র-সওরা, ভাইধন, কেলা-কেলোন্নী, যোগী-যোগিয়ান্নী নৃত্য ইত্যাদি। চড়কপূজায় গড়ের ভিতর জ্বলন্ত কয়লার ওপর নৃত্য হয়; ডণ্ডপূজায় অগ্নিডণ্ড পর্বে জলন্ত কয়লার ওপর হাঁটা এবং মশালের আগুন নিয়ে নৃত্য হয়। চড়কপূজায় সাতখানা বলিচ্ছেদের উপর মহাদেবের শয্যা রচনা হয়; ডণ্ডপূজায় এরূপ হয় না। চড়কপূজায় রাতে কালীকাচ হয়; ডণ্ডপূজায় রাতে নাটক পরিবেশিত হয়। চড়কপূজার অনুষ্ঠান দুইদিনব্যাপী; ডণ্ডপূজার অনুষ্ঠান তেরো দিন, আটারো দিন বা একুশ দিনব্যাপী হয়। চড়কপূজায় কালীনৃত্যের একটি গান:
‘আয় আয় কালী গো মা
গাছ তো লামি পূজা খা
ঢুপে আইছো ঢুপে যাও
কালীর বাপর বুকুত রুম
কালীয়ে নাচে ধুধুমধুম।
আয় আয় কালী গো মা
গাছ তো লামি পূজা খা
ঢুপে আইছো ঢুপে যাও॥’১৯
ডণ্ডপূজার গান:
পূর্বদিকে মাতা তারীন্নি বন্দই পশ্চিমেরে হীঙ্গুল্লায়ী
সারড়া গড়রে বিখ্যাত করুচি যে নমস্তে কুন্দুঁন্নী দেই।
ঘুমুসর মুখে বন্দনা করুচি নমস্তে বাঘ্র বাহিনী
শঙ্খচক্র ধরি অছ বিজে করি চৌবর্গ প্রদায়িণী।
অষ্টগড় ঠারে বন্দনা করুচি কনক শ্রীদুর্গা চরন্নে
বরগড় মধ্যে বরাহী বন্দুচি যে তাল্ল সুরী তাল্ল কর্ণে।
বান্নপুর মধ্যে ভগবতি বন্দে নুঁয়া গড়ে বাহুরাই
রন্নপুর মন্নি নাগকু বন্দুচি যে বাকী গড়ে চমকায়ী।
শমলপুরে সামলাই বন্দে কাকটপুরে মঙ্গল্লা
মাল্লদেশে বন্দি ব্রক্ষুণ্নী দেবী কীযে ঝাকুড়ে বন্দে সারল্লা।
বন্দিলী বন্দিলী মু খল্ল ডণ্ডুয়াকু ম ঠারে কর করুণ্না
টল্লী যাউ সর্ব শত্রুংক গর্ব যে মর হর চালন্তে বিন্না।
ভাসিলে আনন্দ কহে কবিচন্দ্র সর্বগীত হেলা সম্পূর্ণ
পার্বতী দেবীংক চরণ্ন সেবারে যে আনন্দরে যাও দিন।২০
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়,
১.ডন্ডব্রত কৃষিজীবী সমাজের একটি উৎসব। এই অনুষ্ঠানে কৃষিশিল্প প্রদর্শন করে কৃষিকাজকে মহিমান্বিত করা হয়।
২.ডণ্ডযাত্রার মাধ্যমে বিভিন্ন নীতি-উপদেশ দেওয়া হয়। ‘ধর্মের জয়-অধর্মের পরাজয়’ ঘোষণা করা হয়।
৩.ক্ষমতা অপপ্রয়োগের ফলে সমাজে যে অনিষ্ট হয় তা বোঝানো হয় এবং তা থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দেওয়া হয়।
৪.ডণ্ডব্রতের পর্বগুলোতে বিভিন্ন নৃত্যশৈলী প্রদর্শন করে আনন্দদান করা হয়। কৃচ্ছ্রসাধন প্রক্রিয়ায় ব্রত পালন করে অল্পে সন্তুষ্ট থাকতে উপদেশ দেওয়া হয়।
৫.জাগতিক কামনা-বাসনায় পরিতুষ্ট হওয়ার জন্য লৌকিক কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে অলৌকিক কর্তৃপক্ষের নিকট প্রার্থনা জানানো হয়।
৬.নিষ্ঠার সাথে কঠোর নিয়ম পালন করে ধৈর্যশিক্ষা দেওয়া হয়।
৭.কঠোর তপস্যার মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছার দৃঢ় মনোভাব তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
৮.বছর বছর ডণ্ডব্রতের আয়োজন করে পুরুষানুক্রমিক ধারা রক্ষা করতে উৎসাহিত করা হয়।
৯.ডণ্ডব্রত আয়োজনের মাধ্যমে সামাজিক সংহতি রক্ষা করা হয়। সর্বোপরি ডণ্ডপূজার মাধ্যমে যে শক্তি সাধনা করা হয় তাতে জ্ঞান-কর্ম-ভক্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে অনুসারীদের প্রাণে নতুন স্পৃহা জাগ্রত করার প্রচেষ্টা থাকে। ডণ্ড পরিক্রমায় গ্রামের পথে পথে মিছিল নিয়ে যে স্লোগানটা দেওয়া হয় (“কৈলাস স্কন্দরো জাগো নিদ্রা ভাঙ্গ হে, সাবধান মণি-মা, বীণাবর হে- শিবশঙ্কর হে।”) তাতে আছে ঘুমন্ত নাগরিককে জাগানো এবং ‘মা-মণি’র দোহাই দিয়ে সমস্ত অপশক্তিকে সাবধান করার প্রচেষ্টা।
১০. ডণ্ডব্রতের দর্শন লোকসমাজে নৈতিকতার চর্চা, শাশ্বত কল্যাণবোধ, যোগসাধনা, শিল্পচর্চা ও সামাজিকতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আদিকাল থেকে একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ডণ্ডপূজা চলে আসছে এবং তার জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রেখেছে। ডণ্ডপূজা একটা নির্দিষ্ট সমাজের ধর্মানুষ্ঠান হলেও এর সংগীত, নৃত্যকলা ও উৎসবের একটা কল্যাণপ্রদ দিক আছে- যা সদা জাগ্রত এবং সর্বজনীন।
তথ্যসূত্র:
- বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, ডিসেম্বর ২০১৮, পৃ. ১২১০।
- ড. মানস মজুমদার, লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি, Directorate of Distance Education, Tripura University, Vikas Publishing House Pvt. Ltd. E-28, Sector-8, Noida-201301 (UP)
- দক্ষিণারঞ্জন বসু, ভূমিকা, সংস্কৃতির ধর্ম, ভারতী বুক স্টল, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলকাতা-৯, জুন ১৯৯১।
- Rabindra Nath Dash, The Folk Dance of Ganjam : Danda Nach, Odisha Review, 2015, P. 82.
- com
- মকরো তাঁতী, পুরোহিত, শ্রী শ্রী দক্ষিণা কালী মন্দির, কালীঘাট চা বাগান, ১০ নং লাইন। বয়স ৬৫, সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৫ এপ্রিল ২০২৪।
- ভুবন তাঁতী, পুরোহিত, শ্রী শ্রী দক্ষিণা কালী মন্দির, কালীঘাট চা বাগান, ১০ নং লাইন। বয়স ৬৫, সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৫ এপ্রিল ২০২৪।
- Rabindra Nath Dash, The Folk Dance of Ganjam : Danda Nach, Odisha Review, 2015, P. 84.
- শ্রীবাস বুনার্জি, দণ্ড কালী মন্দির, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৪ জুন ২০২৪।
- শ্রীবাস বুনার্জি, দণ্ড কালী মন্দির, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ২৪ মে ২০২৪।
- শ্রীবাস বুনার্জি, দণ্ড কালী মন্দির, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৬ জুন ২০২৪।
- বর্তমান লেখক জলডণ্ড পর্বে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। তখন অবশ্য আকাশে মেঘের সাজ ছিল তবে বৃষ্টি হয়নি।ডণ্ডুয়ার ভাষ্য ঠিক হলে তা কাকতালীয় ঘটনা মাত্র।
- অমল বুনার্জি, দণ্ড কালী মন্দির, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ২৪ মে ২০২৪।
- সুবল মাস্টার, দণ্ড কালী মন্দির, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ২৪ মে ২০২৪।
- ডণ্ডনাচের একরাত্রির বর্ণনা দিয়েছেন শ্রীবাস বুনার্জি, দণ্ড কালী মন্দির, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৬ জুন ২০২৪।
- অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, ভারতীয় সংস্কৃতির গোড়ার কথা।
- নরেশ তাঁতী, কালীঘাট চা বাগান, ১০ নং লাইন। বয়স: ৫০, সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৫ এপ্রিল ২০২৪।
- চেমন তাঁতী, কালীঘাট চা বাগান, ১০ নং লাইন। বয়স: ৬০, সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৫ এপ্রিল ২০২৪।
- জগেশ কর, বয়স: ৮০, গ্রাম: ধর্মপুর, উপজেলা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলভীবাজার। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৩ জুন ২০২৪।
- লিটন বুনার্জি, দণ্ড কালী মন্দির, পারকুল চা বাগান, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৬ জুন ২০২৪।
দীপংকর শীল : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, কমলগঞ্জ সরকারি গণমহাবিদ্যালয়, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার।



