শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২২ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কবি ও কবিতা : মোহাম্মদ মিজানুর রহমান



কবি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে একজন সব্যসাচী লেখক গল্পকার, প্রবন্ধকার  কবি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। যাঁর লেখার ধারায় রয়েছে স্বদেশ প্রেম, মানবতাবোধ, আধ্যাত্বিকতা,   বিশুদ্ধ ভালোবাসা ও শুদ্ধ প্রেমের আকুতি সহ বিভিন্ন আঙ্গিকের ধ্যান ধারণা। যার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই তাঁর সব লেখালেখির ছত্রে ছত্রে ও অনুচ্ছেদে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে আপোষহীন, তারুণ্যের শক্তিতে বিশ্বাসী খ্যাতিমান এই কবি চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলাধীন অলিনগর গ্রামে ২৯শে মার্চ ১৯৫৬ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জান্নাতবাসী পিতার নাম  আলী আহমদ ভূঁইয়া ও জান্নাতবাসী মাতার নাম মাহমুদা খাতুন খোন্দকার এবং তার সহধর্মিণীর নাম মিসেস নিলুফার আক্তার।  তিনি এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের জনক। কর্মসূত্রে তিনি পরিবার সহ দীর্ঘদিন যাবত ঢাকার মিরপুরে বসবাস করছেন।

অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী কবি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান শিক্ষাজীবনে লেখাপড়া করেছেন অলিনগর আমজাদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, গহিরা প্রাথমিক বিদ্যালয়, গহিরা এজেওয়াইএমএস উচ্চবিদ্যালয়, ধুমঘাট এইচসিএম উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন সরকারী উন্নয়ন প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসাবে কাজ করে আসছেন।

লেখালেখির জগতে দীর্ঘদিন ধরে বিচরণ করছেন তাঁর। তিনি প্রধানতঃ কবিতা লিখলেও ছড়া, প্রবন্ধ ও উ্পন্যাস ইত্যাদি রচনাতেও সমান দক্ষতার পরিচয় রেখে চলেছেন। ছাত্রজীবনে তিনি  নিজ গ্রামের ঝংকার ক্লাবের  সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং গহিরা এজেওয়াইএমএস উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের পাঠাগার সস্পাদক হিসেবে ছিলেন ১৯৭২-৭৩ সালে। বর্তমানে সোসাইটি ফর ইকোনমিক এণ্ড বেসিক এডভান্সমেন্ট ( সেবা)/ এনজিও এর সদস্য হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। সাহিত্য জগতে তিনি গাঙচিল ঢাকা জেলা শাখার সহ সভাপতি হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বরত আছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে
১) অনুভব ( কাব্য)
২) জেণ্ডার ইস্যু ও নারীর ক্ষমতায়ন ( প্রবন্ধ সংকলন)

এছাড়াও তার অসংখ্য প্রকাশিতব্য গ্রন্থ বা পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত রয়েছে। যেমন –
* উপন্যাস :
১) স্বাধীনতার স্বরলিপি ( মুক্তিযুদ্ধ)
২) কনক প্রদীপ আলো ( প্রেম ও সামাজিক সচেতনতা)
৩) বক্কিল কন্যার দেশে ( রূপকথা)
* কাব্যগ্রন্থ:
১) শ্বাশত উপলব্ধি ২) স্বাধীনতার স্বরলিপি ৩) চেতনার দাবানল ৪) চেতনা বহ্নিমান ৫) বিজয়ের পংক্তিমালা ৬) অমর কাব্যের কবি ৭)  শোকের পংক্তিমালা ৮)অরুণ আলোর গান ৯) ভালোবাসার জয়গান ১০) সাধু তুমি ভালোবাসা
১১) স্বপ্নের গোলাপ তুমি ১২) সত্য-সুন্দর ১৩) বৃত্তবন্দী জীবনের গল্প ১৪) বোধের দেয়ালে রক্ততরঙ্গ ১৫) কষ্টের অক্টোপাস ১৬) অন্তর্জালে উত্তেজনা ১৭) অবরুদ্ধ যাতনা ১৮) চৈতন্যের যাযাবর মন ১৯) অনুভবের আয়নায় ২০) বিষাদ রাঙা জীবন

*প্রবন্ধ সংকলনঃ ১) উন্নয়ন,গরীবের ক্ষমতায়ন ও কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা
* ছড়ারগ্রন্থ: ১) রঙ্গ কথন
* শিশুতোষ গ্রন্থ:  ১) ছড়ায় ছড়ায় লেখাপড়া

কবি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের কয়েকটি কবিতা:

মা তুমি নেই বলে

মা তুমি নেই বলে
এখনঃ
অজস্র স্মৃতি কথা ঝরে পরে আমার হৃদয়ের
কার্নিশ বেয়ে। মনে হয় নৈশব্দের জালে জড়িয়ে
গেছে আমার জীবন পৃথিবী, থেমে গেছে
জীবনের কোলাহল।
মা তুমি নেই বলে
এখনঃ
আমার সমুখে শুধু ধুসর সময়কাল। রাশি রাশি
ব্যথা আর বুকের যত ক্ষত- সব কিছু মিলে একাকী
এভাবেই কাটছে আমার এক একটি দুঃখময় কষ্টের
রাত, এক একটি ধুসর সময় প্রহর। মাগো! তব মৃত্যুর
নীরবতা ‘এই মোর’ বুকে এঁকে দিয়ে গেলো বুঝিবা-
এক মর্মন্তুদ বেদনার স্বাক্ষর!
মা তুমি নেই বলে
মহাজগতের সকল অন্ধকার যেন হুমড়ি খেয়ে
পড়ছে আমার সমুখে। মাগো! ‘এই আমি’ তবুও দিনভর
সযত্নে কুড়িয়ে বেড়াই তোমার- আমার স্মৃতি কথা
সব। স্মৃতির সাগরে ভেসে ‘এই আমি’ এখনঃ
ভিজে চুপসে হই একাকার!
মা তুমি নেই বলে
পূর্ণিমার রাতে দূর পাহাড়ের
আড়াল থেকে ধীরে ধীরে
জেগে উঠা চাঁদও
আমার মনের ধূসরতা
কাটাতে পারেনাঃ
একটু আদৌ।
মা তুমি নেই বলে
দখিনা হাওয়ায় ভেসে বসন্তের নতুন
পাতারা যখন আনন্দে নাচে তখনো
আমার মনে জাগেনা কোন দোলা। ‘এই আমি’
এখন কেবলি নীরবে ঘুমিয়ে পড়া
বিটপীর মতো, নিঃসঙ্গ অতসির মতো
থাকিঃ
নিশ্চুপ, চুপচাপ।
মা তুমি নেই বলে
‘এই আমি’ এখনঃ
গভীর অনুরাগে স্পর্শ করি তোমার
শয্যাস্থান! বড় সাধ হয় মা! ভালোবাসার
উষ্ণ চাদর জড়িয়ে স্বর্গ থেকে তোমাকে
ধরে আনি ‘আমি’
আমার আঙ্গিনায়!
মা তুমি নেই বলে
‘এই মোর’ মন বাজে আপন মনে। বিরহী
কষ্টগুলো, অব্যক্ত বেদনাগুলো এখন
‘এই’ আমারে কাঁদায়!
কষ্টের অক্টোপাসে বন্দি হয়ে
‘এই আমি’ এখন
মোর’ অনুক্ষন অনুভবে শুধু
অন্তরের অন্তরাল থেকে
বৃত্ত বন্দী জীবনের গল্প বুনি।

শুনাতে হবে জন্ম যন্ত্রণার ইতিকথা

বাংলা মাগো!
তোমার শরীরে লেপ্টে থাকা রক্তের দাগগুলো
তুমি তোমার সবুজ আঁচলে পুটলি করে বেঁধে
রাখো; তোমার হৃদয়ে হৃদয়ে আর্তনাদ করা
বিয়োগান্তক নোনতা হাহাকারের গল্পগুলো
তুমি বুকের জমিতে জমিয়ে রাখো; বিষাক্ত
কালো কেউটের ছোবল যন্ত্রণার মত বিষাদের
চেয়েও কালো কষ্টগুলো তুমি মনের মধ্যেই পুরে
রাখো; মাগো, তুমি তোমার স্মৃতির ভাণ্ডারে জড়ো করে রাখো রক্ত-আগুন-অশ্রুজলের সকল ব্যক্ত- অব্যক্ত কষ্ট কথা সব।
বাংলা মাগো!
তব স্মৃতির ঝুলিতে এসব যদি জমা নাহি রয় তবে তুমি মুক্তিযুদ্ধ না দেখা তোমার নতুন প্রজন্মকে কি করে শুধাবে-
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম যন্ত্রণার ইতিকথা!
তুমি কি করে রুধিবে –
পুরানো শকুনদের কু-মন্ত্রণা, যারা আজো তোমার বুকে দিতে চায় আঁচড় কাটার ব্যথা।
আত্মাহীন
হৃদয়হীন
বিবেকহীন

নিষ্ঠুর যে পাকি দল অমাবশ্যার ভয়াল ভূতের মতো চেপে বসেছিল বাংলার বুকে সেই দানবদের অমানবিক সব নির্মিতির কথা-
বাংলা মাগো! তুমি যতন করেই
মনে রেখো!!
ওদের সব হিংস্রতার কাহিনী টুকরো টুকরো মেঘের মতো করেই ভেসে বেড়াক তোমার মনের আকাশে।  বাংলা মাগো! নীরব কষ্টের পেষনেই তুমি  বুকে পুরে রাখো:
যন্ত্রণার সব সাক্ষর।
বাংলা মাগো!
এসব কথা
এসব কাহিনী
এসব ঘটনা
যদি মুছে যায়
যদি ঘুচে যায়
তোমার বুক থেকে-
তবে তুমি
মুক্তিযুদ্ধ না দেখা তরুণদের বুকে
কি করে জ্বালাবে দেশপ্রেমের মশাল!
দেখছোনা, বিকৃতির উৎসবে ইতিমধ্যেই
অনেকেরই দশা হয়েছে কেমন হাল বেহাল!!
বাংলা মাগো!
তোমার মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের খোলাবুক চেহারা নিয়ে নিমগ্ন সত্তায় স্বাধীনতার জন্য নিজেদের বিলিয়ে দেবার মতো ছবিগুলো, সেই গৌরবের আত্মদানের কাহিনীগুলো তুমি তোমার বুকের গোপন ড্রয়ারে যতন করে তুলে রাখো। রক্তঝরা একাত্তরে বাঙালির প্রতিদিনের জীবনপথগুলো বুকে বুকে এঁকে রাখো। ৭ মার্চ। ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরের নতুন ভোরের সুর্য উঠার ইতিহাসগুলো হৃদয়ের গভীর বন্দরে শক্তপোক্তভাবে প্রোথিত করে রাখো। মুক্তির লড়াইয়ে গিয়ে আর ঘরে না ফেরা প্রিয় সন্তানের জন্য শুকনো চোখে নিদ্রাহীন রাত কাটানোর কথা; চাপা কষ্টের দীর্ঘশ্বাসের কথা; হাজারো আকুল করা স্বপ্নকথা- এসব সব তুমি মনে গেঁথে রেখো:
যতনে, মতনে।
মাগো! নতুন প্রজন্মকে, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জানাতে হবে বাংলাদেশের জন্ম যন্ত্রণা।
দেখছোনা মাগো! তোমার জন্ম শত্রুরা মুক্তিযুদ্ধ না দেখা তরুণদের দিচ্ছে কত কুমন্ত্রণা!
পুরানো সেই শকুনীর দলকে থামাতে হলে নতুন প্রজন্মকে শুনাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের গল্প।
মুক্তির গানে গানে প্রাণে প্রাণে জাগাতে হবে সাড়া। মাগো! এর নেই কোন বিকল্প।
(ঢাকা: ১৫/১২/১৭)

এসো তুমি নূতন ভোরের সুর্য হাতে

হে বৈশাখ, চৈত্রের বিবর্ণ নগরীতে আনো রঙের
আমেজ:
আল্লাদী উচ্ছাসে।
দাও খুলে দাও অনুভূতির বদ্ধ দুয়ার সবার। জাগাও
সকলেরে:
নূতন বিশ্বাসে।

“নব জীবনের গান গেয়ে, নব ধারায়
এসো হে বৈশাখ; এসো নূতন ভোরের
আলো মেখে।
সব বাঙালির রক্তে যেনো
মুক্তির হাওয়া বয়:
অনুভবের চরাচরে সকলে যেনো
মুক্তি আলো দেখে।

হে প্রিয় বৈশাখ, তুমি আসলে পরে হৃদয়ের
ক্যানভাসে নূতন রঙ মেখে মুগ্ধতার চোখে
দেখবো আমি আমার পরম প্রিয়
বাংলা মায়ের মুখ।
তখন বাংলাকে দেখবো আমি অসহ্য সুন্দরের
মহিমায় ডুবে থাকা প্রকৃতির এক অপুর্ব ভাস্কর্য রূপে-
যেখানে আছে শুধু সবুজ শিল্পের সমাহার; যেখানে নেই কোন দু’খ।

দখিনা সমীরে কান পেতে শুনি আমি,
হে বৈশাখ আবার তুমি আসছো ‘এই বাংলায়’
চৈতালী হাওয়ায় ভেসে।
তুমি আসছো স্বপ্নলোকের চাবি হাতে; অনেক
আনন্দে মেতে। আমিও তোমারে সাদরে করবো
বরণ- এগিয়ে এসে।
স্বপ্নলোকের চাবি হাতে এসো
হে প্রাণের বৈশাখ। এসো
আনন্দ সুখের প্রস্রবনে-
বাঙালির প্রতি ঘরে।
হে বৈশাখ এসো তুমি
সৃষ্টির প্রসব আনন্দে; এসো
নূতন ভোরের সুর্য হাতে; তুমি সহাস্যে
আসলেই বাঙালির সুখ ও সমৃদ্ধির
গোলা উঠবে ভরে।”

এবার, এই বৈশাখে আসুক মনের সীমান্তে ঝিলিক
দেয়া স্বাপ্নিক সব মুহুর্ত। অন্ধকার ভেসে যাক
আলোর বন্যায়।
অনিশ্চয়তার দোলা কেটে যাক: নূতন ভোরের
আলোতে। বাংলা থেকে বিদায় নিক যতসব
অন্যায্যতা ও অন্যায়।
(পরিমার্জনঃ ঢাকা: ১২/০৪/১৭)

অন্যধারার উপলব্ধি

সুর্যটা যখন পাহাড়ের কোলে মুখ লুকিয়ে ঘুমাতে
ব্যস্ত রয় তখন আমি ভাবি অন্যধারায়। তখন
আমার শুধু মনে হয় ‘ ফুরায়েছে  পাথেয় আমার! এবার বুঝিবা ফিরতে হবে আমায়:
শেষ গন্তব্যের অকুস্থলে;
এপাড় ছেড়ে ওপাড়ে।
তখন আমার শুধুই মনে হয় এই বুঝি এলো আজরাইল নামের মৃত্যুদূত  সমন হাতে লুকিয়ে আছে যে অদূরের মৃত্যুঝাড়ে।

পাখিরা যখন সাঁঝ লগনে ঘুমঘুম চোখে দূর থেকে উড়ে উড়ে দলে দলে নীড়ে ফিরে নিশির আমন্ত্রণে তখন আমারও প্রাণে বিদায়ের সূর বেজে বেজে উঠে ক্ষণে ক্ষণে। আমি যেন যাই চলে যাই অন্য প্রাণে; আমি নিজেকে হারাই অন্য ধ্যানে। শুনতে পাই আমি:
ফেলে আসা জীবনের পিছু ডাক!
জীবন ঘরের করিডোরে থেকে থেকে গমগমিয়ে
বেজে উঠা কতোনা হাঁকডাক!!

ক্লান্তিতে লাল হয়ে সমুদ্র বুকে ঢলে পড়া
অস্তমিত সুর্যটা দেখে  দু’ চোখে ভেসে উঠা
অতীত সংগে নিয়ে  উপলব্ধির গভীরে গিয়ে
আমিও মিশে যাই ঐ ম্লান সৌরলোকে:
অন্যধারার এক ভাবনাকে সাথী করে।
আমিও তখন ভেবে নিই: ‘আমারও বুঝিবা
পাথেয় শেষ হয়ে এলো বলে’! জীবনের অন্তর্গত
সত্যকে মেনে আমিও তখন মেনে নিই-
খেলা শেষে
বেলা শেষে
আমার জীবন সুর্যও নিভে যাবে
একদিন। আমাকেও চলে যেতে হবে
চিরঘুমের দেশে:
যেখান থেকে কেউ ফিরেনা।

(পরিবর্ধন ও পরিমার্জন:
ঢাকা: ২৮/০৮/১৭))

তুমি আসবে বলে: হে পরাণ প্রিয়া

তুমি আসবে বলে:
হে পরাণ প্রিয়া!
পলাশ-মাধবী- শিমুলের ডালে ডালে লেগেছে দেখো কতোনা রঙের বাহার!
এ মোর প্রাণে মধুরম মায়াবী এক আবেশ ঘিরে জেগেছে দেখো বসন্ত সুখের ময়না পাখি:
ছেড়েছে সব আপন নিদ্রা-আহার!!
তুমি আসবে বলে:
হে পরাণ প্রিয়া!
প্রাণের আকুতিতে দখিনা হাওয়ার আলতো পরশ মেখে নব পত্রে ও পুষ্পে বন বিথিকা উঠেছে জেগে:
শিহরণ জাগানোর এ দিনে।
হে মোর পরাণ প্রিয়া!
বিরহ-মিলনের স্বগত: সংলাপ মুখে তুমি এসো সুর-ছন্দে; তালে-লয়ে। বর্ণে-গন্ধে ছড়াও শুধু ভালোবাসার গান। বাঁচেনা যে এ পরাণ-
হে প্রিয়া! তুমি বিহনে!!

তুমি আসবে বলে:
হে পরাণ প্রিয়া!
অশোকে-অশত্থে- শিরিষে আর শাল-পিয়ালে লেগেছে দেখো –
কেমন হাওয়ার নাচন!
উতলা-উদ্দাম করা হাওয়া গায়ে মিশিয়ে পরাণের সাথে পরাণ মিলিয়ে আমিও দেখো
বসে আছি হৃদয়ের সিংহদ্বার খুলে! আমার মর্মরিত হৃদয়ে দেখো –
ভ্রমর উঠেছে গুঞ্জরিয়া!
ওরে প্রিয়া প্রেয়সী আমার! তোমাকে ছাড়া
বলো,  যায় কি কভু বাঁচন!

তুমি আসবে বলে:
হে পরাণ প্রিয়া!
জারুল-পারুল, শিমুল-পলাশ, রজনীগন্ধা- জবা, কনকচাঁপা আর মাধবী- মালতির গুচ্ছগুলো দেখো পুষ্পিত সৌরভ নিয়ে নব জীবনের স্পন্দনে  সৃষ্টির বৈচিত্রময়তায় কেমন করে মেতে উঠেছে:
চিরচেনা কিন্তু অজানা রূপে!
দেখো হে প্রিয়া!
তুমি আসবে বলে:
আমার বুকের গহীনে নৈ:শব্দের নদী বয়ে চলেছে -নিরন্তর। ভালো লাগার কিছুক্ষণের জন্য নয়। তুমি এসো অনুভূতির অনন্ত অনুভবে অনন্ত বন্ধনের শপথ এঁকে। তুমি এসো আমাকে প্রাণে-মনে, চোখে পুরে নব জীবনের উদ্বেলতা নিয়ে। তুমি এসো তোমার শ্যামল-বর্ণিল রূপমাধুরি নিয়ে- নীরবে- নিশ্চুপে।।

তুমি আসবে বলে:
হে পরাণ প্রিয়া!
দেখো, তরুরাজির প্রাণে প্রাণে জেগেছে দোলা; অরণ্যে- পর্বতে,পত্র পল্লবে,ঘাসে ঘাসে, নদী তটে এবং বৃক্ষ ছায়ায় দ্যুলোক- ভূ-লোক মিলে সৃষ্টি করেছে কি এক অনির্বচনীয় রূপচ্ছটা:
আহা! কি নীরবে, নি:শব্দে, নিশ্চুপে।
আর তাই দেখো-
আমার রুক্ষ দিনের দু:খ ঘুচে;
আমার জরাগ্রস্ত প্রাচীন বিবর্ণ রূপ মুছে;
আমার জীবনে এসে গেছে মন রাঙানোর
নূতন দিন। তাইতো আজিকে আমি:
বসন্তের রোদেলা দুপুরে, মায়াভরা গোধূলি লগনে, রূপালী রঙের পূর্ণিনা নিশিতে, রুদ্র বৈশাখের ক্ষ্যাপা বাতাসে, আবির রাঙা ভোরে
মাদকতার ছোঁয়ায় তোমাকে খুঁজে পাই:
পুলকিত আন্দোলিত রূপে।।
হে প্রেয়সী প্রিয়া আমার!
এসো তাই ‘ এই তুমি, সেই তুমি’
তিমির বিদারণ আলোক প্রসারণ নিয়ে:
ভালোবাসার আবাহনে।
এসো তুমি শুদ্ধ ভালোবাসার ডালি হাতে নূতন দিনের কাঁচাসোনা রোদ গায়ে মেখে:
পরিবর্তনের আহ্বানে।
(ঢাকা: ২০/০৭/১৭)

মধুর স্মৃতির গল্পগুলো এখন যেন ইতিহাস

গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ যাপিত জীবনের ছন্দ কেটে
ছোপ ছোপ সাত মিশালি রঙের ঢেউ
বুকে জাগিয়ে, অনুভূতির রঙে ভালোবাসার ছবি বুকে এঁকে ভালোবাসার রঙিন অধর ছোঁয়া কবিতা হয়ে সেদিন গিয়েছিলাম
ভালোবাসা বসতির সবুজ বাড়িতে।
অত:পর দেখেছি কত সবুজ প্রাণের সমাহার; নিজেকে দেখেছি মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে; পেয়েছি খুঁজে পল্লীর সারল্য সান্নিধ্য; অখণ্ড মনোযোগে আরো দেখেছি নিরেট বিশ্বাসের অগণন অমুল্য অনুরাগের ছোঁয়া। অবশেষে ভীষন অন্যরকম অনুভূতি নিয়ে বিবেদ্য আলিঙ্গনে প্রিয় বরেষু বিদায় বলে ফিরতে হলো আপন ঠিকানায়। সেদিন সত্যি টান পড়েছিল হৃদয় নাড়িতে।
বাঁশরীর তালের আকুল প্রবাহে হৃদয়ের উত্তাপ মেখে ভালোবাসার অপুর্ব মহিমা খেলা দেখিয়ে এইতো সেদিন দিলে বিদায়:
অনন্য এক সখ্যতার সাক্ষর রেখে।
ইন্দ্রীয়কে অবিশ্বাস্য করে এক অনিয়ন্ত্রিত মুগ্ধতায় সেদিন আমি
কেঁদে ফেলেছিলাম। মিলন ভাংগার বনেদি বিষাদে সেদিন ঘটেছিল এক মহিমাদীপ্ত যবনিকা। আমি ফিরে এসেছিলাম:
রুদ্ধস্বর বাণী হৃদয়ে মেখে।
বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসা দিয়ে হাজার স্মৃতির এক দুর্বহ বোঝা চাপিয়ে দিলে
তুমি আমার ঘাড়ে।

আমার ক্ষুধার্ত হৃদয়কে মমতায় ভরিয়ে দিয়ে; বুকভাংগা বেদনার রুদ্ধস্বর বাণীতে ম্লানমুখে বিদায়
দিয়ে তুমি ফিরে গেলে ওপাড়ে।”
প্রাণের টানে ফিরে ফিরে দেখো তুমি স্বর্গীয় সৌন্দর্যের সুধাময় সব নৈসর্গিক রূপ আরো দেখো ঘরের অলিগলির চেনা পথে পথে আমার
এঁকে দেয়া পদচিহ্ন।
তোমার মনের বিদর্ভ নগরে খোঁজ আমার নিবাস; মন বাউলের তারে তারে বাজিছে দেখো:
ভালোবাসার গান- ওরে কে করিবে
সে তার ছিন্ন!
আমার অনাবাদি হৃদয় জমিতে কষ্টের কবিতা তুমি; তুমি আমার নি:সঙ্গতার সঙ্গী।
আহা! এ যেন জন্মের এক দায়বন্ধন; আপন সত্তার স্নিগ্ধতায় ভরা দারুণ এক মনোভঙ্গী।
স্নেহডোরের আবদ্ধতার প্রতিটি সুখ প্রহর
নিয়ে যাক তোমারে আনন্দের আঙিনায়
অনেক প্রাপ্তির আকাশে।
পৃথিবীর সব সুখ ধরা দিক তোমার হাতের তালুতে;
হুমড়ি খেয়ে পড়ুক আনন্দ আলোর সব ঝলকানি
মন মাঠের সবুজ দুর্বাঘাসে।।
যোজন সমান দুরত্বে থাকো আর বুকের মাঝেই
থাকো, তুমি কিন্তু আমার জীবনে নি:শ্বাসের মতোই
দৈনন্দিন।
কাছাকাছি, পাশাপাশি সব ভালোবাসাবাসি আর
কান্না-হাসি প্রহরে প্রহরে চলে আপন সজ্জায়:
নিত্যদিন।
কান্নার ভয়ার্ত কলরবে ভারী হয়ে আছে-
মনের আকাশ। হয়তোবা আর হাত দেয়া হবেনা
আদরের শরীরে। মায়ার বন্ধন ছিঁড়ে ফিরে এলাম আবার আপন ডেরায়-যেখানে যেথায়
নিত্য করি বসবাস।
সেদিন চোখে মুখে ছিল বিষাদের ছাপ, মুখের
ভাষায় ছিল বেদনার প্রকাশ;স্বজন বিদায়ের মুহুর্তে
থেকে থেকে বেজে উঠেছিল মনের সাইরেন। মধুর স্মৃতির গল্পগুলো
এখন যেন ইতিহাস।

স্বাধীনতা

স্বাধীনতা আমার নি:শ্বাস ছুঁয়ে যাওয়া
সবুজের অসীম প্রান্তর চিরে
জেগে উঠা –
এক স্বপ্ন সমান্তরাল আলোর পথ।
স্বাধীনতা আমার আঁধার কেটে
জেগে উঠা –
ঝাঁঝঁলো রোদেলা দুপুরের আলোতে ভাসা
হাজার কন্ঠের বিস্ফোরিত শপথ।।

স্বাধীনতা আমার মনে কোলে জাগে থাকা অপার
আনন্দ অনুভবের এক মাতৃকা ছবি।
স্বাধীনতা আমার দোলায়িত প্রাণের এক সবুজ বৃক্ষ
শাখা; আলো ছড়ানো মুক্তি রবি।।

স্বাধীনতা আমার মনের কোণে বিজয়ের প্রচ্ছদ আঁকা
এক মুক্তি পাগল মুখ।
স্বাধীনতা আমার উন্মাতাল তরংগের নির্ভয়
দাপাদাপি; দারুণ এক আনন্দ সুখ।।

স্বাধীনতা আমার চোখের তারায় ভাসা
এক মহামুক্তির বর্ণিল আলো।
স্বাধীনতা আমার মনের স্বপ্ন সখা অরুণ-
ঘুচিয়ে দেয় যা আঁধার কালো।।
===========
পরিমার্জনঃ ঢাকা :২৬/০৩/১৭

বিষন্ন সময়ের এ পাড়ে দাঁড়িয়ে

একাকী ডাহুকের মত
নি:সঙ্গ অতসীর মত
বিষন্ন সময়ের এ পাড়ে দাঁড়িয়ে
তাবৎ জগতটাকে দেখছি:
স্বার্থের যুপকাষ্ঠে।
প্রাণের খেলায়
জীবন মেলায়
হেরে গেছি আমি। এখন মায়ার আবেশে ভরা
স্মৃতির কণাগুলো মনের অন্তপুরে বসে আমায়
আঘাতে আঘাতে জেরবার করে। কেউ দেখেনা হৃদয়ের রক্তক্ষরণ:
চলছে যা বুকের প্রকোষ্ঠে।।
সুখস্মৃতি, কষ্টস্মৃতি বুঝিনা। বুঝি শুধু অভিশপ্ত স্মৃতির দু:সহ বোঝা বইতে বইতে একদিন অধম ‘এই আমি’ হারিয়ে যাবো:
দূর অজানায়।
তার আগে যেন নিস্তার নেই আমার! কষ্ট জলে ভেজা সময় পেরিয়ে খেলা শেষে, বেলা শেষে

একদিন আমি চলে যাবো:
নিশ্চুপে হায়!
(ঢাকা: ০৫/০৭/১৮)

 ভাষা আমার ভালোবাসা

আমার অ আ ক খ বর্ণমালা কোন অক্ষরের
জঞ্জাল স্তুপ নয়। এতো বহমান রক্তস্রোতের
ভাসা অনঢ় স্থির সিদ্ধান্তের এক অনুরুদ্ধ ঘোষণাপত্র যেখানে  একুশের চেতনায় পুষ্ট হয়ে
কঠিণ পাথরের কঠিণ পাহাড় ভেঙ্গে বাঙালি
এগিয়ে যায়:
বেগবান, বলবান শক্তিরূপে।
আমার অ আ ক খ বর্ণমালা তো শুধু কতিপয় অক্ষরের সমাবেশ নয়। এতো আমার কাছে বাংলা ভাষার এক জমকালো আকাশ; এক জাদুময় মুক্তি আলোর ফোয়ারা যা কিনা আমাকে এক বিস্ময়কর সৌন্দর্যের ধাঁধাঁয় দেশপ্রেম জাদুর মোহিত ইন্দ্রজালে অনন্য এক সখ্যতায় ভাসায়: একুশের চেতনার ধারায়। আমি বিমোহিত চিত্তে দেখি বাংলা ভাষার মহিমাদীপ্ত পদচারণা যা আমি
উপভোগ করি:
নীরবে নিশ্চুপে।
অ আ ক খ বর্ণমালা সাজিয়ে শব্দের গাঁথুনি দিয়ে বাক্য গড়ি মা, মাতৃভূমি; বাংলা আর বাংলাদেশ! ওরে এইতো আমার বাংলাদেশ!  এইতো আমার বাংলা ভাষা:
আমার ভালোবাসা।
অ আ ক খ এতো সাদা কাগজে লেখা কোন কালো কালির অক্ষরমালা নয়। এতো আমার আত্মবন্ধন সূত্রতা; আমার বাঙালি সত্তার শুদ্ধতার মন্ত্র! এতো আমার রক্তে গড়া আমার প্রাণের বাংলা ভাষা! ওরে মেটায় যা:
আমার মনের আশা।
(ঢাকা  ২১/০২/২০১৮)

সর্বত্র বাংলাদেশ

ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক; চুড়ুই পাখির কিচিরমিচির; কচু পাতার গায়ের
টলটলে স্বচ্ছ পানির নাচন; স্মৃতির মিনার শহীদ মিনারের শরীর:
কোথায় নেই বাংলাদেশ?
অন্তর্কোণের সব বদ্ধ দরোজা খুলে দাও-
খুঁজে পাবে তুমি নিশ্চিত, নিশ্চয়ই:
তোমার আত্মপরিচয়;
শেকড়ের উৎসমূল;
আপন অস্তিত্বের বন্ধন সূত্রতা।
চিরহাস্যময় পবিত্র ভঙ্গীমার প্রিয় শাপলা;
বর্ষার স্বর্ণাভ কদম; বসন্তের শিমুল-পলাশ;
ঝিঙে ফুলের উজ্বল হাসি; গোলাপ-জবার মায়াবী চাহনি; সর্ষে ফুলের উল্লাস; শিউলি-বকুল, হাস্নাহেনার বাতাসে ছড়ানো তীব্র ঘ্রাণ; রজনীগন্ধার মাতাল করা মৌ মৌ আবেশ; জাতীয় স্মৃতিসৌধের অবয়ব:
কোথায় নেই বাংলাদেশ!
অন্তর্চক্ষু খোলো- নিশ্চিত, নিশ্চয় করে
খুঁজে পাবে তুমি:
তোমার অস্তিত্বের জঠর; ভালোবাসার মোহনাতল!
সুর্যের আঁকিবুকি; নীলিমার রূপ; মিষ্টি নীলাকাশ; সবুজ ছায়া; নদীর কুলুধ্বনি; সাগরের তরঙ্গ নাচন; দূর পাহাড়ের উদ্দাম ঝর্ণা; চিলতে উঠোনে মুগ্ধ জোছনার বান; সবুজ কার্পেটে ভরা তুলতুলে মাঠ; আকাশে আকাশে গৌরবের সৌরভে উড়া লাল-সবুজের পতাকা:
কোথায় নেই বাংলাদেশ?
অন্তর্চক্ষু খোলো: খুঁজে পাবে নিশ্চিত, নিশ্চয়ই
বাঙালির অস্তিত্বের জঠর শেকড়!
চেয়ে দেখো সর্বত্র বাংলাদেশ!
রঙ-রূপের আর গৌরবের ইতিহাসের
যার নেইকো কোন শেষ!!
(পরিমার্জন: ঢাকা: ১৬/১২/১৭

 

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!